মনি রত্নমের সিনেমাগুলো যদি একটানা কেউ দেখে যান, তাহলে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট হবে- এই মাস্টার ডিরেক্টর গল্প বলার এক পর্যায়ে অডিয়েন্সকেও গল্পের পার্ট করে ফেলেন। যেটা এ সিনেমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। যে কারণে, 'পনিয়েন সেলভান'ও বিশেষভাবেই দাগ কেটেছে ভেতরে...

বিখ্যাত কোনো সাহিত্য থেকে সিনেমার অ্যাডাপ্টেশন যখন হয়, তখন একটা তুলনা চলেই আসে। বইয়ের কতটুকু নেয়া হচ্ছে আর কতটুকু হয়ে যাচ্ছে ছাঁটাই, কেনই বা পুরোটুকু নেয়া হচ্ছেনা, তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা আলোচনাও হয়। ঠিক যে প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, বই আর সিনেমার ন্যারেশন এক হয় না। হওয়া উচিতও না। মূল গল্পকে মাথায় রেখে ডিরেক্টর যদি নতুন কিছু নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট নাই করেন, তাহলে সিনেমার যে ভিজ্যুয়াল ট্রিটমেন্ট, সেটার সাথে অন্যায় করা হয়। সত্যজিৎ রায়ের কথাটুকু মানলে অনেক বিতর্কের আগুনেই জল পড়ে যায়। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, তর্কপ্রিয় মানু্ষ এই নির্জলা সত্যিটুকু মানতে চান না। পাঠক হিসেবে বই পড়ে তারা যেভাবে ভেবেছেন সব, সিনেমায় সেরকম সবকিছু না এলে, তারা হয়ে পড়েন খুঁতখুঁতে। ক্ষেত্রবিশেষে অধৈর্যও। বিপত্তি ঠিক তখনই হয়।

যেমনটা হতে পারতো মনি রত্নমের ম্যাগনাম ওপাস 'পনিয়েন সেলভান' এর ক্ষেত্রেও। 'হতে পারতো' বলার কারণ, 'পনিয়েন সেলভান' এর সিনেম্যাটিক ট্রান্সফরমেশন এতটাই অসাধারণ, সেই ট্রান্সফরমেশনে খুঁত ধরবে এমন মানুষও খুব বেশি হবার কথা না৷ সবারই জানা, কল্কি কৃষ্ণমূর্তির এপিক 'পনিয়েন সেলভান' এমনই দুর্দান্ত, সময়ের নানা বাঁক ঘুরে এসেও এখনো এ বই এতটাই প্রাসঙ্গিক, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। বলা হয়, তামিল ভাষা জানে অথচ জীবদ্দশায় কখনো 'পনিয়েন সেলভান' পড়েনি, এমন মানুষ হয়তো খুঁজেও পাওয়া যাবেনা। তো, এরকম এক বই, যে বই হাতের তালুর মতই পরিচিত সব তামিলিয়ানের, সে বই থেকে যখন সিনেমা করা হচ্ছে, তখন খানিকটা প্রত্যাশা থাকেই। এবং, ডিরেক্টর'স চেয়ারে 'মনি রত্নম'কে দেখে বোধহয় সে প্রত্যাশার পারদ বহুগুণে বেড়েও যায়। 

শুরু থেকেই চমক দেখিয়েছে পনিয়েন সেলভান

তবে সে বাড়বাড়ন্ত প্রত্যাশার কথাকে মাথায় না রেখে মনি রত্নম যেভাবে নিজস্ব ধাঁচ বজায় রেখে এই এপিক'কে নিয়ে এগোন, অডিয়েন্সের তুষ্টির কথা না ভেবে নিজের সন্তুষ্টিকেই রাখেন অগ্রভাগে,  সেটাই মূলত হয়ে থাকে সিনেমার ইনিশিয়াল মোমেন্টাম। যদিও যারা 'পনিয়েন সেলভান' পড়েননি, তাদের জন্যে চরিত্রগুলোর নাগাল পাওয়া প্রথমদিকে খানিকটা কঠিনই হবে। তবে, সময় গড়ালে যে চরিত্রেরা ক্রমশ স্পষ্ট হবে, সন্দেহ নেই তাতেও।  টিপিক্যাল পিরিয়ড ফিল্মগুলোর মত শুরুতেই চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয়ের যে সংস্কার, সেই সংস্কারের পথে না হেঁটে নির্মাতা হয়তো চাচ্ছিলেন- গল্পের সাথে সাথেই খোলাসা হোক সবার ঠিকুজিকোষ্ঠী। হয়ও ঠিক সেটাই। ধীরে ধীরে প্রকাশিত হন সবাই। এবং যেহেতু 'পনিয়েন সেলভান' এর দুই খণ্ড আসবে, সেহেতু প্রথম খণ্ডে ক্যারেক্টার স্টাবলিশমেন্টেই সমস্ত আগ্রহ কেন্দ্রীভূত  রাখার এ বিষয়টিও বেশ ইতিবাচক হিসেবেই দ্রষ্টব্য হয়। অগত্যা, গল্প ধীরে ধীরে এগোয়। কখনো গতি বাড়ায়৷ কখনো কমায়৷ চরিত্রদের মনস্তত্ব নিয়ে দর্শককে ধীরে ধীরে ওয়াকিবহালও করে। 

'পনিয়েন সেলভান' এ যেসব মূখ্য চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে অনেকেরই ক্যারেক্টার শেড খানিকটা গ্রে। একবাক্যে কাউকে 'ব্ল্যাক' কিংবা 'হোয়াইট' ক্যাটাগরিতে ফেলা যাবে, এটা এ গল্পের ক্ষেত্রে হয় না। বেশ কিছুদিন আগে প্রথম সিজন শেষ করা 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর অধিকাংশ চরিত্রের মতই 'পনিয়েন সেলভান' এর কুশীলবেরাও জটিল মনস্তত্বের। বিশেষ করে মূখ্য দুই নারী চরিত্র- নন্দিনী (ঐশ্বরিয়া রায় বচ্চন) এবং কুন্দাবাই (তৃষা) যেভাবে 'ধূসর' আবহ নিয়ে পুরো সিনেমাতে বিস্তার করেন, গতিপথ, তাতে মুগ্ধতা বাড়ে। কুন্দাবাই এর কুটিল প্যাঁচ, নন্দিনীর দ্বৈতসত্তা... ক্ষণেক্ষণে চমকেও দেয়!  

মূল বইয়ের যে কাহিনী, সে কাহিনী অনুযায়ী সিনেমা বানাতে গেলে 'গেম অব থ্রোন্স' এর দুই তিন সিজনের মত রানটাইম লাগতো। কিন্তু এখানে মনি রত্নম যা করলেন, প্রত্যেক ক্যারেক্টারকে খুব সাটল ন্যারেশনে স্টাবলিশ করলেন। নন্দিনীর সাথে আদিত্য কারিকালানের সম্পর্কজনিত জটিলতা, নন্দিনী ও কুন্দাবাই এর মুখোমুখি বাক্যবাণ, তাদের সর্পিল বুদ্ধির মারপ্যাঁচ, পনি সেলভানের ক্লিন ইমেজের সাথে মিথিক্যাল ফোকলোরের কানেকশন, বল্লভারাইয়ান এর কমিক্যাল অ্যাডভেঞ্চার...  টুকরো টুকরো দৃশ্যে চরিত্রদের লেয়ারগুলো এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো, বইয়ের চরিত্রগুলোর স্পিরিট এমনভাবে এলো পর্দায়, বাজিমাত হলো সেখানেই। এখানে 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এর উদাহরণ টানতে হবে আবার। 'হাউজ অব দ্য ড্রাগন' এ বড় বড় টাইমজাম্পে ক্যারেক্টারদের মুখাবয়ব পালটে গেলেও শো-রানার'রা এই ক্যারেক্টারদের এমন কিছু সিচুয়েশনের মুখোমুখি করেছিলেন, যার বদৌলতে আমরা এই ক্রমশ পালটে যাওয়া চরিত্রগুলোর সাথেও নৈকট্য অনুভব করেছি শেষটায়। যেটা পাওয়া গেলো 'পনিয়েন সেলভান'এও।

খুব ক্রিটিক্যাল এক ক্যারেক্টার সামলেছেন বিক্রম 

মনি রত্নম আলাদা করে কাজ করেছেন ভিজ্যুয়াল পোর্ট্রেয়ালেও। এই ম্যাগনাম ওপাসে ভিজ্যুয়াল অ্যাসথেটিকসের কমতি ছিলো না মোটেও। যুদ্ধের দৃশ্যগুলোও যথাযথ। সেট ডিজাইনেও যে প্রবল অর্থব্যয় হয়েছে, সিনেমায় দ্রষ্টব্য সেটিও। তবে এসব দেখে চক্ষু চড়কগাছ হবে, এমনও না। কারণ, রাজামৌলি'র 'আরআরআর' কিংবা 'বাহুবলি'পরবর্তী এ সময়ে গ্রান্ড ক্যানভাসের দৃশ্য খুব একটা অপরিচিতও না। তবে, মনি রত্নম যেভাবে মেটাফোরিক্যাল ট্রিটমেন্টে ভিজ্যুয়াল বিউটি নিয়ে ভেবেছেন, সেটা খানিকটা অন্যরকম। নন্দিনী ও কুন্দাবাইয়ের যখন এন্ট্রি হচ্ছে সিনেমায়, তখন স্নিগ্ধতার অদ্ভুত আলোয় অন্যরকম আবহ এসেছে। সে সাথে এ আর রহমানের মিউজিক্যাল ট্রিটমেন্টে পুরো ডেকোরেশনই পৌঁছে গিয়েছে অপার্থিব সিনারিওতে। আবার, মেল প্রোটাগনিস্টেরা যখন এন্ট্রি নিচ্ছে, তখন চারপাশে যুদ্ধের দামামা, সে সাথে সাসপেন্স মিউজিক। মনি রত্নম আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করেছেন, কাউকে অতিমানব হিসেবে দেখান নি। এ গল্পের চরিত্রেরাও রক্তমাংসের মানুষ। সীমাবদ্ধতা তাদেরও আছে। মনি রত্নম এপিক বানাতে গিয়েও গ্রাউন্ডেড স্টোরি ন্যারেশন থেকে যে পিছপা হননি, ক্যারেক্টারদের এই পোর্ট্রেয়ালই তার বড় প্রমাণ।

নন্দিনী, কুন্দাবাই

যদিও এই ম্যাগনাম ওপাসে প্রশংসার দিকই বেশি, তবুও 'পনিয়েন সেলভান' এর প্রথম কিস্তিতে যে খুঁত নেই, এমনটাও না। 'বাহুবলী' যারা দেখেছেন, তাদের কাছে 'পি এস-ওয়ান' আহামরি কিছু মনে হবে না। সিনেমার কমিক্যাল অংশগুলো আরেকটু কাটছাঁট করা যেতে পারতো। ক্যারেক্টারগুলোকে প্রথমেই ইন্ট্রোডিউস করালে শুরু থেকেই অনেকের বুঝতে সুবিধে হতো। 'পনিয়েন সেলভান'কে আরেকটু রানটাইম দেয়া যেতে পারতো। কিছু চরিত্রের আরেকটু স্পেস পাওয়া দরকার ছিলো। তবে, যেহেতু এ গল্পের আরেকটা অংশ বাকি আছে, অনেক প্রশ্নের উত্তর সেখানে পাওয়া যেতে পারে। তাই এ খুঁতগুলোকে খুব বড় করেও দেখা যাচ্ছে না। 

মনি রত্নমের সিনেমাগুলো যদি একটানা কেউ দেখে যান, তাহলে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট হবে- এই মাস্টার ডিরেক্টর গল্প বলার এক পর্যায়ে অডিয়েন্সকেও গল্পের পার্ট করে ফেলেন। যেটা এ সিনেমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। যে কারণে বল্লভারাইয়ান এর অ্যাডভেঞ্চার,  রাষ্ট্রকূট এর যুদ্ধে আদিত্য কারিকালান এর সোর্ড-ফাইট, শেষের ক্লাইম্যাক্সে বল্লভারাইয়ান এবং পনি সেলভান এর এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস... সবকিছুর সাথেই দর্শক অ্যাটাচড হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছে। এবং তারা অ্যাটাচড হয়েছেও। যে কারণেই, ক্রমশ সংকুচিত হওয়া সিনেমার যুগেও পৌনে তিন ঘন্টার এ বৃহৎ সিনেমা বিরক্তির সুযোগ রাখেনি বিন্দুমাত্র। এবং, যে জন্যে, বাহাত্তর বছরের পুরোনো এক কালজয়ী সাহিত্যের অ্যাডাপ্টেশনেও মানুষ 'পান থেকে চুন খসার' অভিযোগের সুযোগ পায়নি। মনি রত্নমের এক্সিলেন্স ঠিক এখানেই। নিজের বয়ানেই তিনি বলে গিয়েছেন এক পৌরাণিক গল্প। এবং যে বয়ানেই দিনশেষে তিনি করেছেন কিস্তিমাত!  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা