প্রায় প্রত্যেকটি চরিত্র যথাযথ ট্রিটমেন্ট পেয়েছে, পাশাপাশি মুগ্ধ হয়েছি 'সুন্দরবন' এর সাথে মূল গল্পের আশ্চর্য সহাবস্থানে। সুন্দরবনের থমথমে যে অবয়ব, সেটা খুব ভালোভাবে এসেছে এই সিনেমায়। 'সুন্দরবন'কে এভাবে ব্যবহার করায়, কিছু ক্ষেত্রে 'অপারেশন সুন্দরবন' রুটেড ফিল্মের আবহও দিয়েছে। প্রশংসনীয় লেগেছে দেশের অন্যতম এই অ্যাসেটের এমন ক্যারেক্টারাইজেশনও...

'হাওয়া' এবং 'পরাণ' এর শোরগোল স্তিমিত হওয়ার আগেই লাইমলাইটে চলে আসা 'অপারেশন সুন্দরবন' পূর্বসূরীদের মোমেন্টাম বজায় রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিলো বিস্তর। প্রশ্ন ছিলো- দীপঙ্কর দীপন'কে নিয়েও। যেহেতু পাঁচ বছর পরে ফিরলেন তিনি, এবং এই পাঁচ বছরে বাংলা সিনেমার হাওয়াবদল হয়েছে বেশ, পাল্টেছে দর্শকের রুচিও, তাই এই পালটে যাওয়া সময়ে কিভাবে নিজের গল্পকে স্টাবলিশ করবেন তিনি, প্রশ্নের জায়গা ছিলো সেখানেও। তার বলা গল্পে দর্শক যেভাবে হুকড হয়েছিলো 'ঢাকা অ্যাটাক' এ, সেরকমটা এবারেও হবে কি না, কৌতূহল ছিলো সেখানেও। এসব যাবতীয় প্রশ্ন ও কৌতূহলের জবাব মেটাতেই মূলত 'অপারেশন সুন্দরবন' দেখতে যাওয়া।

ট্রেলার-টিজার কিংবা নানাবিধ মাধ্যমে আসা খবর থেকে সবার এটুকু বেশ ভালোই জানা- সুন্দরবনে ক্রমশ বাড়তে থাকা জলদস্যুদের উৎপাত ঠেকাতে র‍্যাবের যে একাধিক সফল মিশন এবং সে মিশনের ফলশ্রুতিতেই একসময়ে এসে যে জলদস্যুদের ঝাড়ে-বংশে নিকেশ হওয়া... ' অপারেশন সুন্দরবন' এর প্রেমিস এটাই। এবার এই অ্যাডভেঞ্চার টেমপ্লেটে দীপঙ্কর দিপন কমার্শিয়াল কিছু ট্রুপস এনেছেন। গান, ফাইটিং সিকোয়েন্স, কমিক রিলিফ, শেষে এসে টুইস্ট... যুক্ত হয়েছে মূল গল্পবৃক্ষের শাখাপ্রশাখা হিসেবে। গল্প এগিয়েছে। যদিও এভাবে এগোনো গল্পে কতটুকু হুকড হবে দর্শক, প্রশ্ন অমলিন ছিলো সেখানেও। সৃজিত মুখার্জি যেমন বলেন- "একটা সিনেমা দেখতে আড়াই ঘন্টা ধরে সিনেমাহলে দর্শক যে বসে থাকবে, কেন থাকবে?"

এই 'কেন'র উত্তরেই দীপঙ্কর দীপন গল্পের শুরুতে 'সুন্দরবনের জলদস্যুদের উৎপত্তি ও বিস্তার' এর মোটামুটি এক ক্রাস কোর্স করিয়েছেন৷ এরপর সেখান থেকে গজাল বাহিনী, রহস্যময় মনার আস্তানার খোঁজ, এবং তাদের পেছনেও মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আরো কেউ আছে কি না... সেসবের খোঁজে র‍্যাবের চিরুনি-তল্লাশি'তে ফোকাস করেছেন। এসবের মাঝে দুই প্রোটাগনিস্ট ক্যারেক্টার- সিয়াম (সায়েম), রোশান (রিশান) এর খানিকটা স্টোরি ডেভেলপ করেছেন৷ শেষে এসে বড়সড় টুইস্ট রেখেছেন... অর্থাৎ 'অপারেশন সুন্দরবন' এর এই রানটাইমে অডিয়েন্স যাতে বোর না হয়, সেটার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টাই চালিয়েছেন তিনি। যেটা প্রাথমিক ভালো লাগার দিক।

সুন্দরবনকে এভাবে এর আগে দেখেনি দর্শক

দীপঙ্কর দীপনের 'ঢাকা অ্যাটাক' এর অন্যতম দূর্বলতা ছিলো- প্রচণ্ড ফাস্ট পেসড স্ক্রিনপ্লে। গল্প এই বিদেশে ছুটছে, তো, এই দেশের নানা অলিতে-গলিতে বিস্তার করছে, এই সামনে যাচ্ছে, এই পেছনে যাচ্ছে- নানামুখী উচাটন। ক্ষেত্রবিশেষে দর্শক কানেক্টও করতে পারেনি প্রচণ্ড গতির এ গল্প বয়ানের সাথে। 'অপারেশন সুন্দরবন' সে তুলনায় অনেকটাই সরলরৈখিক গল্প। এখানেও গতি আছে, তবে তা প্রচণ্ড নয়। সিনেমার টেমপ্লেটও চেনাপরিচিত। আহামরি না। তাই দর্শকের এই সিনেমার সাথে কানেক্টেড হতেও খুব একটা সমস্যা হয় নি।

দ্বিতীয়ত, গল্পের বিন্যাস। টিপিক্যাল কমার্শিয়াল সিনেমার যে ফর্মুলা- গান থাকবে, কমিক রিলিফ থাকবে, অ্যাকশন থাকবে, সাসপেন্স থাকবে- সেসব এখানেও ছিলো। সেগুলোর প্লেসমেন্টও ভালো৷ মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন দেখি, গানের মধ্যেই ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে, স্টোরি এগোচ্ছে, এই সিনেমায় গানকে সেভাবে ব্যবহার করানোটা ভালো লেগেছে৷ কমিক রিলিফের টাইমিং ভালো। শেষের টুইস্টটাও বেশ অন্যরকম৷ অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলোও ঠিকঠাক। যদিও সিজিআই এর দূর্বলতা কিছু জায়গায় চোখে লেগেছে। তবে গল্পের বিস্তারে বা পরিনতিতে তা আহামরি ভূমিকা রাখেনি বলে সেটা উপেক্ষা করেছি।

তৃতীয়ত, ক্যারেক্টার স্টাবলিশমেন্ট। টিজার, ট্রেলারে মাল্টি-স্টারার কাস্ট দেখে প্রথমে একটু শঙ্কায় ছিলাম, সবাই ঠিকঠাক রোল পাবেন কি না তা নিয়েও সন্দেহ ছিলো। তবে এখানে সবচেয়ে ভালো দিক, সবাইকে ঠিকঠাক ব্যবহার না করা গেলেও যাদের উপরে ফোকাস ছিলো বেশি, তাদেরকে অপচয় করা হয় নি। সায়েম, রিশান, তানিয়া, রাকিব, সাজু, পাখি, পাপড়ি- সবার ক্যারেক্টার আলাদা মাত্রা পেয়েছে। যদিও 'মনা' চরিত্রটিকে আরেকটু ভালোভাবে কেন স্টাবলিশ করা হলো না, তা নিয়ে খানিকটা আক্ষেপ আছে। এই চরিত্রকে আরেকটু ভালোভাবে পোর্ট্রে করলে 'সোনায় সোহাগা' হতো। গল্প সেটা ডিমান্ডও করছিলো। যেটা শেষমেশ হয়নি।

অপারেশন সুন্দরবনের সিনাটোগ্রাফি মুগ্ধ করার মতোই

তবে 'মনা' চরিত্রটি মুগ্ধ না করলে মুগ্ধ হয়েছি 'সুন্দরবন' এর সাথে মূল গল্পের আশ্চর্য সহাবস্থানে। সুন্দরবনের থমথমে যে অবয়ব, সেটা খুব ভালোভাবে এসেছে এই সিনেমায়। 'সুন্দরবন'কে এভাবে ব্যবহার করায়, কিছু ক্ষেত্রে 'অপারেশন সুন্দরবন' রুটেড ফিল্মের আবহও দিয়েছে। প্রশংসনীয় লেগেছে দেশের অন্যতম এ অ্যাসেটের এই ক্যারেক্টারাইজেশনও!

এভাবেই 'অপারেশন সুন্দরবন' সব দোষগুণ মিলিয়ে-মিশিয়ে অম্লমধুর স্বাদে বেশ কম্প্যাক্ট এক কমার্শিয়াল ফিল্ম হিসেবে শেষ করেছে জার্নি। একাধিক লেয়ার থাকা সত্বেও এখানে এক লেয়ার আরেক লেয়ারের সাথে ওভারল্যাপ করে না, কন্ট্রাডিক্ট করে না। যেটা বেশ ইতিবাচক এক বিষয়। যেসব কারণেই, 'অপারেশন সুন্দরবন' দেখা যেতে পারে। সময় নষ্ট হবে না, গাঁটের পয়সাও বিফলে যাবে না... দেয়া যেতে পারে এই প্রতিশ্রুতিও৷


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা