প্রেক্ষাগৃহগুলো মাসের পর মাস ধরে বন্ধ। সিনেমাগুলো মুক্তি পাচ্ছে ওটিটিতে। স্ট্রিমিং সাইটে 'বক্সঅফিস' নামক মাপকাঠির বালাই নেই। ব্লকবাস্টার, হাউজফুল, একশো কোটির ক্লাব...এই শব্দগুলো ক্রমশই ধূলিধূসর মলিনতায় আচ্ছন্ন। তাহলে? 'বক্স-অফিস'বিহীন এ সময়ে সিনেমার সাফল্য কিভাবে নিশ্চিত হবে?

একটা সিনেমা কখন সফল হয়? বহুলচর্চিত এ প্রশ্নের উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকম। যদি 'সিনেমা'কে পণ্য হিসেবে কল্পনা করি, তখন সিনেমার সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রধানতম মানদণ্ড- বক্স অফিসের পারফরম্যান্স। আবার সিনেমাটি যদি হয় শিল্প ও বানিজ্যের মিশেল, তাহলে 'বক্স অফিস' এর পাশাপাশি দেশ-বিদেশ থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারকেও আনা হয় বিবেচনায়। আবার এখানেই শেষ না। এসবের মধ্যেও গুপ্ত অনেক চলকের প্রভাব আছে, লুকোচুরি আছে। সবমিলিয়ে তাই 'সাফল্য'সূচক প্রশ্নটা গোবেচারা মনে হলেও উত্তর মোটেও সোজাসাপটা নয়। বরং অনেকটাই ঘোরপ্যাঁচের। 

যদিও মানুষ এত জটিল কিছু ভাবতে পছন্দ করে না৷ তাই এত অজস্র অনুষঙ্গ না ভেবে বক্স-অফিসের সাফল্যকেই সিনেমার সাফল্যের সমার্থক বলে ধরে নেয়ার এক প্রবণতা আছে চারপাশে। অর্থাৎ, বিষয়টি এরকম, যে সিনেমা বক্স অফিসে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করছে, সেটিই সফল। কোনো সিনেমা বক্স-অফিসে নাম করলে দর্শকেরাও নড়েচড়ে বসেন, প্রযোজকের লগ্নিকৃত অর্থও লাভসহ ফিরে আসে৷ পরিচালক-কুশীলবেরাও তাদের শ্রমের যোগ্য মূল্য পান। সবমিলিয়ে উইন উইন সিচুয়েশন। এসব কারণের মিলিত যোগফলেই তাই সময়ের ব্যবধানে বক্স-অফিস হয়ে ওঠে নির্মাণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র চলক! 

'বক্স-অফিস' ছাড়া সিনেমার সাফল্য নির্ণয়ের মাপকাঠি কী? 

এভাবেই মানুষ ক্রমশ 'বক্স অফিস' নামক একনায়কের স্বৈরশাসনের সাথে অভ্যস্ত হচ্ছিলো। কিন্তু এরইমাঝে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়। যদি গত দেড় দুই বছরের মহামারীকালের দিকে যদি তাকাই, দেখবো, কী বাংলাদেশ, কী ভারত, কী পাকিস্তান...সবখানের 'সিনেমা'বই থেকে 'বক্স-অফিস' নামক শব্দটিই বেমালুম উধাও। প্রেক্ষাগৃহগুলো মাসের পর মাস ধরে বন্ধ। সিনেমাগুলো মুক্তি পাচ্ছে ওটিটিতে। স্ট্রিমিং সাইটে 'বক্স-অফিস' নামক মাপকাঠির বালাই নেই। ব্লকবাস্টার, হাউজফুল, একশো কোটির ক্লাব...এই শব্দগুলো ক্রমশই ধূলিধূসর মলিনতায় আচ্ছন্ন। তাহলে? 'বক্স-অফিস'বিহীন এ সময়ে সিনেমার সাফল্য কিভাবে নিশ্চিত হবে?

আজকাল স্ট্রিমিংসাইটে যেকোনো সিনেমা-সিরিজ চলে এলে তখন সেই প্ল্যাটফর্ম তাদের মত করে সেই কন্টেন্ট এর ব্রান্ডিং করে। মার্কেটিং করে। টপ চার্ট করে। এত কিছু করলেও একটি কাজ তারা কখনোই করে না। সেটি হচ্ছে, এই স্ট্রিমিংসাইটগুলো তাদের কোনো একটা কন্টেন্ট কতটুকু ব্যবসা করলো বা কতজন মানুষ বিশেষ এই কন্টেন্টটি দেখলো, তার সঠিক সংখ্যা কখনোই প্রকাশ করে না। দর্শকের কথা তো বাদই রইলো, তারা খোদ নির্মাতাকেও জানায় না, তার নির্মিত কন্টেন্ট ঠিক কতজন মানুষের কাছে পৌঁছালো। এই যে পলিসি, এখানেও কিন্তু ঘুরেফিরে সেই একই প্রশ্ন চলে আসে আবার। সিনেমাটি সফল নাকি ব্যর্থ? তা নির্ধারিত হচ্ছে কিভাবে?

ওটিটি'র দাপটে 'বক্স অফিস' আজ ক্রমশই ব্রাত্য!  

আস্তে আস্তে মূল লেখায় ঢোকা যাক এবার। একটা সিনেমা-সিরিজ ঠিক কতটুকু ব্যবসা করছে, তার সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করার বিষয়টি যেহেতু মহামারীর কারণে খানিকটা ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে, এখন তাই নির্মাতা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকেন দর্শক-প্রতিক্রিয়ার দিকে। সামাজিক মাধ্যমে দর্শকের রিভিউ, মতামত, উচ্ছ্বাসই আজকাল বহুলাংশে নির্ধারণ করে নির্মাণের সাফল্য। নির্মাতারাও তাই আজকাল যেকোনো নির্মাণ মুক্তির আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় বড়সড় প্রমোশন চালানোর পাশাপাশি চোখ রাখেন অডিয়েন্সের উপরও। নির্মাণ মুক্তির পরে দর্শকেরা কিভাবে রিঅ্যাক্ট করছে, ফিল্ম ক্রিটিকরা কিরকম রিভিউ দিচ্ছে এবং যে স্ট্রিমিং সাইটে কন্টেন্ট গেলো, তাদের সাবস্ক্রাইবাররা কিরকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে...সবকিছুকেই আনা হয় বিবেচনায়। 

এখান থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, 'বক্স অফিস' নামক মাপকাঠিটি খসে পড়ায় সিনেমা-সাফল্যের জন্যে বিবেচিত হতে পারে এমন সব অবদমিত চলকগুলো ক্রমশই আসছে প্রেক্ষাপটে। 'অবদমিত' শব্দটি ব্যবহার করার একমাত্র কারণ, এই চলকগুলো আগেও ছিলো। আগেও দর্শক প্রতিক্রিয়া, রিভিউ, সাবস্ক্রিপশন, টেলিভিশনের রিপিট টেলিকাস্ট...বিষয়গুলো ছিলো। কিন্তু সিনেমার সাফল্যের জন্যে তাদেরকে ফ্রন্টলাইনে রাখার মত কোনো পরিস্থিতি তৈরী হয়নি তখন৷ কারণ, পাদপ্রদীপের সব আলো তখন 'বক্স অফিস' নামক তারকার একচেটিয়া দখলে! 

সাম্প্রতিক সময়ে দর্শক মতামতের বাইরেও 'অরম্যাক্স' নামের এক মিডিয়া কনসাল্টিং ফার্ম প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ দেখা হিন্দি কন্টেন্ট এর একটা লিস্ট করে। এই লিস্ট দেখেও অনেকে বুঝতে পারেন, কোনো একটি কন্টেন্টের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা। জেনে রাখা ভালো, 'অরম্যাক্স' এই লিস্ট করার জন্যে প্রত্যেক সপ্তাহে ৬০০ জন দর্শকের ইন্টারভিউ নেয়। সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই তারা সপ্তাহান্তে তাদের ফলাফল প্রকাশ করে। কিন্তু এই ফলাফলেও আছে বিপত্তি। দেখা যায়, স্ট্রিমিং সাইট 'এমএক্স প্লেয়ার' ফ্রি হওয়ায় সেটার একটা তথৈবচ কন্টেন্টও যত মানুষ দেখছে, নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন প্রাইমের ভিডিও তত মানুষ দেখছে না (অ্যাট লিস্ট, লিগ্যালি দেখছে না)। আবার কোনো একটা ছোট স্ট্রিমিং সাইটের যে অডিয়েন্স, তার তুলনায় নেটফ্লিক্স কিংবা অ্যামাজন প্রাইমের অডিয়েন্স বেশি থাকায়, সেখানেও সংখ্যাজনিত জটিলতা থেকে যাচ্ছে। তাই অরম্যাক্স যে তালিকা করছে প্রতি সপ্তাহের হিন্দি কন্টেন্ট নিয়ে, তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হচ্ছে কী না, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায় বরাবরই। 

অর্থাৎ পুরো কথাবার্তা থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার, কোনো একটি সিনেমার সাফল্য নির্ণয় করার প্রক্রিয়া আজকাল 
অনেক বেশি জটিল। যদি 'শেরশাহ' এর মত সিনেমা হয়, যে সিনেমা মাসখানেকেরও বেশি সময় ধরে স্ট্রিমিং সাইটে এক নম্বর জায়গা দখল করে রাখছে, যে সিনেমা নিয়ে নেতিবাচক কথাবার্তা নেই-ই বলতে গেলে, সেই সিনেমার ক্ষেত্রে হয়তো সহজেই 'ব্লকবাস্টার' তকমা দিয়ে দেয়া যাচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য সিনেমার ক্ষেত্রে চাপান-উতোর থাকছেই। নির্দিষ্ট ফলাফল আসছে না। দেখা যাচ্ছে, বড় বড় স্ট্রিমিং সাইট তাদের কোনো কন্টেন্ট মুক্তি পেলেই সেটিকে 'টপ টেন লিস্ট' এ এনে বহুল প্রচার করছে, কিন্তু তা যে শুধুমাত্র মার্কেটিং এর জন্যে, তা খুব সহজেই ধরতে পারা যাচ্ছে। সিনেমা ভালো নাকি খারাপ, তা নির্ধারণের জন্যে অনেকেইনআইএমডিবি রেটিং এর উপর ভরসা করেন। আজকাল এখানেও ঠিক ভরসা রাখা যাচ্ছে না। কারণ অ্যামাজনের আয়ত্তাধীন হওয়ায় এই ওয়েবসাইটে অ্যামাজনের কন্টেন্টকে টপচার্ট এ রাখার যে সম্ভাবনা, ম্যানিপুলেশনের যে শঙ্কা, তা মোটেও অমূলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। সুতরাং বিভ্রান্তি থেকেই যাচ্ছে। 

সব সিনেমা 'শেরশাহ' এর মতন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না! 

যদিও অনেকের ধারণা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে 'বক্স অফিস'ও তার স্বস্থানে ফিরবে। সিনেমার সাফল্য নির্ণয় করতে তখন হয়তো এত তরিবতও করতে হবে না আর। কিন্তু তা সত্বেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটাই, 'বক্স অফিস' না থাকার এ সময়টাতে দর্শক মতামতের গুরুত্ব বেড়েছে। সামাজিক মাধ্যমের আলোচনায় মানুষের অংশগ্রহণ বেড়েছে। প্রযোজকেরা নির্বিঘ্নে সিনেমা/সিরিজ স্ট্রিমিং সাইটের কাছে বিক্রি করে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকছেন। 'বক্স অফিস' এ সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়বে কি না, এ ভয় তাদের পেতে হচ্ছে না। এক্সপেরিমেন্টাল কাজও বেড়েছে। 'বক্স অফিস' না থাকা তাই অনেকক্ষেত্রেই বিস্তর এক সম্ভাবনা হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকট হচ্ছে এ ন্যারেটিভও, 'বক্স অফিস' এর অনুপস্থিতিতে কেউই অতটা অস্বস্তিতে নেই। বরং বলা ভালো, খানিকটা স্বস্তিতেই যেন আছেন সবাই। এবং এই স্বস্তির বিষয়টিই আশা দেখাচ্ছে সবাইকে। যে আশা নিশ্চিন্তে কাজ করার যেমন প্রেরণা দিচ্ছে, তেমনি গঠনমূলক মতামতের যথোপযুক্ত মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরী করছে। এবং এটাই 'বক্স অফিস' না থাকার প্রধানতম চমৎকারিত্ব। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা