হলঘরের এক প্রান্তে একটা খাবার টেবিল। সে টেবিলে মুখোমুখি দুইজন। কেতাদুরস্ত পোশাক পরনে। নিঃশব্দে আহার, সে সাথে মদ্যপান। অদূরে ফায়ার প্লেস। মৃদু আঁচের আগুন। হালকা কমলা রঙা একটুখানি আলো এসে পিছলে যাচ্ছে এই দুই মানুষের মুখে। হুট করে গান বেজে ওঠে- বেলা চাও, বেলা চাও, বেলা চাও...

এটুকু পড়েই বুঝে ফেলবার কথা, কাদের কথা বলছি। মুখোমুখি প্রফেসর ও বার্লিন, ব্যাকগ্রাউণ্ডে বেলা চাও। মানি হাইস্ট ওরফে লা কাসা দে পাপেল- এর এই বিশেষ দৃশ্যটি অজস্র মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে। ইউটিউবে এই দৃশ্যটির মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ। তাছাড়া মানি হাইস্টও এতটাই হাইপ তৈরী করেছে, নিয়মিতই নিজেদের নিয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তবে আজ মানি হাইস্ট নিয়ে কথাবার্তা হবে না, 'বেলা চাও' গান নিয়েও হবে না, কথা বলবো না 'লা কাসা দে পাপেল' নিয়েও। ডেনভারের বিচ্ছিরি হাসি অথবা বার্লিনের অদ্ভুত মাদকতাও আজকের আলোচনার বিষয়বস্ত না। আজকের আলোচনার একমাত্র টপিক, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন- প্রফেসর। সেই প্রফেসর, যিনি লা কাসা দে পাপেল এর আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে অন্যতম বড় কারণ, যিনি হয়তো ডাকাতদলের সর্দার, তবুও তার ডিসেন্সি, তার স্মার্টনেস এবং তার মেন্টাল স্ট্রেন্থ দর্শককুলকে চমকে দেয় ক্ষণে ক্ষণে। আজকের কথাবার্তা 'প্রফেসর' চরিত্রে অভিনয় করা আলভারো মোর্তেকে নিয়ে। 

প্রফেসর
আলভারো মোর্তে

ছোটপর্দায় দু দশক

আলভারো মোর্তে যখন 'প্রফেসর' চরিত্রে অভিনয় করতে আসেন, তখন তার বয়স বিয়াল্লিশ বছর। আগের সময়গুলোতে টুকটাক অনেক কাজই করেছিলেন, কিন্তু 'গ্লোবাল রিকগনিশন' বলতে যা বোঝায়, সেটাই পাওয়া হচ্ছিলো না সেভাবে।

১৯৭৫ সালে স্পেনের কাদিজ-এ জন্ম নেয়া এই মানুষটি সংস্কৃতি জগতে যুক্ত হন অল্প বয়সেই। ২০০০ সালের দিকে শুরু করেন টিভি ক্যারিয়ার। স্প্যানিশ টিভি সিরিজ 'Hospital Central' এ ছোটখাটো একটা রোল দিয়ে কাজ শুরু করেন, এই সিরিজের মাত্র দুইটি এপিসোডে অল্প সময়ের জন্যে দেখা যায় তাকে। এরপর টুকটাক কাজকর্ম চলছিলো। টিভি সিরিজের বড়সড় রোল পান এরও পাঁচ বছর পরে, Planta 25 নামে একটা টিভি সিরিজে। এই টিভি সিরিজ এর 'Ray' চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

এরপরে বেছে বেছে কাজ করার বদলে এক্সপেরিমেন্টাল কিছু স্প্যানিশ সিরিজে অভিনয় করা শুরু করেন। যার মধ্যে আছে Bandolera, Amar en Tiempos Revueltos, El Secreto de Puente এর নাম। যদিও এই সিরিজগুলো স্পেনে জনপ্রিয় হলেও বাইরের খুব বেশি মানুষ এগুলো নিয়ে জানতো না। তবে প্রফেসরের প্ল্যান বলে কথা! হয়তো এক্সপেরিমেন্টাল আর অর্থোডক্সিকাল টিভিসিরিজগুলোতে কাজ করে করে হাত পাকাচ্ছিলেন তিনি ভালো কিছুর জন্যেই!

সিনেমায় প্রথমে আসেন ২০০৭ সালে। বিখ্যাত স্প্যানিশ ড্যান্সার Lola Flores এর কাহিনীর উপর নির্ভর করে বানানো সিনেমা 'Lola, la pelicula' তে ছোটখাটো এক সিনে, খুব অল্প স্ক্রিনটাইমের জন্যে আসেন আমাদের প্রফেসর। এরপর অনেকদিন ধরেই সিনেমাজগতে উল্লেখযোগ্য কাজ আর তেমন কিছু করেননি তিনি।

নেটফ্লিক্স: El Profesor থেকে The Professor

২০১৭ সালে মুক্তি পায় লা কাসা দে পাপেল, স্পেনের একটি টিভি চ্যানেল 'Antena 3' থেকে। পরবর্তীতে সেটা চলে আসে নেটফ্লিক্সে। গ্লোবালি একটা বড়সড় ঝড় তোলে। টিভির পর্দায় চলে আসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বড় বড় শহরের নামে কিছু ডাকাত, যারা ডাকাতি করতে ঢোকে রয়েল মিন্ট এবং ব্যাংক অব স্পেনে। চুরি করে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা।

সবার দৃষ্টি কেড়েছেন প্রফেসর

এই টিভি সিরিজটি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রুদ্ধশ্বাস প্লটের ভূমিকা তো আছেই, সে সাথে বলতে হবে টান টান সিকোয়েন্সের কথা। প্রথম সিজনের প্রথম এপিসোড থেকেই যে ফর্মুলা রেসিং স্পিড, সে স্পিড আজো কমেনি।

তবে এই টিভি সিরিজের সবচেয়ে বড় ইউএসপি 'প্রফেসর' চরিত্রটি। কোনো টিভি সিরিজেই এরকম টেকনিক্যালি অলমোস্ট পারফেক্ট ক্যারেক্টার পাওয়া খুব কষ্টের। তাছাড়া চরিত্রটি আনইথিক্যাল কাজ করছে, কিন্তু তবুও দর্শকের মন থেকে ডিনায়াল আসে না। দর্শকের এম্প্যাথি আদায় করে নিয়ে এই চরিত্রটি সেখানেই সার্থক।

আর এই চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে আলভারো মোর্তে তো ছাপিয়ে গেছেন সব কিছুকেই। মজার ব্যাপার হলো, এই চরিত্রের জন্যে প্রথমে ভাবা হয়েছিলো Javier Gutiérrez Álvarez কে, যিনি স্পেনের বেশ বড়সড় তারকা। 'Campones' নামের এক সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তখন তিনি এই চরিত্রটি নাকচ করে দেন (ভদ্রলোককে এখন কাছে পেলে জিজ্ঞেস করা যেতো- এইরকম ভুল কেউ করে?)। পরবর্তীতে মোর্তে এই চরিত্রে আসেন। বাকিটা তো ইতিহাস!

আরেক দিক থেকেও আমাদের প্রফেসরের সাথে নেটফ্লিক্সের সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৮ সালে 'দ্য বডি' খ্যাত পরিচালক Oriol Paulo এর সিনেমা 'Mirage' মুক্তি পায়। ২০১৯ সালে সিনেমাটি নেটফ্লিক্স প্লাটফর্মে আসে। আসার পরে হুলস্থুল সাড়া পরে আবার। এমনিতেই মিস্ট্রিনির্ভর এবং জটিল গল্প হওয়ার কারণে দর্শক বেশ পছন্দ করে সিনেমাটিকে, তাছাড়া আমাদের প্রফেসরও সেখানে বেশ সুন্দর অভিনয় করেন। ততদিনে তিনি প্রফেসর হিসেবে বেশ নামডাকও করে ফেলেছেন। তবুও এই সিনেমার সাফল্য তাকে আলাদাভাবে জনপ্রিয় করে। এছাড়াও বর্তমানে আরো কয়েকটি সিনেমাতেও কাজ করার কথাবার্তা চলছে তাঁর। দেখা যাক, সেগুলো আলাদা কোনো চমক তৈরী করতে পারে কিনা!

শেষের কথা

মানি হাইস্টের 'সালভা' ওরফে প্রফেসরের জনপ্রিয়তার পেছনে অনেক কারণই বলা যায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, চরিত্রটির মধ্যে অনিশ্চয়তা খুব বেশি। মানে, তিনি কখন কোন মুভটি নেবেন, সেটা কেউ জানে না। দর্শক তক্কেতক্কে থাকে, কী হয় কী হয়। মাঝখান দিয়ে দাবার চালে কিস্তিমাত করেন প্রফেসর। তাছাড়া পরিমিত আবেগ, নিয়ন্ত্রিত স্ট্রাটেজি এবং চরিত্রটার ডিলেমা- সে আসলে ভালো না খারাপ? এই বিষয়গুলো আস্তে আস্তে চরিত্রটিকে বিভিন্ন লেয়ার দেয়।

প্রফেসর
দর্শকের এম্প্যাথি আদায় করে নিয়ে এই চরিত্রটি

এরকম চরিত্রকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা খুবই কঠিন কাজ, হতে হয় অসাধারণ অভিনেতা। যেটা আমরা লক্ষ্য করি আলভারো মোর্তের মধ্যে। তাছাড়া, দুই দশক ধরে ছোট পর্দায় কাজ করে আসা মানুষটি অভিনয়ের সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ধরতে পারবেন, এটাই তো কাঙ্খিত।

তিনি নিজেও বোঝেন অভিনয়ের গুরুত্ব, তাই নিজের স্ত্রী'কে নিয়ে খুলেছেন থিয়েটার কোম্পানি '300 Pistolas' বা '300 Pistols' যেটার মূল কাজই হচ্ছে, একটু ভিন্ন পদ্ধতিতে অভিনয় শেখানো।

প্রফেসরের ক্যারিয়ারের গল্প থেকে এটাই শিক্ষনীয়- হাল না ছাড়ার মানসিকতা। দুই দশক ধরে অভিনয়ের পেছনে লেগে থেকে সাফল্য পেয়েছেন এইতো খুব বেশিদিন আগে না। এখন ক্রমাগতই হাতে পাচ্ছেন বড়সড় কাজ। শোনা যাচ্ছে, Amazon Prime, HBO তেও তাঁর কাজ খুব তাড়াতাড়িই আসবে।

বিয়াল্লিশ বছর বয়সে এসে করা টিভি সিরিজের সাফল্য তাকে দিয়েছে জনপ্রিয়তা, সম্মান ও মানুষের ভালোবাসা। সাফল্য কখন আসবে, তা তো অনিশ্চিত। কিন্তু সাফল্যের জন্যে নিরন্তর কাজ করে যাওয়াটাই বড় বিষয়। এটাই যেন শিখিয়ে যান প্রফেসর। একই সাথে মাথায় চলে আসে ঐ আপ্তবাক্যটাও- No matter what, the Show must go on.


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা