'পাসুরি' বারো দিনে এগারো মিলিয়ন মানুষ তো দেখেছেই, রীতিমতো মহোৎসবই শুরু হয়েছে গানটিকে কেন্দ্র করে। বিখ্যাত মিউজিশিয়ান আলী শেঠী এবং নবাগত শিল্পী শে গিলের এই ডুয়েট গান এমনই শক্তিশালী আবহ তৈরী করেছে, এই 'পোলারাইজড ওয়ার্ল্ড' এর নানাবিধ গণ্ডিকে বিদীর্ণ করে জলোচ্ছ্বাসের মতই 'পাসুরি' ঢুকে যাচ্ছে নানা সংস্কৃতিতে, ভূগোলের নানা চলকে। গানের রিদম ও কম্পোজিশনই এমন, না চাইলেও খানিকটা নেচে উঠতেই হচ্ছে যেন আচমকা!

খুব বেশিদিন আগের কথা না৷ সিংহলি ভাষায় গাওয়া 'মানিকে মাগে হিতে' সর্বগ্রাসী জনপ্রিয়তা পেলো। গানের কথা বিন্দুমাত্র না বুঝেও শুধুমাত্র গানের সুরেই যেভাবে কাঁপলো গোটা বিশ্ব, তা বিস্ময়কর। আবার অন্যভাবে ভাবলে, এটাই তো হওয়ার কথা ছিলো! গানের মূল তাৎপর্য তো এরকমই। যত ভালো গানই হোক, যত অর্থবহই হোক মানে, সে গানের সুর যদি ব্যক্তিগত অন্দরমহলে প্রবেশের অনুমতি না পায়, তাহলে সে গান নিয়ে বোধহয় বেশিদূর এগোনোও যায় না। করা যায় না আদেখলেপনাও। কিন্তু, এমনও যদি হয়, গানের কথা বিস্তর যাচ্ছেতাই, অথচ সুর অপার্থিব, তাহলে দেশ-কাল-মানচিত্র  ভেঙ্গে সে গান যে অবধারিতভাবেই ঢুকে পড়ে জনজীবনের নানামুখী প্রকোষ্ঠে, সেও তো ধ্রুবসত্যি। সঙ্গীতের তো আসলে কোনো কাঁটাতার হয়না, হয়নো কোনো বর্ণ-গোত্র... এই অমোঘবাণী যখনই যেভাবে প্রমাণিত হয়, কেন যেন অদ্ভুত তৃপ্তি পাই। স্বস্তি পাই। 

পাকিস্তানের 'কোক স্টুডিও'র ১৪তম সিজন চলছে। এবং যেভাবে চলছে, অবস্থাদৃষ্টে বারবারই মনে হয়েছে, এবারের সিজন যেন গত যেকোনো বারের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দুর্দান্ত। এবং এই সিজনের চমৎকারিত্বকে যেন আরেকটু গ্লোরিফাই করার জন্যেই মুক্তি পেয়েছে বিশেষ এক গান, যে গানের টাইটেল- 'পাসুরি।' যে গান বারো দিনে এগারো মিলিয়ন মানুষ তো দেখেছেই, রীতিমতো মহোৎসব শুরু হয়েছে গানটিকে কেন্দ্র করে। বিখ্যাত মিউজিশিয়ান আলী শেঠী এবং নবাগত শিল্পী শে গিলের এই ডুয়েট গান এমনই শক্তিশালী আবহ তৈরী করেছে, এই 'পোলারাইজড ওয়ার্ল্ড' এর নানাবিধ গণ্ডিকে বিদীর্ণ করে জলোচ্ছ্বাসের মতই 'পাসুরি' ঢুকে যাচ্ছে নানা সংস্কৃতিতে, ভূগোলের নানা চলকে। অবশ্য, এতে বিস্ময়ও নেই সেরকম। গানের রিদমটাই এমন, না চাইলেও খানিকটা নেচে উঠতে হয় যেন। তাছাড়া এক গানের মধ্যে টার্কিশ, ইন্ডিক, আরব, পার্সিয়ান ফ্লেভার ব্লেন্ড করা, বাদ্যযন্ত্রের তালিকায় ইতালির ম্যান্ডোলিন থেকে তুর্কিস্থানের বাগলামা রাখা... সব মিলিয়ে এ বাউণ্ডুলে বোহেমিয়ান গানে খণ্ডে-বিখণ্ডে মিশে থাকে এই কমলালেবু গোলকের নানা অংশও। এবং ঠিক সে কারণেই, 'পাসুরি' নির্দিষ্ট কোনো গণ্ডিতে আটকে না থেকেই ক্রমশই হয়ে পড়ে সার্বজনীন।

পাসুরি! 

এ গানের যে মূল প্রোটাগনিস্ট অর্থাৎ আলী শেঠী, তিনি বেশ আগে থেকেই আমার বেশ প্রিয়। খুব প্রিয় এক সিনেমা 'The Reluctant Fundamentalist' এ তার গান শুনেছি। নোহ জর্জসনের সাথে কম্পোজিশনে তার গাওয়া 'খবর-ই-তাহায়ুর-ঈ-ইশক' আমার খুব প্রিয় এক গানও। সেই প্রিয় আলী শেঠীর 'পাসুরি' যে এরকম 'গ্লোবাল মিউজিক' এর স্ট্যাটাস পেয়ে যাবে , সেটা দেখা ব্যক্তিগতভাবে যে আমার জন্যে বেশ সন্তুষ্টির, তা বোধহয় আলাদা করে আর না বললেও চলে। প্রসঙ্গত জানাই, এই 'পাসুরি'র শুরুর দিকের গল্পটাও বেশ মজার। গত বছর বিশেষ এক কাজে আলী শেঠী যখন ফয়সালাবাদ থেকে ফিরছিলেন লাহোরের দিকে, তখন পাঞ্জাবের এক ট্রাকের পেছনে লেখা দেখলেন- 

Agg lavan majboori nu.

যার মানে করলে দাঁড়ায়- তোমার দুঃখে আগুন জ্বালাও। এই লাইনটা মাথা থেকে সরছিলো না তার৷ লাইনটি নৈরাশ্যের, আবার আশাবাদেরও। অদ্ভুতভাবে মাথায় ভর করে থাকলো লাইনটি। বিশেষ এ লাইন মাথা থেকে কিভাবে সরাবেন ভাবতে ভাবতে তার মাথায় এলো এই লাইনের পরের লাইন- 

Aan Jaan Di Pasoori Nu

আসা-যাওয়ার সংঘর্ষ।  আসা-যাওয়ার বিড়ম্বনা। আসা-যাওয়ার চিন্তা।

আলী শেঠী! 

এরপর আর ভাবতে হলোনা। লাইন এগোতে লাগলো তরতর করে। এবং আলি শেঠী, যিনি নিজেকে দাবী করেন 'মডার্ন ওয়ার্ল্ড জিপসি' বলে, যাকে কাজের সূত্রে পাকিস্তান-আমেরিকা ভ্রমণ করতে হয় নিয়মিত, যাকে নানা সীমান্তের চৌহদ্দি'তে নাকাল হতে হয় বারবার, তিনি ভাবলেন- এমন এক ফরম্যাটে এই গান তৈরী করিনা কেন, যে গানে ঘুচে যাবে সীমান্ত, কাঁটাতার, লোকাচার। এবং এভাবেই জন্ম 'পাসুরি'র। যে গানে তিনি সীমান্তজনিত ক্লেশ-বিদ্বেষ কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানজনিত সংকীর্ণতাকেই যেন প্রচ্ছন্নভাবে নিলেন একহাত। বোঝালেন- সঙ্গীতের সর্বগ্রাসী মহিমাও! 

যদিও এ গানের পেছনে আলী শেঠীর ভূমিকা সিংহভাগ, তবুও এ কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য, এ গান আলী শেঠীর যতটুকু, এ গান নবাগত শিল্পী শে গিলেরও ঠিক ততটুকু। কোক স্টুডিওতে প্রথমবারের মত গাইলেন এই তরুণী, গাইলেন আলী শেঠীর সাথে, বড় বড় মিউজিশিয়ান ও আর্টিস্টদের পাশে, 'কোক স্টুডিও' এর বিশাল এক দক্ষযজ্ঞে... স্বভাবতই পুরোটা সময়ে প্রচণ্ড নার্ভাস রইলেন তিনি। কিন্তু, অদ্ভুত বিষয়, যখন গাওয়া শুরু হলো- কী দারুণ করেই না গাইলেন! আলী শেঠীর কন্ঠের সাথে শে গিলের অন্যরকম সজীব এক কন্ঠে এমন এক মেলবন্ধন হলো, হলো এমন রসায়ন... অসংজ্ঞায়িত। স্রেফ দুর্দান্ত!

মুগ্ধতা বজায় রইলো শে গিলের কন্ঠেও! 

আর এ গানের সেট ডিজাইনও হলো দেখবার মত। পাকিস্তানের একান্নবর্তী পরিবারগুলোর যেরকম সম্মিলিত উঠোন হয়, যেখানে দিন গড়িয়ে বিকেলে হলেই সব পরিবারের সবাই একত্রে আড্ডা, হাসি-কান্না, খুনসুটিতে মশগুল হয়... সেরকম এক উঠোনের থিমে গড়ে উঠলো সেট। গাওয়া হলো পাসুরি। গান চলছে। পাশাপাশি চললো প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী সীমা কিরমানির বিমূর্ত ধ্রুপদী নৃত্যও। একটা গানকে ভিজ্যুয়ালি স্টানিং এবং অর্থবহ করতে আর কীই বা দরকার হয় বিশেষ?

সীমা কিরমানির নৃত্যেও বজায় রইলো মুগ্ধতা! 

প্রখ্যাত লেবানিজ-আমেরিকান সাহিত্যিক খলিল জিবরান বলেছিলেন-

সঙ্গীত আর কিছুই না, সঙ্গীত স্রেফ আত্মার ভাষা৷ 

'পাসুরি' যেন সে বাক্যকেই সমর্থন করে পুরোমাত্রায়। আলী শেঠী যেমন চেয়েছিলেন- এ গান স্পর্শ করুক সবাইকে। চেয়েছিলেন- বিভেদের পৃথিবীতে অন্তত একটি গানের নাতিদীর্ঘ সময়ের সঞ্জীবনীসুধা গণমানুষের যাপিত ক্ষোভ ভুলিয়ে দিক। ঠিক সেটাতেই যেন রূপান্তরিত হয় 'পাসুরি। বৈশ্বিক হয়ে ওঠার দায় চমৎকারভাবেই যেন মেটায় বিশেষ এই আর্টিস্টিক ক্রিয়েশন। এবং ঠিক এ কারণেই, এ ক্রিয়েশনে মুগ্ধতা ক্রমশই বাড়ে। বাড়তেই থাকে। পাশাপাশি প্রত্যাশাও তৈরী হয়। যে প্রত্যাশায় মিশে থাকে- গান নিয়ে এরকম বৈশ্বিক নিরীক্ষা আরো হওয়ার আকাঙ্খা। কারণ, বিভাজনের এই পৃথিবীতে অন্তত গানও যদি থাকে বৈশ্বিক, নিরপেক্ষ...  এই প্রতিকূল সময়ের সাপেক্ষে তাও তো কম নয় মোটেও!

​​​​​


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা