'পুনর্জন্ম' নিয়ে টানা একের পর এক রুদ্ধশ্বাস গল্প হবে, 'পুনর্জন্ম' কখনোই সেরকম আহামরি প্লট অফার করে নি। প্রথম গল্পে যেভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিলো রাফসান হকের কর্মযজ্ঞ, সেটাই ছিলো তাই সবচেয়ে সুন্দর। সাবলীল। কিন্তু এরপরে যা হয়েছে, অডিয়েন্সকে ক্যাটার করার জন্যে টেনেহিঁচড়ে লম্বা করা একের পর এক গল্প যেভাবে আনা হয়েছে, সেটা খাপ খায়নি। প্রত্যাশাও মেটায়নি।

বিগত কিছুদিন ধরে খাবার-দাবার সংক্রান্ত ফেসবুক গ্রুপগুলো বিশেষ এক ইস্যুতে সরব। ইস্যুর নাম- মানিক চানের পোলাও। অনেকের দাবী- মানিক চানের এই পোলাও নাকি একসময়ে বেশ সুখাদ্য ছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফুড ভ্লগারদের অতিরিক্ত ফুটেজে মানিক চানের পোলাওয়ের মান পড়ে গিয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। অনেকে দুষছেন ওভার হাইপকেই। তাদের ভাষ্য- অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে এবং জনগনের মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণেই নাকি খাবারের এ রসাতলে গমন৷ 

মানিক চানের পোলাও চেখে দেখিনি, তাই এ খাবারের ভুল-ঠিক বিচার করতে পারবো না। সেটা করার দুঃসাহসও দেখাচ্ছি না৷ তবে এই ঘটনা থেকে একটা বিষয় বেশ উল্লেখযোগ্য। সেটি হচ্ছে- ওভার হাইপড হলে যেকোনো বিষয়ের মানই পড়ে যায় বিপজ্জনকভাবে৷ যেটা হয়েছে পুরান ঢাকার প্রাচীন এ খাবারের ক্ষেত্রে। যেটা হয়েছে বিখ্যাত শেফ রাফসান হকের রান্নার ক্ষেত্রেও৷ হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। 'পুনর্জন্ম ইউনিভার্স' এর সাম্প্রতিকতম পর্ব 'পুনর্জন্ম তিন' প্রসঙ্গেই উপরের এই নাতিদীর্ঘ ইন্ট্রো। যে ইন্ট্রোর মোদ্দা কথা এই- 'পুনর্জন্ম তিন' জমেনি। এবং, এই যে না জমার বিষয়টি, এর পেছনে পুরোটুকুই দায় ওভার হাইপের। জনসাধারণের মাত্রাতিরিক্ত মাতামাতির। কিভাবে? আস্তে আস্তে খোলাসা করছি৷ 

'পুনর্জন্ম' নাটকটি ভালো লেগেছিলো প্রায় সবারই। আপাতদৃষ্টে সাধারণ এক গল্প শেষদিকের মুহুর্মুহু চমকে যেভাবে পালটে দিয়েছিলো সবার ভাবনার গণ্ডি, সেটা বেশ উপভোগ্যও ছিলো। একটা আদর্শ থ্রিলারের বৈশিষ্ট্যই তো এই৷ শেষের বাজিমাতে চক্ষু হবে চড়কগাছ, উলটে যাবে পাশার দান, সে সাথে খানিকটা অ্যাড্রেনালিন রাশ... তাহলেই তো ষোলোকলা পূর্ণ। যেটা খুব ভালোভাবে হয়েওছিলো এখানে। সে সাথে শুরু থেকেই টানটান গতির গল্প, জমাটি সব অনুষঙ্গ... 'পুনর্জন্ম' নিয়ে প্রশংসা হয়েছিলো বিস্তর, এবং সে প্রশংসা জাস্টিফাইডও৷ কিন্তু, ধীরে ধীরে সে প্রশংসা কিংবা স্তুতি এতটাই মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলো, দর্শকের আগ্রহকে ব্যবসায় রূপান্তরিত করার বাসনায় যেভাবে আসতে লাগলো 'পুনর্জন্ম'র একের পর এক গল্প, তা নির্মাণের জৌলুশ কমালো ক্রমশ। 'পুনর্জন্ম দুই' এলো। 'পুনর্জন্ম'র প্রথম কিস্তির মত ভালো হলো না। 'শুক্লপক্ষ' নামের এক ওয়েব কন্টেন্টের শেষদিকে ঢুকিয়ে দেয়া হলো 'পুনর্জন্ম'র রাফসান হককে। সেটাও খুব একটা জমলোনা। এরপর এলো 'পুনর্জন্ম তিন।' আগের দুই 'পুনর্জন্ম'র টেমপ্লেটে যতটুকুও যা ইতিবাচক উপাদান পাওয়া গিয়েছিলো, এবার সেটাও থাকলো অনুপস্থিত। 

'পুনর্জন্ম তিন' খুব একটা জমলো না 

'পুনর্জন্ম তিন' এর শুরুটা শ্লথ গতির। এবং খানিকটা ম্যাড়মেড়ে। থ্রিলারের ন্যারেশনে যেমন শুরু থেকেই অডিয়েন্সকে হুক করে রাখার এক বিষয় থাকে, সেটা এখানে তীব্রভাবে অনুপস্থিত। আগের পর্বগুলো থেকে কিছু চরিত্রকে হয়তো আনা হয়েছে, কিন্তু সেসব চরিত্রের কোনো পূর্ণতা নেই, নেই সামঞ্জস্যও। তারা হুটহাট এসেছে, নানাবিধ কর্মকাণ্ড করেছে, শেষে এসে ফুরিয়েছে। কিন্তু, তাদের এই যে সঞ্চার, উদ্দেশ্য কিংবা বিধেয়... সেটা নির্মাণের কোনো পর্যায়ে এসেই বিস্মিত করছে না, করছে না আগ্রহীও। শেষের দিকে এসে কিছু টুইস্ট দিতে চেয়েছেন নির্মাতা। কিন্তু সেসব টুইস্টও অর্গানিক না। আর্টিফিশিয়াল এসব টুইস্টে 
তাই যতটুকু না চমকানোর উপাদান আছে, তার চেয়েও বেশি আছে বিরক্ত হবার রসদ।

যেকোনো বিষয়- হোক তা গল্প, নাটক কিংবা রান্না, সেটি ভালো হওয়ার জন্যে তাকে সময় দেয়া প্রয়োজন। যত্ন করার প্রয়োজন। সে সাথে, বোঝা দরকার, যে বিষয়টিকে নিয়ে এগোনো হচ্ছে, সে বিষয়টির মেরিট কতটুকু। যেখানে এসেই মূলত 'পুনর্জন্ম' হারিয়ে ফেলে আপেক্ষিকতা। কারণ, এটা তো স্পষ্ট- 'পুনর্জন্ম' নিয়ে টানা একের পর এক রুদ্ধশ্বাস গল্প হবে, 'পুনর্জন্ম' কখনোই সেরকম আহামরি প্লট অফার করে নি। প্রথম গল্পে যেভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিলো রাফসান হকের কর্মযজ্ঞ, সেটাই ছিলো তাই সবচেয়ে সুন্দর। সাবলীল। কিন্তু এরপরে যা হয়েছে, অডিয়েন্সকে ক্যাটার করার জন্যে টেনেহিঁচড়ে লম্বা করা একের পর এক গল্প যেভাবে আনা হয়েছে, সেটা খাপ খায়নি। সেটাও নাহয় বড়সড় সমস্যা হতো না, যদি এই গল্পের ডেভেলপমেন্টে নির্মাতা সময় দিতেন৷ এটাও ঠিক, 'পুনর্জন্ম' এর দ্বিতীয় কিস্তি আসার এক বছর পরেই 'পুনর্জন্ম তিন' এসেছে৷ কিন্তু এই সময়ে ভিকি জাহেদ আরো কিছু নির্মাণের সাথে যুক্ত ছিলেন। অখণ্ড মনোযোগে তিনি যে রাফসান হক ও তার সংশ্লিষ্টদের ডেভেলপমেন্ট নিয়ে ভাবতে পারেন নি, সেটা গল্পের এই বিস্তার থেকেই দৃশ্যমান। সেখানেও সঙ্গী আক্ষেপ।

রাফসান হকের রান্না কি খারাপ হতে পারে? 

যদিও 'পুনর্জন্ম' এর চতুর্থ কিস্তি অর্থাৎ অন্তিম পর্ব আসবে সামনে, তবে সে পর্বের জন্যে অপেক্ষার ছিঁটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই। কারণ, 'পুনর্জন্ম' সেই আস্থা কিংবা বিশ্বাসের জায়গাটুকু খানিকটা খেলো করে দিয়েছে। সে সাথে এই নির্মাণ খুব ভালোভাবে বুঝিয়েছে এই সত্যকেও, জনস্রোতে গা ভাসালে তা কখনোই খুব একটা স্মরনীয় কোনো ফলাফলে শেষ হয়না। হাইপের অ্যাড্রেনালিন রাশে করা কর্মকাণ্ড বরাবরই ক্ষতিকর। 'পুনর্জন্ম' থেকে এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা