আপনি জনার্দন হয়ে মন খারাপ করে দিয়েছেন, বেদ হয়ে জীবনকে উপভোগের মানে শিখিয়েছেন, বরফি হয়ে কখনও হাসিয়েছেন, পরমূহুর্তেই চোখের কোণা ভিজে উঠেছে আপনার প্রতি মমতায়...

প্রিয় রণবীর, আপনার নাম শুনে একটা সময় ভীষণ বিরক্ত হতাম, জানেন? আমি মারকাটারি শাহরুখভক্ত, সেই শাহরুখের সিনেমার সাথে একই দিনে নাকি আপনার সিনেমা মুক্তি দিচ্ছেন সঞ্জয় লীলা বানশালি! দু'দিনের ছোকরা হয়ে শাহরুখকে টেক্কা দিতে আসা! এমন বেয়াদবি কি মেনে নেয়া যায়? সাওয়ারিয়া'র বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ার খবর যখন পেলাম, কি যে খুশি হয়েছিলাম, বিশ্বাস করতে পারবেন না। শাহরুখের পেছনে লাগতে  এসেছিলে না? বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছে বাছা! 

আমার দেখা আপনার প্রথম সিনেমার নাম 'আজব প্রেম কি গজব কাহিনী'। আমি তখন টিনএজে, ক্লাস টেনে পড়ি। প্রেম শঙ্কর শর্মা নামের সেই চরিত্রটার ফ্যান হয়ে গেলাম মূহুর্তেই। ইচ্ছে হলো, আমিও এমন একটা 'হ্যাপী ক্লাব' খুলে সেটার প্রেসিডেন্ট হয়ে যাই, তারপর শহরজুড়ে এমন শয়তানীর আসর বসাই। 

'রাজনীতি' দেখেছি অনেক পরে, তার আগে দেখেছি 'রকস্টার', একটুও ভালো লাগেনি। আঠারো-উনিশ বছর বয়সের একটা ছেলে, যে তামিল সিনেমা দেখে তৃপ্তি পায়, রোমান্টিক মুভি দেখে আবেগে ভাসে, তার কাছে রকস্টার ভালো লাগার কথাও নয়, ডজনখানেক গানের আড়ালে ডুবে থাকা মর্মার্থগুলোও অনুধাবন করা প্রায় অসম্ভব। ফিল্মফেয়ারে সেবছর যখন আপনার হাতে সেরা অভিনেতার পুরস্কারটা উঠলো, তখন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম, কি এমন অসাধারণ কাজটা করেছেন আপনি, যে ব্ল্যাক লেডি'টা হাতে উঠে গেল!

রনবীর কাপুর, রকস্টার সিনেমায়

পরের বছর একই চিত্র, এবার বরফি দিয়ে জিতলেন ফিল্মফেয়ার। আপনার এই সিনেমাটা ভালো লেগেছিল, শারিরীক প্রতিবন্ধকতাকে কি দারুণভাবেই না আপনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন পর্দায়। মূকাভিনয়টা বলিউডে কখনোই খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি, সেই কঠিণ কাজটা আপনাকে দিয়ে করালেন অনুরাগ বসু, সেই পরীক্ষায় আপনি লেটার মার্ক নিয়ে পাশ! 

তারপর একটু যেন খেই হারালেন, সিনেমা বাছাই করতে ভুল করলেন কয়েক দফা। টানা আজেবাজে সিনেমা আসতে লাগলো, প্রশ্ন উঠে গেল, আপনি হারিয়ে গিয়েছেন কিনা! নেপোটিজম নিয়েও আপনাকে ইঙ্গিত করে অনেকে রসালো মন্তব্য করে ফেললো। কমার্শিয়াল সাকসেস এসেছে, কিন্ত ক্লাস এবং ম্যাস- দুই শ্রেণী একসঙ্গে সন্তুষ্ট হচ্ছিলো না আপনার ওপর।

এর মাঝে খুব অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটলো, আমি দুম করে আপনার প্রেমে পড়ে গেলাম! এক মূহুর্তে পতন যাকে বলে। সিনেমার নাম তামাশা, কর্সিকা থেকে দিল্লি, পুরো জার্নিটায় আমি আপনার সঙ্গে ছিলাম। না না, ভুল হলো, আপনার মধ্যে আমি ছিলাম। সিনেমায় আমি কোথাও রনবীর কাপুরকে দেখিনি, আমি নিজেকে দেখেছি, বেদ বর্ধন সাহনী হয়ে আমি নিজেই যেন পর্দায় অভিনয় করছি, আমার চরিত্রে! 

সিনেমার নাম তামাশা

তামাশা আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, কয়েক মিনিট দেখার পরেই ফোনটা ফ্লাইট মুডে রেখে দিয়েছিলাম, কেউ যাতে বিরক্ত করতে না পারে! দুনিয়া চুলোয় যাক, আমার পক্ষে এই মোহ ছেড়ে ওঠা সম্ভব নয়। নিজের জীবনের অপ্রাপ্তি, যন্ত্রণা, হতাশা- সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল বেদ চরিত্রটার সঙ্গে, আজ পর্যন্ত আর কোন চরিত্রের সঙ্গে আমি নিজেকে এতখানি মেলাতে পারিনি। 

তারা'র কাছে প্রত্যাখ্যাত হবার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার ছোট্ট যে দৃশ্যটা, সেটা আমি এখনও দেখি, কয়েক হাজারবার দেখা হয়ে গেছে, পুরনো হয় না তবুও। বাবাকে মিডিওকারের গল্প শোনানো কিংবা কর্সিকায় তারার সাথে দেখা হবার যে সিকোয়েন্সগুলো, আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি শুধু। এখনও আমাকে কেউ আমার সবচেয়ে প্রিয় সিনেমার নাম জিজ্ঞেস করলে সাতপাঁচ না ভেবে আমি শুধু তামাশার কথাই বলি। এই সিনেমাটা আমার জীবনের সঙ্গে, আমার লাইফস্টাইলের সঙ্গে মিশে আছে। 

তারপর রকেট সিং দেখলাম, এত আন্ডাররেটেড একটা সিনেমা, কি চমৎকার সাবলীল আপনার অভিনয়! রাজনীতিতে মনোজ বাজপায়ি, নানা পাটেকরদের মতো দুর্দান্ত অভিনেতাদের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করছেন একেবারেই নবিশ অবস্থায়, অভিনয় দেখে বোঝার উপায় নেই, অভিজ্ঞতার স্কেলে বাকীদের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে ছিলে আপনি তখন। লোকে আপনাকে স্টারকিড বলে পাত্তা দিতে চায়নি শুরুতে, সেই আপনি যে মেধার ভাণ্ডার মাথায় নিয়েই ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছেন, সেটা বোঝাতে দেরী করেননি খুব বেশি। 

আবারও রকস্টার দেখলাম অনেক পরে, এই বছরেই। ততদিনে আমি সিনেমাটা একটু-আধটু বুঝি। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে পুরো তিন ঘন্টা আপনার অভিনয়টা দেখে গেলাম। এ আর রেহমান আর মোহিত চৌহানের সঙ্গে মিলে ইমতিয়াজ আলী যে অদ্ভুত একটা মিউজিক্যাল ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড তৈরি করেছিলেন, সেটা পর্দায় কি দুর্দান্তভাবেই না উপস্থাপন করলেন আপনি! কষ্ট, ব্যাথা, যন্ত্রণা- শিল্পী হবার সাধনায় পুরো সিনেমাজুড়ে আপনার মধ্যে শুধু কষ্টটাই দেখলাম আমি, আমি নিজে অনুভব করতে পারলাম আপনার যন্ত্রণাটা। 

বরফি'র নির্বাক চরিত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন রনবীর

এই সিনেমার প্রত্যেকটা ডায়লগ, প্রতিটা দৃশ্য, প্রত্যেকটা সেকেন্ড আমি উপভোগ করেছি, একদম নিজের মতো করে। অভিষেকের চার বছরের মাথায় এইরকম একটা রোল করে ফেলা চাট্টেখানি কোন কথা না। আমি হলফ করে বলতে পারি, আপনার সমসাময়িক যারা আছে ইন্ডাস্ট্রিতে, তাদের কেউ কখনও জনার্দন হতে পারবে না, আপনি নিজেও হয়তো আরেকবার 'জেজে' চরিত্রটা করে দেখাতে পারবেন না কোনদিন। 'রকস্টার' একবারই আসে, জনার্দনরাও ওয়ান টাইম মেড টাইপের ক্যারেক্টার। 

আপনিই বোধহয় একমাত্র নায়ক, যার মুক্তি পাওয়া সবগুলো সিনেমাই আমার দেখা হয়েছে। আনজানা আনজানি, ওয়েক আপ সিড, বা ফিল্মফেয়ার জিতে ফেলা সাঞ্জু- এতসব দারুণ পারফরম্যান্সও আমার কাছে সাদামাটা লেগেছে, কেন জানেন? আমি আপনাকে রকস্টার করতে দেখেছি, বরফিতে কোন সংলাপ ছাড়াই অভিনয় দিয়ে আপনাকে হৃদয় জিতে নিতে দেখেছি, তামাশা দেখে অন্ধের মতো আপনার প্রেমে পড়েছি। এরপরে বাকী সবকিছুকে সাধারণ মনে হওয়াই তো স্বাভাবিক, তাই না? 

আপনি জনার্দন হয়ে আমার মন খারাপ করে দিয়েছেন, বেদ হয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, জীবনের যে রাস্তাটায় আমি চলছি, সেখানে উপভোগ বলে কোন বস্তু নেই, নয়টা-পাঁচটার পাঁচালিতে ভরা জীবনটা সবার জন্যে নয়, এই সত্যটা আমি আপনার কাছেই জেনেছি। বরফি হয়ে কখনও হাসিয়েছেন, পরমূহুর্তেই চোখের কোণা ভিজে উঠেছে আপনার প্রতি মমতায়। নিজের অভিনীত চরিত্রগুলোকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছেন আপনি আমাকে, সেটা একবার-দু'বার নয়, বারবার, বহুবার...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা