মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে একের পর এক ব্যবসা খুলেছেন, হয়েছেন অঢেল সম্পত্তির মালিক। বিয়ে করেছেন বলিউডের হার্টথ্রব শিল্পা শেঠিকে। দাম্পত্যজীবনেও দারুণ সুখী ভাবা হয় তাদের। তবু কী এমন ভর করলো রাজ কুন্দ্রাকে, কীভাবে জড়িয়ে গেলেন পর্নোগ্রাফির মতন বিতর্কিত ব্যবসার সাথে?

নাইন্টিজের বিখ্যাত গান 'চুরাকে দিল মেরা'র রিমেক ভার্সন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়ার পরে মানুষ যখন শিল্পা শেঠীর সাতাশ বছর আগের এবং পরের দেহসৌষ্ঠবের সাদৃশ্যে মুগ্ধ হয়ে প্রশংসাবাক্যে ঋদ্ধ করছিলেন তাকে, এই লাস্যময়ী নায়িকা হয়তো তখন তার দূরতম কল্পনাতেও ভাবেন নি, আর দুসপ্তাহ পরেই তাকে আবার আলোচনায় আসতে হবে, তাও তার স্বামী রাজ কুন্দ্রার বদৌলতে। তিনি হয়তো দুঃস্বপ্নেও ভাবেন নি, এমন এক খবরের সাথে জড়িয়ে যেতে হবে তাকে, যা তার পরিবারের ভিত্তিকেই নড়িয়ে দেবে খানিকটা। 

মুম্বাইয়ের ধনকুবের রাজ কুন্দ্রার সাথে অভিনেত্রী শিল্পা শেঠীর বিয়ে হয় ২০০৯ এ। এই বিয়ে অবশ্য রাজ কুন্দ্রার দ্বিতীয় বিয়ে। এর আগে যাকে রাজ বিয়ে করেছিলেন; অর্থাৎ তার প্রথম স্ত্রী কবিতা কুন্দ্রার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক থাকায়, সে বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। বিচ্ছেদ হয়ে যায় দুজনের মধ্যে। বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলাকালেই রাজ-শিল্পার মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে বন্ধুত্ব, সেখানে থেকে প্রণয়, পরিণয়। শিল্পা-রাজের এক যুগের দাম্পত্য জীবনে নানা অনুসঙ্গের ছড়াছড়ি। যেসব অনুসঙ্গ নেটিজেনদের বিস্ময়, ঈর্ষার খোরাকও যুগিয়েছে সময়ে-অসময়ে। কখনো মুম্বাইয়ের সমুদ্রমুখী প্রাসাদ, কখনো বুর্জ খলিফার ব্যয়বহুল অ্যাপার্টমেন্ট, কখনো ইংল্যান্ডের অট্টালিকা, ব্যক্তিগত বিমান, বিলাসবহুল গাড়ি... যারা শিল্পা শেঠির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করেন, তারা মাঝেমধ্যেই চমকে ওঠেন বিত্তশালী এ দম্পতির ক্ষমতা-প্রদর্শণীর ভোজবাজিতে। বলিউডের এই দম্পতিকে নিয়ে এখন পর্যন্ত হওয়া সংবাদগুলোর অধিকাংশই যে অঢেল সম্পত্তিবিষয়ক, তা একটু খতিয়ে দেখলেই বুঝতে পারা যাবে। 

দাম্পত্যজীবনে দারুণ সুখী এ দম্পতি! 

রাজ কুন্দ্রা গত সোমবার যখন মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের কাছে আটক হলেন, তাও পর্নো ভিডিও বানিয়ে তা নিয়ে ব্যবসা খুলে বসে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে, সেটা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা বলিউডকেই। অবশ্য শুধু বলিউডও বা কেন, যারা এই দম্পতির সাথে অনলাইন-অফলাইনের সুবাদে কমবেশি সম্পর্কিত, তারাও হতভম্ব। যদিও রাজ কুন্দ্রা আইপিএল কেলেঙ্কারি, মানি লন্ডারিং কেলেঙ্কারি সহ আরো বিতর্কে এর আগেও সংবাদের পাত্র হয়েছেন, কিন্তু এরকম মারাত্মক অভিযোগে তিনি যে এর আগে কখনো অভিযুক্ত এবং গ্রেফতার হন নি, তা বলাই বাহুল্য। 

গত ফেব্রুয়ারিতে মুম্বাই পুলিশের কাছে এক মহিলা অভিযোগ করেন, এক সংঘবদ্ধ চক্র পর্নো ভিডিও'র নায়িকা হওয়ার বিনিময়ে তাকে সিনেমায় অভিনয় করার প্রলোভন দেখায়। এই মহিলা পরবর্তীতে সেই পর্নোভিডিওতে অভিনয়ও করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে আর সিনেমায় কাজের সুযোগ দেয় না এই চক্র। প্রতারিত মহিলা পরবর্তীতে মুম্বাই পুলিশের দ্বারস্থ হলে, তারা রহস্য উদঘাটনে নামেন। যে রহস্য উদঘাটনের প্রতিক্রিয়াতেই কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসতে থাকে বড়সড় একেকটা কেউটে। 

রাজ কুন্দ্রার নেতৃত্বে এই সংঘবদ্ধ চক্র মাধ আইল্যান্ডের কিছু বিশেষ বাংলো ভাড়া করে নিতো এই পর্নোগ্রাফিক ভিডিওগুলো শ্যুট করার জন্যে। ভিডিও রেডি হওয়ার পরে সেগুলো প্রথমে পাঠিয়ে দেওয়া হতো যুক্তরাজ্যে। সেখান থেকে প্রসেস করার পরে এগুলোকে 'হটশটস' নামের এক অ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হতো সারা পৃথিবীতে৷ এই অ্যাপটিকে বলা হয়েছিলো 'পৃথিবীর প্রথম ১৮+ অ্যাপ', যেখানে অশ্লীল ভিডিওগুলো নিয়মিত আপলোড করা হতো। আপত্তিকর সব কন্টেন্টের জন্যে অ্যাপল অ্যাপস্টোর এবং গুগল প্লেস্টোর... দুই জায়গা থেকেই এই অ্যাপটিকে বাতিল করা হয় বেশ কিছুদিন আগে। তাও লুকিয়েচুরিয়ে কার্যক্রম চলছিলো 'হটশটস' এর৷ এবং রাজ কুন্দ্রার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বতেই চলছিলো সব। যদিও তিনি দাবী করেন, ২০১৯ সালে তিনি ২৫০০০ ডলারের বিনিময়ে এই অ্যাপটিকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। 

'হটশটস' নামের এই অ্যাপটির পেছনে যুক্ত আছে দুটি কোম্পানি; ভিয়ান এবং কেনরিন। এই দুটি কোম্পানির সাথেও যুক্ত রাজ কুন্দ্রা। রাজ কুন্দ্রা, তার ভিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে পর্নো  ভিডিওগুলো সরবরাহ করতেন যুক্তরাজ্যের কেনরিন ফার্মে। যুক্তরাজ্যের এই ফার্মের ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন রাজ কুন্দ্রার নিজের ভগ্নিপতি প্রদীপ বক্সী। এখানে ভিডিওগুলো আসার পরে সেগুলোকে প্রসেস করে পরবর্তীতে অ্যাপের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া হতো। 

গ্রেফতারের পর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাজ কুন্দ্রা কে! 

পর্নোগ্রাফির সাথে যুক্ত এ চক্রটি বহুদিন ধরেই চালিয়ে যাচ্ছিলো তাদের কাজ। মূল কর্তাব্যক্তিরা থাকতেন আড়ালে-আবডালে,  সেখান থেকে ছড়ি ঘোরাতেন বিভিন্ন মহলের উপর। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারির ওই মামলার পরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। শুরু হয় গবেষণা। বেরিয়ে আসে অজস্র সব তথ্য। জানা যায়, বলিউডের মডেল পুনম পান্ডে ২০১৯ সালে মামলাও করেছিলেন, রাজ কুন্দ্রার বিরুদ্ধে। পুনম পান্ডের অনুমতি ছাড়াই নাকি তার আপত্তিকর ছবি এবং মোবাইল নাম্বার দেয়া হয়েছিলো 'হটশটস' অ্যাপ এ। যদিও রাজ কুন্দ্রা তখনও দাবী করেছিলেন, এই অ্যাপ তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। পুনম পাণ্ডে তখন কোনো সুবিচার পান নি আর। 

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পরে এখন বলিউড মোটামুটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। রাজ কুন্দ্রাকে নির্দোষ হিসেবে দেখছে এক পক্ষ। আরেক পক্ষ তাকে দেখছেন ভয়ঙ্কর দোষী হিসেবে। এই পর্নোগ্রাফিক চক্রের সাথে কাজ করেছেন এবং আটটি ভিডিওতে অভিনয় করেছেন এমন এক মডেল গেহনা ভাসিস্থ যেমন রাজ কুন্দ্রার পক্ষেই কথা বলছেন। তিনি জানান- যে ভিডিওগুলোতে তিনি অভিনয় করেছেন সেগুলো রগরগে এবং খুবই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে ভরা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলো মোটেও পর্নো ভিডিও না। আবার পুনম পান্ডে অথবা কঙ্কনা রানাউতের মতন মডেল ও অভিনেত্রীরা অভিযোগের বাণে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিচ্ছেন মুম্বাইয়ের বিশিষ্ট এ শিল্পপতিকে। অনেকে আবার সহমর্মিতা দেখাচ্ছেন শিল্পা শেঠির উদ্দেশ্যে। আবার কেউ কেউ এমনও বলছেন, শিল্পা শেঠি নিজেও হয়তো জড়িত এই চক্রের সাথে। কারণ, স্বামীর প্রায় অধিকাংশ বিজনেস ভেঞ্চারের সাথেই জড়িত সে। এই চক্রের সাথে শিল্পার সংযুক্ত থাকার সম্ভাবনা অবশ্য উড়িয়ে দিতে পারছে না মুম্বাই পুলিশও। তাদের অনুসন্ধান তাই এখনও চলছে। 

মধ্যবিত্ত এক পাঞ্জাবি পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের পরিশ্রম ও তাকদীরের জোরে অঢেল প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হয়েছেন রিপুসূদন কুন্দ্রা ওরফে রাজ কুন্দ্রা। ব্যবসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্রপত্রিকা-ম্যাগাজিনের শিরোনামে মাঝেমধ্যেই উঠে এসেছেন সাফল্য, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দিয়ে। আইপিএল থেকে মার্শাল আর্টস, মেটাল বিজনেস থেকে কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি...যেখানেই হাত দিয়েছেন সোনা ফলিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও দারুণ জনপ্রিয়তা তার। তবু কেন এরকম এক বিষয়ের সাথে জড়ালেন নিজেকে, হলেন বিতর্কিত, সে প্রশ্নের উত্তর কারো কাছেই নেই। হয়তো খোদ রাজ কুন্দ্রার কাছেও নেই এই প্রশ্নের উত্তর। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা