পরীমনির ধর্ষণের অভিযোগের নিচে এখন পর্যন্ত প্রায় চুয়াল্লিশ হাজার হাহা রিয়াকশন! ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই কিউট না। এই চুয়াল্লিশ হাজার মানুষ নামের অমানুষ তাদের রুচি, মানবিকতা এবং বিবেক বিসর্জন দিয়েছে চিরদিনের মতো...

আজকের দিনে এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো চিত্রনায়িকা পরীমনি, ফেসবুকে তার খোলা চিঠি এবং কিছুক্ষণ আগে তার বাসায় অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্স। পরীমনি অভিযোগ করেছেন তিনদিন আগে মুখে কাচের বোতল ঢুকিয়ে, মাটিতে ফেলে দিয়ে তাকে রেপ ও হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। তার আগে ড্রাগ বা ওই জাতীয় কিছু দেয়া কফি খাওয়াবার চেষ্টা করা হয়, একটা সময় পরীমনি পরিস্থিতি দেখে ভয় পেয়ে বাড়ি যেতে চাইলে বাধা দেয়া হয় তাকে। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সেদিন পরীমনি বাসায় তো ফিরেছেন কিন্তু সেদিনের পর থেকেই সেই বীভৎস রাত এবং জীবনের ইনসিকিউরিটি নিয়েই প্রতিটা ক্ষন কাটাচ্ছেন এই চিত্রনায়িকা। 

আমাদের এই শিক্ষিত এবং আধুনিক সমাজের বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবান ক্যাটাগরির নাসিরুদ্দিন আহমেদ নামের সেই লোক আর তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সেই রেপ ও হত্যাচেষ্টার মামলাও পুলিশ প্রথমে নিতে চায়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি। এমনকি পরিচিত কারো কাছ থেকেই কোনো রকম সহযোগিতা না পেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি আপলোড করেছেন। এবং পরে গণমাধ্যম কর্মীদের বাসায় ডেকে কান্না জড়ানো অবস্থায় সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার বর্ননা দিয়েছেন। 

এই পর্যন্ত ঘটনা কিন্তু খুবই স্বাভাবিক, পরীমনি জায়গায় অন্য যেকোনো নায়িকা হোক বা সাধারণ ঘরের মেয়েও এটাই হয়তো করতো তবে নায়িকা নয় বলে হয়তো গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের নিয়ে এই আলোচনাটা হতো না। রেপ হলে বা আত্নহত্যা অথবা খুন না হলে আমরা আবার এসব খবরকে পাত্তা দেইনা। কারন মুখে যাই বলি সিনেমা বা মিডিয়ার গ্ল্যামার বা আলোর ঝলকানি বলে একটা ব্যাপার তো আছেই। 

আর নায়িকা বা মিডিয়ার সাথে জড়িত কেউ হলে এই টপিকে আলাপটা এমনিতেই একটু রসিয়ে রসিয়ে করাতো অনেকের জন্য বড়ই আনন্দের। একটু ভেবে দেখেন তো একজন আলোচিত নায়িকা গত তিনদিন তার পরিচিত সব জায়গায় সাহায্য চেয়েও পাননি। নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি লিখতে হয়েছে। সেখানে সমাজের অন্য নারীদের অবস্থাটা আসলে কি? মুনিয়ারা যদি আত্নহত্যাও কুরে থাকে তাহলে সেই সিদ্ধান্ত নিতে তাদের কতোটা অসহায় আর ভয়ংকর সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়!

সংবাদ সম্মেলনে পরীমনি

তবে যাদের মেরুদণ্ড এখনো কাজ করছে, বিবেক বুদ্ধি এবং মনুষ্যত্ব একেবারে মারা যায়নি তারা বাকি অংশ পড়ার আগে পরীমনির ফেসবুক পেজের কমেন্ট সেকশনটা প্লিজ দেখে আসুন। আমি শেষবার দেখে এসে লেখা শুরু করার আগে পর্যন্ত পরীমনির রেপের অভিযোগের নিচে এখন পর্যন্ত ত্রিশ হাজারের বেশি হাহা রিয়াকশন! ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই কিউট না। অনন্ত এটা বলা যায় এই ত্রিশ হাজার মানুষ নামের অমানুষ তাদের রুচি, মানবিকতা এবং বিবেক বেচে দিয়েছে। মিডিয়ার সাথে জড়িত একটা মেয়েকে নিয়ে এমন হতেই পারে এই ধারনা কি এই আধুনিক সমাজে একদিনেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? না একদিনেই না। এটা একটা লম্বা সময় ধরে বিপথে চলার ফলাফল।  

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখানোর সাথে সাথে বিকৃত সমাজ ব্যবস্থা এবং জাজমেন্টাল জাতির দেশ বলেও আমরা নিজেদের প্রমান করতে মরীয়া হয়ে আছি। এবং এই দায় শুধু বিকৃত কিছু মানুষ নয় আমাদের তথাকথিত আধুনিক সিস্টেম এবং বিচার-ব্যবস্থার উপরও বর্তায়। কারন এইদেশে ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা যারা ঘটায় তারা পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হইলে মাথা উচু করে ঘুরে বেড়ায় আর ভিক্টিম আর তার পরিবার বিচার না পেয়ে হয় আত্নহত্যা করে অথবা ঘটনা চাপা দেবার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ অনুভব করে ক্ষমতাশালীদের কাছ থেকে। আমরা ধরেই নিয়েছি যে, এদেশে ধর্ষকদের বিচার হবেনা, কারন হয়নি। 

পরীমনিকে একটা ধন্যবাদ দেয়া যায় যে, তিনি এই ভয়ংকর সময় পার করার মাঝেও এই সাহস দেখিয়েছেন। একজন মুখোশধারীর আসল চেহারা সামনে নিয়ে এসেছেন। হ্যা অবশ্যই এই ঘটনার তদন্ত হবে, ঘটনার সত্য-মিথ্যা প্রকাশ করা হবে। আসল অপরাধী যেনো শাস্তির আওতায় আসে সেটি যেকোনো সুস্থ মানুষের কাম্য। প্রমানিত হবার আগে কাউকে অপরাধী বলা উচিত নয় কিন্তু তাই বলে পরীমনির বক্তব্য শুনে, দেখে একজন নায়িকা বলেই তাকে এবং তার জীবন যাপন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার আমাদের অধিকার কারো নেই। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগামী কয়দিন কি হবে আমরা মোটামুটি সবাই জানি। যেকোনো ইস্যুতে দুইভাগে বিভক্ত হওয়াটা আমাদের আদিম প্রবৃত্তি। এবারো তাই হতে যাচ্ছে লিখে রাখতে পারে। একটা পক্ষ বিচার চাইবে আরেকপক্ষ পরীমনির সম্পর্কে চায়ের দোকানে, কফিশপে বা বন্ধুদের আড্ডায় দরাজ গলায় বলবেন এবং ফেসবুকে বিভিন্ন পোষ্টে কমেন্ট সেকশনে লিখবে যে, আরে ও তো নায়িকা, নায়িকা মানেই তো এমন। এদের চরিত্র থাকে নাকি!! খোজ নিলে দেখা যাবে যে টাকা চাইছে সেটা পায় নাই তাই এই তামাশা। তাদের কমেন্ট পড়েই আমাদের বুঝতে হবে যে, নায়িকা মানেই বেশ্যা বা পতিতা অথবা প্রস্টিটিউট। তাই পকেটে টাকা থাকলেই চাহিবা মাত্র নায়িকাকে বা নায়িকাদের রেপ করাই যায় এটা বিশাল কোনো ইস্যু না। 

এই নাসির মাহমুদের বিরুদ্ধে পরীমনি ধর্ষণ ও খুনের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন

আবার সাথে সাথে যোগ হবে পরীমনির কিছু ছবি নিয়ে সমালোচনা। যে ড্রেসে বলিউড বা হলিউডের নায়িকা ছবি আপলোড দিলে হট, ক্ল্যাসি বা অসাধারণ সুন্দর আমাদের নায়িকারা সেই ড্রেসের ছবিতেই মাল, বেশ্যা বা আরো খারাপ কিছু। আর ধর্মের দোহাই দেয়া কিছু মানুষ তো আসবেনই এসব সেকশনে। কিন্তু মাদ্রাসায় ছটা বাচ্চা ছেলেদের রেপের ঘটনায় এরা কেনো যেনো খুব নীরব!!! আর পেশা, পোষাক বা জীবন-যাপন ধর্ষন করার এক্তিয়ার দিয়ে দেয় সেই সমাজ বা দেশ সামনে কতোটা কি অর্জন করবে তা চিন্তা করার সাহস হয়না। 

সামনে কি হবে? এই ঘটনা কতোদূর যাবে আমরা জানিনা। কারন এদেশে বিত্ত এবং ক্ষমতা রাতকে দিন বা দিনকে রাত বানাতে পারে। এইতো কয়দিন আগের কথা বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান যার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা তিনি স্বপরিবারে দুবাই ঘুরে আসলেন। এসে আবার একটা এসোসিয়েশনে ভোটে জিতলেন। তাকে ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসলো কতো মানুষ। সেই অনুষ্ঠানে তার সাথে সেল্ফি তুলে গর্বের হাসিও হাসলেন। পরীমনির ধর্ষন চেস্টা এবং হত্যা চেস্টার ব্যাপারটা জানিয়ে দেবার কারনে একটাই সুবিধা হলো যে, আমরা অনেকেই উপর মহলের লোকজনের সাথের বন্ধু বা ভাই-ব্রাদারদের আরো একটা ভয়াবহ ছবি পেলাম।

‘যা দেখছো তা তা না’ চিরকুটের জনপ্রিয় এই গানের মতোই আসলেই যা দেখি সেটাই সত্য না। উত্তরা বোট ক্লাবের মতো অভিজাত জায়গায় যেখানে সাধারণ মানুষ ঢোকার অনুমতি পায় না, সেখানে শিক্ষিত, আধুনিক, রুচিশীলতার মুখোশ পড়ে অমানুষ আর জানোয়াররা নিযেদের ফ্যান্টাসি মেটাতে উদগ্রীব ভাবে অপেক্ষায় থাকে। আসলেই তো এতো টাকা দিয়ে ভোগ-বিলাশ মেটানোর জন্য এমন সুন্দর পরিবেশ না হলে ক্যামন যেনো দেখায়!!  

আর একটা বিষয় উল্লেখ না করে পারছিনা। অনুমতি না নিয়ে নিজের বিবাহিত স্ত্রীর সাথেও যৌনকর্ম করার অধিকার একজন স্বামীর নাই। কেউ অনুমতি ছাড়া এটা করলে স্ত্রী চাইলে ‘ম্যারিটাল রেপ’ এর অভিযোগ করে বিচার চাইতে পারে। সেখানে একজন বোরকা পড়া মুসলিম বোন, একজন সাধারণ হিন্দু মেয়ে, একজন আদিবাসী নারী, একজন নায়িকা বা রাতের বেলায় অল্প কয়টা টাকার জন্য শরীর বেচা পতিতার বেলায়ও আইন কিন্তু একই। তাই কোনোভাবেই কোনো যুক্তিতেই এই ঘটনার পক্ষে দাড়ানো বা পরীমনির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অশ্লীল এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পারিনা আমরা। 

খুব বিশ্বাস করতে এবং আশাবাদী হতে ইচ্ছা হয় যে, এই ঘটনার সাথে সাথে অসংখ্য বিচারাধীন ধর্ষণ কেসের মীমাংসা হবে। অপরাধীরা শাস্তি পাবে, এবং ভিক্টিম ন্যায়বিচার পাবে। জানি এটা অলীক স্বপ্ন ছাড়া কিছুই না তবুও এই স্বাধীন দেশে এই স্বপ্নটুকু নিয়েই আমাদের কোনভাবে পার করতে চাওয়া এইসব দিনরাত্রি।


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা