মুখ ফুটে কোথাও 'ভালোবাসি' বলা নেই, তবু ভালোবাসা আছে এখানে। বাহুল্য নেই, আতিশয্য নেই, নেই কোন বাড়তি প্রলেপ, নেই দেখনদারি- তবু আছে ভালোবাসা, নীরবে, নিভৃতে, হৃদয়ের কোন এক কোণে, একান্ত গোপনে, বড় যতনে। ওয়ান সাইডেড লাভ নিয়ে কম সিনেমা হয়নি, তবু অক্টোবর কোথায় যেন আলাদা, অনন্য।

শিউলি ফুল বড় ভালোবাসতো মেয়েটা। সেজন্যে নিজের নামটাও বদলে নিয়েছিল। পার্টির সেই রাতে রেলিংয়ের ওপরের অংশটা ভেজা ছিল, খেয়াল করেনি কেউ। তার ওপরে বসতে গিয়েই তাল হারিয়ে পড়ে গেল সে, সুশ্রী চেহারাটা মুহূর্তেই পরিণত হলো জমাট রক্তপিণ্ডে, শরীরটা ভেঙেচুরে একাকার। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, হাসপাতালের মৃদু কোলাহল, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ'র মেশিনের আওয়াজ, কোমা, স্ট্রোক-এপিলেপ্সি অ্যাটাক- একটার পর একটা ধাক্কা শুধু, তবুও শিউলি আইয়ার টিকে রইলো, বেঁচে থাকার আদিম বাসনাতেই হয়তো।

শিউলির সঙ্গে সমান্তরালে বেঁচে রইলো অক্টোবরের গল্পটাও। সেই গল্পে এসে মিশে গেল দানিশ ওয়ালিয়া, ড্যান। একগুঁয়ে, ফাঁকিবাজ, উদাসীন, তবু প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার আগে শিউলির শেষ কথা ছিল- 'ড্যান কোথায়?' গভীর কোন মানে নেই প্রশ্নটার, হয়তো উত্তর জানার ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষাও ছিল না, জিজ্ঞেস করার জন্যেই করা। কোমায় যাওয়ার আগে সেটাই হয়ে রইলো শিউলির মুখ থেকে বের হওয়া শেষ বাক্য, এই কয়েকটা শব্দ এলোমেলো করে দিলো ড্যানের জগতটাকে। সেখানে একটা ঝড় উঠলো নিঃশব্দে, প্রবল জলোচ্ছ্বাসের প্লাবনে ভেসে গেল এক তরুণ।

হোটেলের চেয়ে হাসপাতালেই বেশি সময় কাটতে লাগলো ড্যানের, আইসিইউতে শিউলির বেডের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা, ওপাশ থেকে জবাব আসবে না জেনেও তার সঙ্গে কথা বলা, নার্সদের ধমক আর মশার কামড়, শিউলির চাচার সঙ্গে তর্কে জড়ানো- রোজকার রুটিন হয়ে গেল এসব। অথচ শিউলির যখন জ্ঞান ফিরলো, স্মৃতি হারানো মেয়েটা ড্যানকে চিনতেও পারেনি। তাতে কি, ড্যান তো চেনে শিউলিকে, হোক না একপাক্ষিক, তবু সম্পর্কের সুতোটা টিকে থাকুক!

চারপাশের মানুষগুলো কি ভীষণ নির্লিপ্ত! তারা যেন আমাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে! একুশ শতকে শোকের আয়ু বড়জোর সাত দিন, এই সত্যিটাই অক্টোবরে উঠে এসেছে বারবার। যার যার জীবন নিয়ে সবাই মগ্ন, শিউলির চাচা বলছেন লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলতে, বন্ধু-বান্ধবীরা কাজে ডুবে গেছে, শিউলির ভাই-বোনরাও যার যার কলেজ-ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। এক ড্যানের জীবনটাই শুধু থমকে গেল শিউলির সঙ্গে সঙ্গে, অবাধ্য এক চক্রে বাঁধা পড়লো সে। তাকে জানতেই হবে, কেন শিউলি সে রাতে তার কথা জিজ্ঞেস করেছিল? শিউলিকে তো জানাতে হবে, তখন ড্যান কোথায় ছিল।

অক্টোবর- ইটস নট অ্যা লাভ স্টোরি, বাট অ্যা স্টোরি অ্যাবাউট লাভ

মুখ ফুটে কোথাও 'ভালোবাসি' বলা নেই, তবু ভালোবাসা আছে এখানে। বাহুল্য নেই, আতিশয্য নেই, নেই কোন বাড়তি প্রলেপ, নেই দেখনদারি- তবু আছে ভালোবাসা, নীরবে, নিভৃতে, হৃদয়ের কোন এক কোণে, একান্ত গোপনে, বড় যতনে। ওয়ান সাইডেড লাভ নিয়ে কম সিনেমা হয়নি, তবু অক্টোবর কোথায় যেন আলাদা, অনন্য। প্রত্যাশার পারদের উঁকিঝুঁকি নেই কোথাও, নেই প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা। সাদামাটা জীবনের গল্প, সাধারণ সব মানুষ- এর মাঝখানে গল্পটাই অসাধারণত্ব নিয়ে হাজির হয় দুয়ারে, সেই গল্পের উপস্থাপনটা নাড়িয়ে দিয়ে যায় মনোজগতকে।

অক্টোবরের গল্পের সবটা জুড়ে মিশে আছে শিউলি। চরিত্র নয়, শিউলি ফুল। ক্ষণস্থায়ী জীবন নিয়ে আসা এই ফুলটাকে ঘিরেই জুহি চতুর্বেদী গল্প বাঁধলেন, সুজিত সিনেমায় হাত দিলেন। বিদায় আর বিষাদের রেণু ছড়িয়ে দিলেন পর্দাজুড়ে, সেই বিষাদ বারবার ছুঁয়ে গেল দর্শককে। অন্তত অক্টোবরের সঙ্গে, ড্যানের সঙ্গে যারা কানেক্ট করতে পেরেছেন, তাদের তো শিউলির সুবাস স্পর্শ করবেই।

অক্টোবর ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েও যেন গত দশকের, কিংবা গত শতকের একটা গল্প শোনালো। ফেসবুক-ইন্সটাগ্রাম, টিন্ডার কিংবা স্ন্যাপচ্যাট আর রিলেশন-ব্রেকাপের মহামারীর এই যুগে এসে উপহার দিলো বিশুদ্ধ অনুভবের উষ্ণতা। অক্টোবর জানান দিলো, এই সময়ে এসেও কেউ কেউ থাকে, ড্যানের মতো। ভালোবাসাটা যাদের কাছে সবচেয়ে বড়, সবার থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এরা স্রোতে ভেসে যায় না, স্রোতের বিপরীতে চলার সংগ্রামও করে না, শুধু ভালোবাসার তাগিদে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সব প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে। পেছনে পড়ে থাকে পরিবার, ক্যারিয়ার, ফিউচার। পাগল, লুজার, লাইফলেস- অনেককিছুই বলা যায় এই মানুষগুলোকে। কখনও ওদের জুতোয় পা গলিয়ে দেখলে হয়তো ভালোবাসার তীব্রতাটা অনুভব করতে পারতো বাকীরা, কিন্ত রোবটিক এই যুগে সেই সময় কার আছে?

বরুণ ধাওয়ান এমন একটা রোল করতে পারবেন, এটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পৌনে দুই ঘন্টার সিনেমায় কোথাও বরুণ ছিলেন না, ছিল ড্যান, দানিশ ওয়ালিয়া। উশকো খুশকো চুল, এলোমেলো পোষাক, ছন্নছাড়া অবয়ব- সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত এক প্যাকেজ। নেক্সট সালমান খান হিসেবে যে বরুণকে ভাবা হয়, এরকম ঠান্ডা সুরের ছবিতে তাকে কাস্ট করে সুজিত সরকার বিশাল একটা জুয়া খেলেছিলেন। বরুণ ধাওয়ান হতাশ করেননি একটুও, উপহার দিয়েছেন বিস্ময়। তার হতাশা, তার অভিমান, তার একাগ্রতা, চোখের জল- সবকিছুই ছুঁয়ে গেছে আমাকে, যতবার দেখেছি, ততবারই...

বরুণের সঙ্গে গীতাঞ্জলী রাওয়ের কেমিস্ট্রিটাও মুগ্ধতা ছড়িয়েছে

শিউলির চরিত্রে প্রথমবার বড় পর্দায় আসা বানিতা সান্ধু জীবন্ত হয়ে রয়ে গেলেন। বেঁচে থাকার আকুলতা আর অতলস্পর্শী শূন্যতা- দুটোই তিনি সমান্তরালে ফুটিয়ে তুলেছেন চোখজোড়ায়। শিউলির মায়ের চরিত্রে মিশে গেলেন গীতাঞ্জলি রাও, বরুণের সঙ্গে তার অদ্ভুত কেমিস্ট্রিটাও মায়া ছড়ালো, দারুণ মুগ্ধতা জাগালো। অক্টোবরের পরিমিতিবোধটা বড্ড ভালো লাগে, কোথাও বাড়াবাড়ি নেই নেই মেদের বাহার। কেউ এখানে অভিনয় করছেন না, প্রতিটা চরিত্র বাস্তব, ভীষণ জীবন্ত, যেন আমাদের একান্ত পরিচিত।

শেষ দৃশ্যে শিউলি গাছটাকে জড়িয়ে ধরে বরুণের বাড়ি ফেরার দৃশ্যটাই কল্পনা করুন, যেন ভালোবাসার মানুষটাকে পরম যত্নে আগলে রাখার চেষ্টা করছে ড্যান, পাছে ঝাঁকুনিতে সে ব্যাথা পায়! কিংবা তারও আগে শিউলির মুখ থেকে নিজের নাম শোনার মুহূর্তটা- দুই সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ওই সময়টুকুতে নিজের বোবা অনুভূতিকে জোর করে চেপে রাখার যে আকুলতা, যে চেষ্টা- সেটা মনে দাগ না কেটে পারে?

শান্তনু মৈত্র একটা গ্র‍্যান্ড ওভিয়েশন পাবেন ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরের জন্য। সিনেমায় গান নেই একটাও, আছে নৈঃশব্দ্যের মাঝে সুরের ইন্দ্রজাল। সেই ইন্দ্রজাল বেদনা বাড়ায়, ঘোর লাগা এক শূন্যতা জাগায় হৃদয়ের গহীনে। নিজেদের অজান্তে আমাদের ড্যান হতে ইচ্ছে করে, তার কষ্টটা অনুভব করতে পারি খুব কাছ থেকে। সুজিত সরকার আরও অনেক সিনেমা বানাবেন। জুহি চতুর্বেদি লিখবেন নতুন নতুন গল্প। এই জুটির সিনেমা হিট হবে, দর্শকপ্রিয়তা পাবে। শান্তনু দারুণ সব কাজ করেছেন, আরও করবেন। বরুনের ক্যারিয়ার তো সবে শুরু, তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো অজস্র সিনেমা নিশ্চয়ই যোগ হবে তার ফিল্মোগ্রাফিতে। এই চারটা মানুষ যদি আর কোন কাজ না-ও করেন কোনদিন, তবুও আমি ওদের মনে রাখব, শুধু অক্টোবরের জন্যেই এই চতুস্কোণকে মনে রাখা যায়।

কিছু সিনেমা থাকে, একদম অকারণে বুকের ভেতর চিরস্থায়ী একটা দাগ তৈরী করে দেয়। দুই ঘন্টার একটা জার্নি কখনও কখনও সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে যায়। দুয়েকটা চরিত্র মনের ঘরে ঢুকে যায় চিরদিনের জন্য, চেষ্টা করেও তাদের ভোলা যায় না, দূরে সরানো যায় না। বিষণ্ণ কোন সন্ধ্যা বা মধ্যরাত্তিরে তারা হানা দেয় বারবার, জানান দেয় নিজেদের অস্তিত্ব। অক্টোবর সেরকমই একটা সিনেমা।

অক্টোবর মন খারাপ করিয়ে দেয়, বুকের ভেতর চেপে রাখা বিষাদের তারে আলতো টোকা দেয়, বিরহ জাগানিয়া করুণ সুর বেরোয় সেখান থেকে। গলার কাছে জমে থাকে আবেগের দলা, সেটা বেরিয়ে আসতে চায়, জোর করে আটকে রাখি। সিনেমা শেষে হেডফোনটা খুলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ মুছি। পুনরাবৃত্তি ঘটে এই ঘটনার, একবার, দুবার, বারবার। তবুও অক্টোবরের দুর্নিবার আকর্ষণ কাটে না। কষ্ট পাওয়া বোধহয় একটা নেশার নাম, নইলে এমনটা তো হবার কথা নয়!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা