রিয়ার ক্ষেত্রে হোয়াটস অ্যাপের চ্যাট লিক হয়েছিল, পরীমনির বেলায় ভাইরাল করা হচ্ছে ভিডিও। মিডিয়া আর জনতা জনার্দনের উইচ হান্ট মিশনের শিকার হয়েছিলেন রিয়া, হচ্ছেন পরীমনিও। একজন মানুষ অপরাধী হলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাটা তার নাগরিক অধিকার, সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে- এটা বোঝার মতো ঘিলু কি আমাদের মাথায় নেই?

গত বছরের ঘটনা। বলিউডি নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুত আত্নহত্যা করলেন আচমকা। সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেল তার নিথর শরীর। বলিউড তো বটেই, গোটা ভারত, এমনকি বাংলাদেশও কেঁপে উঠেছিল সম্ভাবনাময় তরুণ এক অভিনেতার এমন আকস্মিক অন্তর্ধানে। 

প্রাথমিক শোক কাটতেই শুরু হলো আঙুল তোলার পালা। প্রথমে টার্গেট হলেন করণ জোহর বা সালমান খানের মতো বিগ শটরা। বলা হলো, নেপোটিজমের কারণেই নাকি সুশান্ত কাজ পাননি, বিভিন্ন সিনেমা থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল তাকে, আর তাই অবসাদে ভুগে নিজেকে শেষ করেছেন সুশান্ত। তালেবানদের মতো একের পর এক ভিডিওবার্তা পাঠিয়ে কঙ্গনা রনৌত নামের এক ফেমসিকার নায়িকাও যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার। 

কিন্তু ঘটনার মোড় ঘুরে গেল খুব দ্রুতই। জানা গেল, মাদকে আসক্ত ছিলেন সুশান্ত। এবার সামনে এলো সুশান্তের প্রেমিকা রিয়া চক্রবর্তীর নাম। তিনিই নাকি মাদক সরবরাহ করতেন সুশান্তকে। তদন্তে নামলো নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্ট। ভারতের মিডিয়া, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলো নামলো রিয়ার চরিত্রহননের কাজে। প্রতিদিন নতুন নতুন মনগড়া কথাবার্তা এনে হাজির করা হতো, ছড়ানো হতো গুজব। মানুষও সেই গুজব গলা পর্যন্ত গিলতো। শুধু সুশান্ত টপিকে রিয়ার ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন করেই অর্ণব গোস্বামীর রিপাবলিক টিভি টিআরপি লিস্টের এক নম্বরে উঠে এসেছিল। 

ভারতে তখন করোনার প্রথম ধাক্কা চলছে, কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন, বেকার দিন কাটাচ্ছেন, হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক শত শত মাইল হেঁটে নিজেদের কর্মস্থল থেকে বাড়ি পৌঁছেছে, রাস্তায় মারা গেছে অনেকে। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, পেট্রোল-ডিজেল আর এলপিজি গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী, দেশ পরিচালনায় মোদি সরকার চরমভাবে ব্যর্থ- সেসবের খবর নেই মিডিয়ায়। টিভি চ্যানেলগুলো খবর করছে, রিয়া কার কাছ থেকে কি ড্রাগ নিতেন, কীভাবে সুশান্তকে কালোজাদু করে নিয়ন্ত্রণে রাখতেন- এসব নিয়ে। এক চ্যানেলে তো তান্ত্রিক ধরে এনে প্ল্যানচ্যাট করে সুশান্তের আত্মাকেও নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভারতের টিভি মিডিয়া যে কত বড় কৌতুকে পরিণত হয়েছে, তার চমৎকার একটা কেস স্টাডি হতে পারে সুশান্তের আত্মহত্যার ঘটনাটা।

রিয়ার জীবনটা অতিষ্ঠ করে দিয়েছিল ভারতের মিডিয়া

ঢাকাই চলচ্চিত্রের নায়িকা পরীমনির বাসায় হানা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। শত শত র‍্যাব সদস্যের উপস্থিতিতে তার ঘর থেকে উদ্ধার হয়েছে দেশী বিদেশী বেশ কিছু মদের বোতল। সেসবের কিছু ভর্তি ছিল, কিছু ছিল খালি। সেগুলো ফলাও করে প্রচার করা হলো। মিডিয়াও অনেকদিন পর মনমতো একটা টপিক পেয়ে নড়েচড়ে বসলো, আমাদের খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল আর ফেসবুকের নিউজফিড ভর্তি হয়ে গেল পরীমনিতে। যেন কয়েক বছর ধরে পুলিশকে তটস্থ করে রাখা কোন গ্যাংস্টার বা সিরিয়াল কিলার ধরা পড়েছে! 

পরীমনির অপরাধটা কী, এটা গবেষণার বিষয়। তিনি মদ্যপান করেন, তার বাসায় মিনি বার আছে, ক্লাবে গিয়ে তিনি অভব্য আচরণ করেন, তিনি দেশ বিদেশে 'প্লেজার ট্রিপে' যান, এসব কী অপরাধ? ঢাকা শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে হানা দিলে হাজার হাজার মদের বোতল পাওয়া যাবে। এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যেরাও এই ত্রুটি থেকে মুক্ত নন পুরোপুরি। তাহলে সব দোষ পরীমনি ঘোষ হওয়ার কারণ কী? 

প্লেজার ট্রিপে পরীমনি যদি গিয়েও থাকেন, একা নিশ্চয়ই যাননি। যে পুরুষটির বা পুরুষদের সঙ্গে তিনি গিয়েছিলেন, তাদের কেউ কি পরীমনির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছে? কেউ কী বলেছে যে পরীমনি তাদেরকে ব্ল্যাকমেল করে টাকা দাবী করেছেন? তাহলে কেন পরীমনিকে 'রাতের রাণী' কিংবা 'নিশিকণ্যা' উপাধিতে ভূষিত করছেন প্রশাসনে কর্মরত লোকজনই? এসব দেখেশুনে পরীমনিকে দুটো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের মাঝখানে ফেঁসে যাওয়া একটা চরিত্র ভাবতে খুব বেশি বুদ্ধি ঘটে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। 

দেশে একশো একটা সমস্যা আছে। করোনায় প্রতিদিন দুই আড়াইশো করে মানুষ মারা যাচ্ছেন অফিসিয়ালি। করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন এর দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষ। লকডাউন কখন থাকবে আর কখন থাকবে না, টিকা কিভাবে দেয়া হবে, সবকিছু নিয়ে একটা সার্কাস চলছে। হাজার হাজার মানুষ টিকার জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। দিনের পর দিন, পাচ্ছেন না। কারো গায়ে আবার একসঙ্গে ডাবল ডোজের টিকা দেয়া হচ্ছে বলে খবর আসছে। এরমধ্যে মিডিয়া আর জনগন পড়ে আছেন পরীমনির ইস্যু নিয়ে। যেন পরীমনির বিচার করা হলে বাংলাদেশের সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড খতম হয়ে যাবে! 

ঠিক একই বিষয়টা দেখা গিয়েছিল রিয়া চক্রবর্তীর বেলাতেও। ভারতের হাজারটা ইস্যু একপাশে ফেলে রেখে রিয়াকে নিয়ে মেতে ছিল মিডিয়া, এই মেয়েটার জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছিল তারা। একটা পর্যায়ে নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্ট গ্রেপ্তার করেছিল রিয়া এবং তার ছোট ভাইকে, একটা আইওয়াশের মতোই ছিল গোটা ব্যাপারটা। তার ব্যাংক একাউন্ট থেকে শুরু করে জায়গা জমির হিসাব- সবকিছু তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছিল, অস্বাভাবিক কিছুই পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে তাকে ছেড়ে দিয়েছে আদালত। ভারতের মিডিয়া আর মাথামোটা জনতা জনার্দন মিলে তার জীবনটাকে বিষিয়ে তুলেছিল। ডাইনির চেয়েও বেশি ঘৃণা পাওয়া রিয়া এখন চেষ্টা করছেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার।

রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি নাকি সুশান্তকে ড্রাগ দিতেন। কিন্তু এই মনগড়া অভিযোগটার বিপরীতে কেউ জানতে চায়নি, তেত্রিশ বছরের আলাভোলা ভালো ছেলে সুশান্ত সেগুলোকে হরলিক্স বা বনভিটা ভেবে গিলে ফেলতেন কীনা? পরীমনির বেলাতেও কেউ জিজ্ঞেস করছে না, পরীমনি যদি প্লেজার ট্রিপে গিয়েও থাকেন, যাদের সঙ্গে গিয়েছেন, তারা কি অবুঝ শিশু ছিলেন? কেউ গলা উঁচিয়ে প্রশ্ন তুলছে না, এদেশে মদ খাওয়াটা আইনের চোখে অপরাধ কীনা? তাহলে মদের আমদানী হয় কোথা থেকে? লাইসেন্স দেয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে কে? ঢাকার রাজপথের পাশে কিংবা অলিগলিতে যেসব বার কিংবা মিনিবার আছে, সেখানে কোন ভালোমানুষগুলো ভিড় জমায়? 

র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার পরীমনি

রিয়ার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট লিক করা হয়েছিল ন্যাশনাল টেলিভিশনের প্রাইম টাইম নিউজে। সোয়াশো কোটি মানুষের সামনে রিয়ার ব্যক্তিগত আলাপগুলোকে নগ্নভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। ঠিক একই ঘটনাটা পরীমনির সাথেও ঘটছে। গতকালই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেয়া এক বরাহ শাবক, যে কীনা নিজে লেজ তুলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ভয়ে, সেই লোকের ফেসবুক পেজ থেকে এক পুলিশ অফিসারের জন্মদিনে পরীমনির কেক কাটার ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছে। এই ভিডিও দেশের বাইরে গেল কীভাবে? পরীমনির মোবাইল এখন কার কাছে আছে, কীভাবে এই ভিডিও লিক হলো, এসব প্রশ্ন কী তোলা যায়? 

ব্যবসায়ী নাসিরের বিরুদ্ধে পরীমনি একটা মামলা করেছিলেন। বলা হচ্ছিল, এই পুলিশ অফিসার নাকি সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু এখন জানা গেছে, সেই মামলা ডিবির অধীনেই ছিল না, ছিল সাভার থানার অধীনে। পরীমনির মামলার সঙ্গে তো এই ভিডিওর কোন সম্পর্ক নেই, তাহলে ভিডিওটা ভাইরাল করা হলো কোন উদ্দেশ্য নিয়ে? ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় পরীমনি যেখানে ভিক্টিম, সেখানে তার দিকেই ঘৃণার তীর ছুঁড়ছি আমরা। অবশ্য, সপ্তাহান্তে ফোনালাপ ফাঁসের দেশে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যে একজন নাগরিকের অধিকার হতে পারে, সেটা এদেশের কয়জন জানেন, তাতেও সন্দেহ আছে। 

পরীমনি ফেরেশতা নন। ভুল বা অন্যায় নিশ্চয়ই তারও আছে। পরীমনি যে ধর্ষনের মামলা করেছিলেন, সেটা সত্যি কি মিথ্যা তা নিয়ে তদন্ত হোক। তার বাসায় যদি নিষিদ্ধ মাদক পাওয়া গিয়ে থাকে, সেই মাদক কোথা থেকে এসেছে, যোগানদাতা কারা- এটাও তদন্ত করে বের করা হোক, দোষী প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু লঘুপাপে গুরুদণ্ড শুধু পরীমনি কেন, কাউকেই যেন দেয়া না হয়। কোন ঘটনাটাকে প্রায়োরিটি দিতে হবে, সেটা বোঝার চেষ্টা করি আমরা। মিডিয়া এবং আমজনতা যেভাবে উইচ হান্টের মতো করে পরীমনির পেছনে লেগে আছে, এই অসভ্য চর্চাটা বন্ধ হোক। একজন মানুষ অপরাধী হলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাটা তার নাগরিক অধিকার, সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে, এখানে দ্বিতীয় কোন অপশন নেই।  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা