তথাকথিত অনেক সিনিয়র মিউজিশিয়ানদের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলে রাখি, এতটুকুন একটা ছেলে একাই বিগত পাঁচটি বছরে যতটুকু এই ইন্ডাস্ট্রিকে নিজ কাঁধে টেনেছে, সেটা অনেকেই হয়তো তার গোটা ক্যারিয়ারেও করেননি!

‘আসো মামা হে’-তে আমরা দেখেছি কুদ্দুস বয়াতির বাউলিয়ানার সাথে তার পপসঙ্গীতের ফিউশন। ‘লোকাল বাস’-এ যুগলবন্দী দেখেছি খাঁটি বাংলা র‍্যাপ আর ফোকসম্রাজ্ঞী মমতাজের। ‘সাতশ টাকার গান’-এ তিনি জুটি বেঁধেছেন ফকির শাহাবুদ্দিনের সাথে। আরব্য রজনীর প্রেমিকের দেখা মিলেছে ‘জাদুকর’-এ। ভালোবাসার মানুষকে হারাতে না দেয়ার ইস্পাতদৃঢ় মানসিকতার প্রেমিককে পেয়েছি আমরা ‘রাজকুমার’-এ। ‘বেয়াইনসাব’, ‘গার্লফ্রেন্ডের বিয়া’, ‘কাবাবের হাড্ডি’-তে পেয়েছি বিয়েবাড়ির এক্সপিরিয়ান্স। সফট মেলোডিতে আচ্ছন্ন করেছে ‘তুমি সত্যি নাকি ভুল’। ছোট্ট বোনের জন্য নিখাদ ভালোবাসার গান ‘ভেঙে পড়ো না এভাবে’ আমাদের অশ্রুসজল করেছে। আনমনে ভাবিয়েছে ‘আমি আমার মতো’। জেনারেশন জেড তাড়িয়ে উপভোগ করেছে হরর-কমেডি জনরার ‘খোকা’। হবেই বা না কেন! ভালো ছেলেদের কপালে নাকি ভালো মেয়ে জোটে না! 

প্রীতম হাসান। তার একেকটা গান আরেকটার চেয়ে ভিন্ন। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সাউন্ড ইফেক্টের ইডিএম এর মতো টেকনিক্যাল দিক হোক কিংবা ভিন্ন ভিন্ন জনরার এক্সপেরিমেন্ট- প্রতিবারই তিনি নতুন রূপে হাজির হয়েছেন। কন্টেন্ট ডিজাইনে, এক্সিকিউশনে এনেছেন অভিনবত্ব। কনসেপ্ট, টিউন, লিরিক, নিজের লুক- প্রতিটি কাজে তিনি স্বতন্ত্র। তার কিছু গান শুধু অডিও হিসেবে হেডফোনে বাজবে সারাদিন, ডুবে থাকবেন মুগ্ধতায়। কিছু গানে মনে হবে, ‘না, ভিডিওসহই দেখি’! তথাকথিত অনেক সিনিয়র মিউজিশিয়ানদের প্রতি সম্মান জানিয়েই বলে রাখি, এতটুকুন একটা ছেলে একাই বিগত পাঁচটি বছরে যতটুকু এই ইন্ডাস্ট্রিকে নিজ কাঁধে টেনেছে, সেটা অনেকেই হয়তো তার গোটা ক্যারিয়ারেও করেননি!

মানবজনম বড়ই অদ্ভুত। যার প্রতিটা গানে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ, সেই প্রীতম হাসানকেও নতুন গান রিলিজ করতে হয় কোনো মিউজিক ল্যাবেল ছাড়াই! তার যে এক্সপেরিমেন্ট-নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা, তাতে হয়তো বিশ্বাস হয়নি হর্তাকর্তাদের! কিন্তু প্রীতম দমে যাননি। নিজের ইউটিউব চ্যানেলেই এসেছে তার নতুন গান, ‘মরে যাক’।

প্রীতম হাসান মরে যাক
'মরে যাক' মিউজিক ভিডিওর একটি দৃশ্য

তো কেমন হয়েছে ‘মরে যাক’?               

'মরে যাক'- প্রীতম হাসানের আরেকটি অনবদ্য সৃষ্টি। এবার একদম 'নেক্সট লেভেল'! বেশিরভাগ অডিয়েন্সের একই প্রশ্ন, ‘এটা কি সত্যি বাংলাদেশের গান? এটা কি সত্যিই বাংলাদেশী কোনো আর্টিস্টের মিউজিক ভিডিও?’ এরকম টপনচ প্রোডাকশন শেষ কবে দেখেছে এদেশের ইন্ডাস্ট্রি?

প্রীতম এ সময়ের অন্যতম আধুনিক স্টোরিটেলার। সাইকেডেলিক, ডিস্কো, সিন্থওয়েভ- তিন জনরার কম্বিনেশনে একটি গল্প বলতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু সেটি কোনো অংশেই থ্রিলারের চাইতে কম কিছু না। পুরো মিউজিক ভিডিওর নানা অংশে অনেকগুলো ক্লু। সবগুলো ক্লু চিহ্নিত করতে পারলে তবেই মিলবে ধাঁধার উত্তর। এজন্য খোদ প্রীতম হাসান মিউজিক ভিডিওটি কয়েকবার দেখতে বলেছেন। কারণ পদে পদে যে বিভ্রান্তির সমাবেশ!

Morey Jak Pritom Hasan
অভিনব কনসেপ্টের মিউজিক ভিডিও সবাইকে চমকে দিয়েছে

শুরুতেই আমরা দেখতে পাই একটি ছবির ফ্রেমে ওভারকোট পরা এক ব্যক্তি ও সাদা গাউন পরিহিত একজন নারীকে আপেল হাতে। যেন বাইবেলের অ্যাডাম আর ইভের ঘটনাই বর্ণিত হতে যাচ্ছে! এক ঝলকে দেখা যায় লোকটির হাতের পেছনে ছুরি। সেখান থেকে ট্রাঞ্জিশনে মাথার খুলি। তাহলে কি সেই নারীকে মারা হয়েছে ছুরি দিয়ে? আর তাদের হাতে আপেলই বা কেন? বিখ্যাত ইউটিউবার RnaR এর আপেল নিয়ে দুর্দান্ত একটি ভিডিও থেকে জেনেছিলাম, সাধারণত আপেল সিনেম্যাটিক একটি সিম্বল হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। মৃত্যু, প্রলোভন, পাপ, অমঙ্গল কিংবা ভয়ংকর কিছুর মেটাফোর হিসেবেই দেখানো হয়েছে অনেকগুলো সিনেমায়। তাহলে আপেল এখানে কোনো অশুভ বার্তা নিয়ে আসছে কি? বিস্তারিত জানতে হলে নিজেই দেখুন মিউজিক ভিডিওটি। কয়েকবার দেখার পরও যদি ধাঁধা মেলাতে না পারেন, ইউটিউবে গানটির নিচে পিন করা কমেন্টেই পাওয়া যাবে গোলকধাঁধার উত্তর।

আপেলকে দেখানো হয়েছে মেটাফোর হিসেবে

থার্ড পারসন কিংবা তৃতীয় ব্যক্তি আমাদের জীবনে যে কতটা ক্ষতি বয়ে আনে, সেই গল্পেরই যেন প্রতিচ্ছবি 'মরে যাক'। এই তৃতীয় ব্যক্তি আমাদের জীবনে আসে মুখে হাসি নিয়ে, ভেতরে থাকে ভণিতা আর ধারণ করে কদর্য মানসিকতা। তাদের কারণে কত সম্পর্ক যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়! আবার লিরিক থেকে আপনি পাবেন আরেক বার্তা। 'আমি তো চাই পৃথিবীর সবাই মরে যাক, শুধু তোমার ফুল তোমার পাখিরা বেঁচে থাক' কিংবা ফ্রেঞ্চ লিরিকের বাংলা অর্থ ‘আমার যা পছন্দ নয়, তা আমি পুড়িয়ে ফেলি’- কেমন যেন নার্সিসিস্টের বক্তব্য মনে হচ্ছে না? একটা মানুষ যদি কোনো নার্সিসিস্টকে ভালোবাসে, তার কী পরিণতি হয়- সেটিও বোধহয় দেখাতে চেয়েছেন প্রীতম।

যা-ই দেখাতে চান না কেন প্রীতম, একটা জিনিস বোধহয় সত্যি- এই গানের টার্গেট গ্রুপ হয়তো একেবারেই ম্যাস পিপল না। সাইকেডেলিক জনরার গান একটা ভালো কোয়ালিটির হেডফোন কিংবা সাউন্ডবক্সে শুনতে যেমন লাগবে, সাধারণ হেডফোন-সাউন্ডবক্সে অতটা ভালো নাও লাগতে পারে। এই জনরার গান প্রথমবার শুনলে একরকম মনে হবে, এরপরেরবার আরেকরকম। ধীরে ধীরে রিপিট মুডে শোনার অ্যাডিকশন চলে আসে। সে হিসেবে বেশ ভালোভাবেই উতরে গেছে গানটি। মিলেনিয়ালদের অধিকাংশই হয়তো কানেক্ট করতে পারবে, তবে এটি মূলত জিলেনিয়ালদের জন্য দুর্দান্ত একটি এক্সপিরিয়ান্স। মিউজিক, সিনেমাটোগ্রাফি, এডিট, কালার, সেট ডিজাইন, ভিজ্যুয়াল, অনেকগুলো পাজল মেলানোর চেষ্টা- এই এফোর্টকে স্যালুট দিতেই হবে। অডিয়েন্সেকে একই সাথে ‘শোনা’ এবং ‘দেখা’র মতো দুটি ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট করা সহজ কাজ নয়। প্রীতম এবং তার টিম সেটি পেরেছেন। 

'লোকাল বাস' থেকে 'ভেঙে পড়ো না এভাবে' হয়ে আজকের 'মরে যাক'- প্রীতম ক্রমশ নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। এই তরুণ তুর্কীর হাত ধরে দারুণ কিছু কাজ যোগ হচ্ছে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে। অথচ এখনো প্রীতম হাসান ‘রিডিকিউলাসলি’ আন্ডাররেটেড! তার মতো কেউ আর এই জেনারেশনের ‘নিড’ বোঝেনি। আজ একজন প্রীতম হাসানের পিঠ চাপড়ে সাহস যোগালে মানুষটা একদিন এই ইন্ডাস্ট্রিকে কয়েকগুণ ফেরত দেবে।

সিনেগল্প এরকম অসামান্য প্রচেষ্টাকে স্যালুট জানায়। প্রীতম হাসানের জন্য করতালি হয়ে যাক!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা