বহুগুণে গুণান্বিত হলেও এই মানুষটির স্বকীয় ক্ষেত্র কত্থক নাচ, যে নাচে ক্রমশ অদ্ভুত পরাবাস্তব তৈরী করতেন তিনি। 'কত্থক নাচ' বিষয়টিই এরকম, নাচের মধ্য দিয়ে গল্প বলার এক দায় থাকে শিল্পীর। সে কাজটিই যেন স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়ে সুচারুভাবে করতেন তিনি। চোখ-মুখ-পুরো শরীর দিয়েই গল্প বলতেন। কত্থক নাচ নিয়ে যখনই মঞ্চে উঠতেন, দর্শক স্থানু হতো। ধীরে ধীরে সম্মোহনী ক্ষমতায় বুঁদ করতেন সবাইকে।

লক্ষ্ণৌ এর হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম তার। বাবা বিখ্যাত কত্থকশিল্পী অচ্ছন মহারাজ। সন্তানের জন্মের পরই অচ্ছন মহারাজ চিন্তাভাবনা শুরু করেন, নবজাতককে নিজের মত কত্থক নাচে দক্ষ করবেন তিনি। ঠিক সে কারণে খুব ছোটবয়স থেকেই নাচের তালিম দেন তিনি ছেলেকে। শুধু বাবাই না, বাবার পাশাপাশি কাকা শম্ভু মহারাজ ও লাচ্চু মহারাজের কাছ থেকেও নাচের পাঠ নেওয়া এই ক্ষুদেশিল্পী সাত বছর বয়সে প্রথমবারের মতন জনসম্মুখে নৃত্যশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। মঞ্চে ছেলের সাথে ছিলেন অচ্ছন মহারাজও। হাতছোঁয়া দূরত্বে থেকে ছেলের নৃত্যকলা দেখে তিনি বুঝতে পারেন, ছেলে তাকেও ছাপিয়ে যাবে একদিন! বলাই বাহুল্য, ছেলের নাচের তালিম নিয়ে আরো মনোযোগী হন তিনি। একসাথে দুজনে মঞ্চ ভাগাভাগি করতেন। নাচের রেওয়াজও তারা করতেন একসাথে। তবে একসাথে এই রেওয়াজ বেশিদিন করা হয়না তাদের। আচমকা একদিন ওপারে পাড়ি জমান অচ্ছন মহারাজ। তিনি যখন  অন্তিম যাত্রা শুরু করেছেন, তখন তার সেই সন্তান, ক্ষুদে সেই কথ্যকশিল্পীর বয়স নয়। যার ভালো নাম- ব্রিজমোহন নাথ মিশ্র। যাকে সবাই 'পণ্ডিত বিরজু মহারাজ' নামেই চেনে। তাকে নিয়েই আজকের কলমের খসখস। 

বাবার প্রয়াণের পরে 'পণ্ডিত বিরজু মহারাজ' সর্বাঙ্গে আঁকড়ে ধরেন কত্থক নৃত্যকে। নাচ নিয়ে ক্রমশই এগোতে থাকেন সামনে। খুব অল্পবয়সেই নামের সাথে 'পণ্ডিত' তকমা জুড়ে যায় তার। মাত্র ২৮ বছর বয়সে সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কারও জেতেন তিনি। নাচে তো পণ্ডিত ছিলেনই, দক্ষ ছিলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও। শুধু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতও বা কেন, ঠুমরি, দাদরা, ভজন,গজল... সিদ্ধহস্ত ছিলেন এসবেও। সত্যজিৎ রায়ের 'শতরঞ্জ কি খিলাড়ি'তে ঠুমরি গেয়েছেন। দেবদাস, বাজিরাও মাস্তানি, বিশ্বরূপম সহ ভারতের অজস্র সিনেমাতে কোরিওগ্রাফি করেছেন। এসবের পাশাপাশি ভারতীয় কলা কেন্দ্র এবং কথক কেন্দ্রের গুরুভারও বহন করেছেন আমৃত্যু। 

নৃত্যকলার তালিমও তিনি দিয়েছেন অনেককে! 

বহুগুণে গুণান্বিত হলেও এই মানুষটির স্বকীয় ক্ষেত্র কত্থক নাচ, যে নাচে ক্রমশ অদ্ভুত পরাবাস্তব তৈরী করতেন তিনি। 'কত্থক নাচ' বিষয়টিই এরকম, নাচের মধ্য দিয়ে গল্প বলার এক দায় থাকে শিল্পীর। সে কাজটিই যেন স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়ে সুচারুভাবে করতেন তিনি। চোখ-মুখ-পুরো শরীর দিয়েই গল্প বলতেন। কত্থক নাচ নিয়ে যখনই মঞ্চে উঠতেন, দর্শক স্থানু হতো। ধীরে ধীরে সম্মোহনী ক্ষমতায় বুঁদ করতেন সবাইকে। কত্থক নাচের পাশাপাশি বাজাতে পারতেন ড্রাম, তবলা ও নালও। বহু বাদ্যযন্ত্র অনায়াসে বাজিয়ে যেতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,  শুধু বাজানো ও গাওয়াতেই থেমে থাকেননি তিনি কখনো। দেশে-বিদেশে অজস্র মানুষকে গান ও বাজনার তামিলও দিয়েছেন তিনি বহুকাল ধরে। হয়েছেন সবার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক, পণ্ডিত ও গুরু।  

পণ্ডিত বিরজু মহারাজ! 

বহুগুণে গুণান্বিত এ পণ্ডিত মানুষের যে প্রয়াণ ঘটলো আজ, এবং এ প্রয়াণে যে শূন্যস্থান, তা পূরণ হবেনা, সেটুকু দ্ব্যর্থকন্ঠেই বলা সম্ভব। সে ক্ষত মস্তিষ্কে সজাগ থাকুক। পাশাপাশি, শ্রদ্ধাবনত চিত্তে দৃষ্টি থাকুক এই গুণী মানুষটির স্মৃতির প্রতিও। যুগের পর যুগ ধরে যেভাবে তিনি কত্থকনৃত্য এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে রঙিন করেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন, সেই কর্মযজ্ঞ থাকুক স্মরণে। তিনি ওপারে ভালো থাকবেন, সারা বিশ্বের শতকোটি ভক্তের স্মৃতিতে ভাস্বর থাকবেন, এটাই থাকুক কায়মনোবাক্যে প্রার্থণা। বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি রইলো। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা