আমরা যদি আগেই মাইন্ডসেট ফিক্স করে ফেলি যে, ‘অমুক এই জিনিসটা কখনোই পারবে না। তমুককে এই জিনিসে মানাবে না’; তাহলে অডিয়েন্স হিসেবে আমরাই হয়তো বঞ্চিত হবো। কারণ আমরা তখন সেই কাজটা নিউট্রাল অডিয়েন্স হিসেবে দেখব না। আমরা একটা পারসেপশন নিয়ে সেই কাজটা দেখতে বসব যা অবচেতনভাবেই আমাদের ভাবনা-বিবেচনার উপর প্রভাব ফেলবে।

এক ছোট ভাইয়ের কথা বলি। খুবই ট্যালেন্টেড, কিন্তু সোজাসাপ্টা কিসিমের। মনে যা আসে, ভেতরে রাখে না, ঠাস ঠাস বলে দেয়। এজন্য ওর ব্যাপারে একটা ‘প্রিসেট মাইন্ডসেট’ হয়ে গেছে অনেকের, ‘ছেলেটা বেয়াদব’। কিন্তু আদতে ছেলেটা তা না। সে যুক্তি দিয়ে কথা বলে, ভেবেচিন্তে বলে, নিজের ভুল হলে স্বীকার করে। শুধু নিজের ভাবনাটা অকপটে জানান দেয়। তবু ‘ছেলেটা বেয়াদব’- এই প্রিসেট মাইন্ডসেটের কারণে অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলে, পেছনে নেতিবাচক কথা বলে।

জীবনের সর্বস্তরেই এই মেন্টালিটি খুব ক্ষতিকর। সিনেগল্প থেকে পরশু আমরা একটা ক্যারোসেল কন্টেন্ট করলাম, টপিকটা ছিল এরকম- বাংলাদেশী অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যদি ফ্যামিলি ম্যান সিরিজে অভিনয় করতেন, কে কোন চরিত্রে মানানসই হতেন? সেখানে অভিনেত্রী সামান্থার ‘রাজি’ ক্যারেক্টারে ভাবা হয়েছে মেহজাবীনকে। ব্যাস, শুরু হয়ে গেল পোস্টে ‘হাহা’ রিয়েকশন ও তীর্যক মন্তব্যের জয়গান! 

এখানে চাইলেই বলা যেত ‘অমুক অভিনেত্রী মেহজাবীনের চাইতে ভালো করবে’। এটাই কিন্তু কনস্ট্রাক্টিভ ডিসকাশন। অথচ অধিকাংশ কমেন্ট/ইনবক্সে মেসেজের সারকথা, ‘এহহ! মেহজাবীন! সে তো সামান্থার নখের যোগ্যও না!’ অথচ দেখুন, এই সিরিজের আগে সামান্থাকে নিয়েই সংশয় ছিল যে তার মতো মেইনস্ট্রিম নায়িকা এরকম ক্যারেক্টারের চ্যালেঞ্জ নিতে পারবেন কিনা। ঠিকই সামান্থা চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন, জিতেছেনও। মেহজাবীন মানেই তো গদগদ করা প্রেমিকা না। সোনালী ডানার চিল, ফেরার পথ নেই- এই কাজগুলোতে আমরা ভিন্ন মেহজাবীনকে দেখিনি? দেখেছি তো! আমরাই তাদের সমালোচনা করি যে তারা টাইপকাস্ট হয়ে যাচ্ছেন, কেন একই রোল করছেন। অথচ তারা সেই ভিন্ন ক্যারেক্টারে প্রশংসনীয় কাজ করার পরও আমরা দর্শকেরাই একটি চ্যালেঞ্জিং ক্যারেক্টারে তাকে ভাবতে পারছি না। তাহলে পরিচালক-প্রযোজকরা না ভাবলে তাদের দোষ দেই কেন?

ফ্যামিলি ম্যান, সামান্থা, মেহজাবীন
সোনালী ডানার চিল, ফেরার পথ নেই- এই কাজগুলোতে আমরা ভিন্ন মেহজাবীনকে দেখেছি

এই যে শুরুতেই একটা রায় দিয়ে দেয়া, এটা ঠিক না আসলে। আমরা একটা কন্টেন্টের ট্রেলারের গ্লিম্পস দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই যে ‘কে এখানে বাতিল’। মরীচিকার ট্রেলারে সিয়ামকে দেখে যেমন এই রায় দিয়ে দিয়েছি। আগে কন্টেন্টটা আসুক ভাই! পুরোটা দেখি। তারপর ব্যবচ্ছেদ করতে বসি! সিয়াম যখন বড় পর্দায় আসবেন, তখন এরকম নাক সিটকানোর কথা শুনেছি অনেক, ‘‘ও হবে নায়ক! ওর যে বেবিফেইস! এইসব ‘মডেল’দের দিয়ে আর যা-ই হোক, সিনেমা হবে না!’’ অথচ দহন ছবিতে বখাটে যুবকের চরিত্রে সিয়ামের বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় দেখিনি? সিয়ামের যে চেষ্টাটা আছে, সেটাই বা কজন মেইনস্ট্রিম নায়কদের মাঝে আছে?

আরেকজনের কথা মনে পড়লো, মাহিয়া মাহি। তাকে নিয়ে অনর্থক ঘৃণার চাষাবাদ। মরীচিকার ট্রেলার দেখে অনেকেই রায় দিয়ে দিয়েছেন, মাহি পারবে না। তাকে মানাবে না, তাকে দিয়ে হবে না, আর কী কেউ ছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ রায়হান রাফীর শর্টফিল্ম ‘অক্সিজেন’-এ মাহির অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে, ভালো স্ক্রিপ্ট পেলে মাহিও যে দারুণ অভিনয় করতে জানেন- সেটির সন্ধান তো মিলেছেই। তবু আগেই কেন আমাদের এই ‘প্রিসেট মাইন্ডসেট’?

মাহিয়া মাহি মরীচিকা, অক্সিজেন
রায়হান রাফীর ‘অক্সিজেন’-এ মাহি দারুণ অভিনয় করেছিলেন

মাহির অভিনয়ে ন্যাকামির প্রসঙ্গটা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় ঢাকা অ্যাটাকে। চলুন, ঢাকা অ্যাটাকের ক্লাইম্যাক্স মোমেন্টে যাই। আরিফিন শুভ যাচ্ছেন বোম্ব ডিফিউজ করতে। তার উপর নির্ভর করছে সব কিছু। কী না কী হয়। দর্শকদের জন্য রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। তখন মাহিয়া মাহির আগমন, ‘না, আমি তোমাকে যেতে দিবো না।’ তারপর প্রেমিক প্রেমিকার বাক্যবিনিময়। ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্লাইম্যাক্সের সুর-তাল-লয়, সব কেটে গেল। প্রচণ্ড বিরক্ত হলাম মাহির উপর। আরে, এই সময় কেন আসতে হবে আপনার! এখন কি এই লুতুপুতু প্রেম করার সময়? কিন্তু পরে মনে হলো, এটা তো স্ক্রিপ্টের দোষ। রাইটিংয়ের দোষ। ওরকম সময়ে তো মাহির স্ক্রিনটাইমই থাকার কথা না। তবু কেন হলো? কারণ, এটাই সাবকন্টিনেন্টের মসলা। এটা না দিলে নাকি তরকারী সুস্বাদু হয় না! অমন ক্লাইম্যাক্স মোমেন্টে মাহির স্ক্রিনে আসা এবং এই ন্যাকামোর সব দায় কি তার? আমরা কয়জন দর্শক অমন দৃশ্যায়নের জন্য ডিরেক্টরকে ব্লেম দিয়েছি?

মোশাররফ করিম শুধু সস্তা কমেডিই পারে, আর কিছু না।
আফরান নিশো পারে শুধু লাউড অ্যাক্টিং, আর কিছু না।
অপূর্ব প্রেমিক রোল ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।
আরিফিন শুভ ‘আআআ...ইয়েইয়ে’ ছাড়া কথা বলতে পারে না।

এগুলো হলো ফিক্সড মাইন্ডসেট। অনেকে ধরেই নিয়েছে এমন। অথচ উপরে যাদের নাম বললাম, তাদের প্রত্যেকেরই ভিন্নধর্মী কাজ আছে। ধরা যাক, তাদের নতুন কোনো নাটক/টেলিফিল্ম/ওয়েব কন্টেন্ট আসছে। সেই কাজটা না দেখেই আমাদের সেই স্পেসিফিক অডিয়েন্স শুরুতেই এই রায় দিয়ে দিবে, ‘আরে অমুক! সে আর কী করবে। সে তো... ইত্যাদি ইত্যাদি’। ডানাকাটা পরীকে যখন গিয়াসউদ্দীন সেলিম ‘স্বপ্নজাল’-এ শুভ্রারূপে নিয়ে এলেন, আমরা চমকে যাইনি? অথচ পরী এমন চরিত্রে অভিনয় করতে পারবে, সেটা তো কেউ কল্পনাই করতে পারিনি। তাহলে কেন এই মানসিকতা যে অমুক এই জিনিসটা পারবে না?

যুগে যুগে এভাবে ‘প্রিসেট মাইন্ডসেট’ ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার অনেক অনেক উদাহরণ আছে। মার্লোন ব্রান্ডোকে কোনোভাবেই ‘দ্য গডফাদার’-এ নিতে চায়নি প্যারামাউন্ট পিকচার্স। এক সময় রায় দিয়ে দেয়া হয়েছিল, মার্লোন ব্রান্ডো ইজ ফিনিশড। টানা ১০ বছর একনাগাড়ে তার সব ছবিই ছিল ফ্লপ। মার্লোন পেয়েছিলেন ‘বক্স অফিস পয়জন’ উপাধি। এরপর ‘দ্য গডফাদার’-এ মার্লোনের অভিনয় তো এখনো রীতিমত ‘অ্যাক্টিং বাইবেল’!

মার্লোন ব্রান্ডো, দ্য গডফাদার
মার্লোন ব্রান্ডোর শেষ দেখে ফেলেছিলেন সবাই

যে আলিয়া ভাট ‘কফি উইথ করন’-এ ভারতের প্রেসিডেন্টের নাম বলতে না পারায় হাসির পাত্র হয়েছিলেন, যাকে ভাবা হচ্ছিল স্রেফ নেপোটিজমের প্রোডাক্ট, সেই আলিয়া ঠিক তার পরের বছরেই ‘হাইওয়ে’-তে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। উড়তা পাঞ্জাব, হাইওয়ে, রাজি- জাত অভিনেত্রীর পরিচয় দিয়েছেন আলিয়া সবখানেই। ‘টিভিতে অভিনয় করা, দেখতে ভালো না’ শাহরুখ খানকে কত টিপ্পনী শুনতে হয়েছে, অথচ তিনি আজ গ্লোবাল আইকন। অর্জুন কাপুরকে কখনোই আমার ভালো লাগেনি। সেই ‘বাতিল মাল’ সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘সন্দীপ অউর পিঙ্কি ফারার’ ছবিতে ফাটিয়ে অভিনয় করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন! রবার্ট ডাউনি জুনিয়রের ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন সবাই। ড্রাগসের জন্য তাকে জেলে যেতে হয়েছে। সেই কারাবাসের সময় প্রতি ঘন্টায় তার আয় ছিল ৮ সেন্ট। আজ সিনেমাতে এক মিনিট নিজের চেহারা দেখানোর জন্য তিনি পান এক মিলিয়ন ডলার! এরকম কতশত উদাহরণ দেয়া যাবে!

লাইফ ইজ ফুল অফ সারপ্রাইজেস। আপনি হয়তো কারো শেষ দেখে ফেলেছেন, কাউকে বাতিল ঘোষণা করেছেন; সে হয়তো এমনভাবে ঘুরে দাঁড়াবে যে আপনি বিস্মিত না হয়ে পারবেন না!

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যারা লেখাটি এই পর্যন্ত পড়ছেন, অনেকেই হয়তো ভাবছেন, ‘কীসের সাথে কী কম্পেয়ার করছি!’ বিশ্বাস করুন, কারো সাথে কারো কম্পেয়ার করছি না। এত দীর্ঘ লেখার একটাই হেতু, আরেকটু সহনশীল হওয়া। আগেই কোনো রায় দিয়ে না ফেলা। কাউকে বাতিল ঘোষণা না করা। আমরা আগে কারো অভিনীত কাজটা দেখি। যদি ভালো না লাগে, কী কী ব্যাপারে ভালো লাগলো না, সেগুলো সুন্দর করে পয়েন্ট আউট করি। কী কী ভালো লাগলো, সেগুলোও জানাই। কারো অযাচিত প্রশংসা না করি, সত্যিটাই বলি, কিন্তু ভালোভাবে দেখেশুনে তারপর বলি! আগেই জাজমেন্টাল না হই।

আমরা যদি আগেই মাইন্ডসেট ফিক্স করে ফেলি যে, ‘অমুক এই জিনিসটা কখনোই পারবে না। তমুককে এই জিনিসে মানাবে না’; তাহলে অডিয়েন্স হিসেবে আমরাই হয়তো বঞ্চিত হবো। কারণ আমরা তখন সেই কাজটা নিউট্রাল অডিয়েন্স হিসেবে দেখব না। আমরা একটা পারসেপশন নিয়ে সেই কাজটা দেখতে বসব যা অবচেতনভাবেই আমাদের ভাবনা-বিবেচনার উপর প্রভাব ফেলবে।

Watch the contents with no preset mindset. In return, you may probably come away happily surprised!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা