বলিউডে তিনি একজন আউটসাইডার। অথচ অভিষেকের মাত্র দশ বছরের মধ্যেই নিজের জনপ্রিয়তা ও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম, কাজের প্রতি ডেডিকেশন, এবং অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা রণবীরকে আজ এখানে নিয়ে এসেছে...

এই প্রজন্মের অন্যতম বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অভিনেতা হিসাবে রণবীর সিং নিজেকে প্রমান করেছেন অনেক আগেই। সাধারন দর্শক হোক, বা প্রযোজক, পরিচালক অথবা সমালোচক- এই সময়ে এসে বলিউডের আগামীদিনের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার হবার দৌড়ে তার নামটা উপরের দিকেই রাখবেন সবাই। বক্স অফিসে হিট বা সুপারহিট হোক অথবা ক্রিটিক্যালি অ্যাক্লেইমড সিনেমা- সব তালিকাতেই তিনি বিরাজমান।  

এই বলিউড অভিনেতার পুরো নাম রণবীর সিং ভাবনানি। ১৯৮৫ সালের ৬ জুলাই মুম্বাই শহরে এক সিন্ধি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই রণবীর অভিনেতা হতে চাইতেন। স্কুলের একাধিক নাটক ও বিতর্কে অংশও নিতেন। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যাচেলর অফ আর্টস ডিগ্রি অর্জন করে ২০০৭ সালে মুম্বাইতে ফিরে কয়েকটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন। অনেকগুলো সিনেমায় অডিশন দেবার পরে ২০১০ সালে ইয়াশ রাজ ফিল্মসের রোম্যান্টিক কমেডি 'ব্যান্ড বাজা বারাত' সিনেমায় আনুশকা শর্মার সাথে জুটি বেধে বলিউডে এন্ট্রি নেন। প্রথম সিনেমায় অভিনয় করেই রণবীর শ্রেষ্ঠ নবাগত অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। 

তবে রণবীরের ক্যারিয়ারের মালইস্টোন ছিল অবশ্যই ‘লুটেরা’। বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানির এই সিনেমাতে এক অন্য রণবীরকে খুঁজে পেয়েছে দর্শক এবং সমালোচক। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা মুক্তির আট বছর পূর্ন করেছে গতকাল। বাস্তব জীবনের সদা প্রাণোচ্ছ্বল ছেলেটার হাতে গোনা কয়েকটা ডায়লগ ছিল এই সিনেমাতে। ধীর-স্থির-শুধুমাত্র চোখ আর শরীরী ভঙ্গি দিয়েই বুঝিয়েছিলেন মনের ভাব। মার্কিন লেখক ও হেনরির ‘লাস্ট লিফ’ অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমা রণবীরের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স। 

সিনেমার নাম ব্যান্ড বাজা বারাত

প্রফেশনাল হোক আর পার্সোনাল রণবীরের ক্যারিয়ারের অন্যতম আলোচিত এবং প্রশংসিত সিনেমা ‘গোলিও কি রাসলীলা- রামলীলা’। সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমায় এটাই প্রথম কাজ রণবীরের, এই সিনেমার সেটেই নিজের ভালোবাসার মানুষ, যার সাথে পরবর্তীতে পরিনয়েও বাধা পড়েছেন সেই দীপিকা পাডুকোনের সঙ্গেও প্রথম পরিচয়। 

সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমা মানেই লার্জার দ্যান লাইফ স্কেল, নিজের ক্যানভাসে ইচ্ছামতো রঙ মাখিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করতে ওস্তাদ বানসালি। সেই ক্যানভাসে রণবীর সিংও মিলেমিশে একাকার হয়েছিলেন। 'রোমিও জুলিয়েট' এর প্রেক্ষাপটে গুজরাটের দুটি শত্রু মাফিয়া পরিবারের গল্পে রোমিও হিসেবে রণবীর নিঃসন্দেহে আজও দর্শকদের মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল। ২০১৩ সালে মুক্তি প্রাপ্ত এই সিনেমা বক্স অফিসে সফল হবার পাশাপাশি প্রথমবার স্টার তকমাও এনে দেয় রণবীর সিংকে। সাথে দীপিকার সাথে তার জুটিও আলোচনা এবং প্রশংসা পায়। 

২০১৪ সালে অ্যাকশন-ড্রামা ধর্মী 'গুন্ডে' সিনেমায় একজন গুণ্ডা চরিত্রে তার অভিনয় আলোচিত হয়। ইরফান খান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সাথে পাল্লা দিয়েই অভিনয় করেন তিনি। ২০১৫ সালে জয়া আখতারের কমেডি এবং ফ্যামিলি ড্রামা 'দিল ধাড়াকনে দো' সিনেমায় উচ্চবিত্ত এক তরুনের চরিত্রেও দারুণ অভিনয় করেন তিনি। জুটি হিসেবে আনুশকা এবং বোন হিসেবে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া- দুজনের সাথেই দারুণভাবে মিশে গিয়েছিলেন রণবীর।

সেই বছরেই আবারো সঞ্জয় লীলা বানসালির পরিচালনায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘বাজিরাও-মাস্তানি’ সিনেমায় বাজিরাও হিসেবে হাজির হন রণবীর সিং। প্রথমবার পিরিয়ডিকাল সিনেমায় অভিনয়। মারাঠা পেশোয়া বাজিরাওয়ের চরিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জ। ৩০০ বছর আগের এক নিভীর্ক মারাঠা পেশোয়া হয়ে উঠতে প্রচুর পরিশ্রম করেছিলেন রণবীর। বাজিরাও-র ব্যক্তিত্বকে রুপালি পর্দায় তুলে ধরতে কোনও চেষ্টার বাকি রাখেননি রনভীর সিং। এই সিনেমায় মাস্তানী চরিত্রে দীপিকা এবং কাশিবাঈ চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা দুজনের সাথেই তার জুটি প্রশংসিত হয়েছিলো। বলা যায় এই সিনেমা দিয়েই অভিনেতা হিসেবে বলিউডে আসন পোক্ত করেন তিনি। জিতে নেন ফিল্মফেয়ারের সেরা অভিনেতার পুরস্কার। 

রণবীর যখন পেশোয়া বাজীরাও

মাঝে আলোচিত 'বেফিকরে' সিনেমাটি নিয়ে আশা থাকলেও বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ে সিনেমাটি। সিনেমার গান এবং বেশ কিছু দৃশ্য আলোচনায় থাকলেও হতাশ হতে হয় দর্শকদের। তবে রণবীরের কেরিয়ারের সব চ্যালেঞ্জকে নিঃসন্দেহে ছাপিয়ে গিয়েছিল ‘পদ্মাবত’। বানসালির সঙ্গে রণবীরের তৃতীয় সিনেমা। জুটি বেধে দীপিকার সাথেও তৃতীয় সিনেমা। বক্স অফিসের সফল এই ত্রয়ীর সাথে এবার যোগ দেন শহীদ কাপুর। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির ভূমিকায় দেখা মিলেছে রণবীর সিংয়ের। 

আরেকবার ইতিহাস নির্ভর চরিত্র,কিন্তু এবার সঙ্গে রয়েছে লোকগাথাও।  একদিকে রাজপুত লোকগাঁথার ভিলেন খিলজি, অন্যদিকে ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি এই দুইয়ের মিশেলকে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা সহজ নয়। ভীষন কঠিন এই চরিত্রকে রণবীর শুধু দক্ষতার সাথে তুলেই ধরেননি। মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন রীতিমতো। সমলাোচকদের মতে ‘পদ্মাবত’র সেরা প্রাপ্তি রণবীর সিং, এই সিনেমার নাম তো অনেকের মতে ‘পদ্মাবত’ নয়, খিলজিবত হওয়া উচিত ছিল। এই সিনেমার পরে আক্ষরিক অর্থেই সুপারস্টার হিসেবে বলিউডে নিজের বিজয় নিশাণ উড়িয়েছেন তিনি। ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার সমালোচক পুরস্কার জয় করেন রণবীর এই সিনেমা দিয়ে।

একই বছর হিট মেশিন খ্যাত রোহিত শেঠীর পরিচালনায় 'সিম্বা' মুক্তি পেলো। এক দুর্নীতিবাজ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরেছেন রনভীর। সিনেমার চরিত্রের সাথে বাস্তব রণবীর সিং যেনো মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। বক্স অফিসে অসাধারন ব্যবসা করে 'সিম্বা'। সাথে এই সময়ের অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত সুপারস্টার হবার দৌড়ে নিজের স্থান পোক্ত করে নেন। 

নিজেকে ভাঙার খেলায় রনভীর যে কোনো ছাড় দেননা তার প্রমান আবারো দেন জয়া আখতারের 'গাল্লি বয়' সিনেমার মধ্য দিয়ে। মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তিতে বাস করা মুরাদ নামের এক যুবকের চরিত্রে অসাধারন অভিনয় করেন তিনি। যে কিনা একজন একজন র‍্যাপার, যে তার সামাজিক-আর্থিক সব অসংগতি সত্ত্বেও তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। নিজের মতো করে এগিয়ে যায় মুরাদ আর হয়ে ওঠে তারকা। ঝড় তোলে তার গান। আর চরিত্রে তার অভিনয় আবারো মন জয় করে দর্শক এবং সমালোচক দের। ফলাফল এবারও ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয়।

গাল্লি বয় সিনেমার একটি দৃশ্যে রণবীর ও আলিয়া

করোনা পরিস্থিতি উদয় না হলে গত ক্রিসমাসে মুক্তি পাবার কথা ছিলো বহুল প্রতীক্ষিত ‘৮৩’। এই সিনেমার মাধ্যমে রুপালি পর্দায় আবারো এক আইকনিক চরিত্র হিসাবে দেখা যাবে রণবীর সিংকে। এবার তাকে দেখা যাবে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা হরিয়ানা হ্যারিকেন কপিল দেবের চরিত্রে। এবং এই সিনেমায় কপিল দেবের স্ত্রীর চরিত্রে দেখা যাবে রনভীরের রিয়েল লাইফের বেটার হাফ দীপিকা পাডুকোনকেই। 

বিয়ের পর এই প্রথমবার জুটি বেঁধে সিনেমায় আসছেন দীপিকা-রণবীর। সিনেমাটি পরিচালনায় আছেন বলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক কবীর খান। করোনা পরিস্থিতি উদয় না হলে এতদিনে দর্শকরা রুপালি পর্দায় ১৯৮৩-র বিশ্বকাপ জয়ের সোনালি মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে যেতেন। করোনার প্রভাব কাটলেই হলে আসবেন রণবীর সিং। এই চরিত্রের সঙ্গে কতখানি সুবিচার করবেন তিনি,তা সময়ই বলবে। সিনেমার স্টিল ছবি এবং কিছু পোষ্টারে রনভীরের লুক প্রশংসা কুড়িয়েছে সকলের। 

অন্যদিকে এই বছরেই মুক্তি পাবার কথা বলিউডে প্রথম কাজ করতে আসা লেখক এবং পরিচালক দিব্যাঙ্গ ঠাক্কারের সিনেমা “জয়েশভাই জোরদার”। সিনেমায় একজন গুজরাটির চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যাবে রণবীর সিংকে। সিনেমার প্রযোজনায় আছেন  ইয়াশ রাজ ফিল্মস। তবে করোনার কারনে রিলিজ পেছানো হতে পারে। সামনে শ্যুটিং শুরু হবার কথা ছিলো করণ জোহরের মাল্টিস্টারার সিনেমা ‘তখত’ এর। এই সিনেমায় অভিনয় বিষয়ে তিনি ইন্ডিয়া টুডেতে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “আমি সবসময় চাইতাম করণের সঙ্গে কাজ করতে। আর এই সিনেমায় উনি আমাকে খুবই বড় মাপের একটা চরিত্র দিয়েছেন। এই ধরনের সিনেমা আমি এতদিনের ক্যারিয়ারে করিনি। আশাকরি দর্শকেরা হতাশ হবে না।” 

তবে এই সিনেমার আগেই করণ জোহরের পরিচালক হিসেবে কামব্যাক ফিল্ম ‘রকি অর রানী কি প্রেম কাহানী’র অফিশিয়াল ঘোষনা দেয়া হয়েছে আজ। এই সিনেমার মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো জুটি বাধতে চলেছেন আলিয়া ভাটের সাথে। এছাড়া রোহিত শেঠীর পরিচালনায় আরেকটি বিগ প্রজেক্ট ‘সার্কাস’ এ কাজ করছেন তিনি। সাথে আছে জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ, পূজা হেগড়ে সহ আরো অনেকে। এছাড়া দক্ষিণের প্রখ্যাত ডিরেক্টর শংকর এর পরিচালনায় ‘আন্নিয়ান’ এর হিন্দি রিমেকে কাজ করবেন তিনি।

২০১৩ সালে 'গোলিও কি রাসলীলা রামলীলা'  সিনেমায় অভিনয় করার সময় প্রেমে পড়েন বলিউডের আরেক সুপারস্টার দীপিকা পাডুকোনের। পাঁচ বছর প্রেমের পরে ২০১৮ সালে বলিউডের দীপ-বীর জুটি বিয়ের পিড়িতে বসেন ইতালিতে। ইতালির লেক কোমোতে কিছু কাছের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়েই বিয়ের বাধনে আবদ্ধ হন তারা। দক্ষিণ ভারতীয় রীতি মেনেই বিয়ে হয়েছে দীপ-বীরের। পরে অবশ্য দেশে ফিরে বেশ কয়েকটি রিসেপশনের আয়োজন করেন তারা। দুজনেই পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে নিজের কাজ করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও সুখে শান্তিতেই জীবন কাটাচ্ছেন এই সফল বলিউড জুটি।

ইতালিতে বিয়ের অনুষ্ঠানে রণবীর-দীপিকা

বলিউডে একজন বহিরাগত হিসাবে এন্ট্রি নিয়েছিলেন রণবীর সিং। মাত্র দশ বছরের মধ্যেই নিজের জনপ্রিয়তা ও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম, কাজের প্রতি ডেডিকেশন, এবং অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাকে আজ এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। কখনও রোম্যান্টিক হিরো, কখনও বস্তির ছেলে, কখনও বা খলনায়ক। সব চরিত্রে নিজেকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেতা। 

বাস্তব জীবনে বিভিন্ন ইভেন্টে তার অদ্ভুত পোষাক যতটা আলোচনা বা সমালোচনা কুড়াক না কেনো অভিনয়ের সময় চরিত্রের জন্য নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেন পরিচালকের হাতে। তার মতে এটাই একজন নায়কের ভাগ্যের সোনার কাঠি। এক সাক্ষাৎকারে রণবীর সিং জানিয়েছেন, “আমি খুবই সাধারণ মানুষ একজন। আমার মাথাতে বড় তারকার তকমাটি নেই, নিতেও চাই না। আমি এখনও শিশু যার দু চোখে তারকা হওয়ার স্বপ্ন এখনো রয়েছে। আমি নিজে কোনওদিন ভাবিনি এত বড় তারকা হয়ে যাব। তবে আমি এরকমই থাকতে চাই আজীবন।”


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা