'রে' সিনেমার ট্রেলার দেখে মুগ্ধ হয়েছি। অনসম্বল কাস্ট, মাস্টারমাইন্ড সত্যজিৎ রায়ের গল্প, নেতৃত্বে তিনজন দুঁদে পরিচালক...প্রত্যাশার পারদ মনুমেন্ট ছুঁইছুঁই হওয়া উচিত৷ হয়েছেও, কিন্তু একটা খটকা...

শৈশবে যে বই পড়ে ছোটগল্পের পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিলাম, তার নাম- গল্প ১০১। লেখক সত্যজিৎ রায়। তারিণীখুড়ো, প্রফেসর হিজবিজবিজ, সাধনবাবু, মাস্টার অংশুমান আর ফটিকচাঁদের সাথে সখ্যতা এই বই পড়তে পড়তেই। এরপর সময় গড়িয়েছে৷ পাল্টেছে অনেককিছু। কিন্তু 'গল্প ১০১'  নিয়ে আকর্ষণ এখনো আছে ঠিক সেদিনের মতন, যেদিন প্রথম হাতে উঠেছিলো বইখানি। 

অনেক সময়েই ভেবেছি, এই বইয়ের গল্পগুলো নিয়ে অনায়াসেই সিনেমা, সিরিজ, নাটক করা যায়। হয়েছেও। এই গল্পগুলো থেকে সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায় নাটক করেছেন, সিনেমা করেছেন। ডাকসাইটে অভিনেতারা অভিনয়ও করেছেন সেখানে৷ কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন সুর কেটে যাচ্ছিলো বারবার৷ যুতসই হচ্ছিলো না।  আক্ষেপ বাড়ছিলো ক্রমশই। এরপরই ঘোষণা এলো, 'রে ' আসতে চলেছে। ভাবলাম, রায়বাবুর গল্পগুলোর পর্দায়  উৎকর্ষজনিত বন্ধ্যাদশা হয়তো ঘুচতে যাচ্ছে এবার। 

'রে' আসছে নেটফ্লিক্সে! 

'রে' আসবে নেটফ্লিক্সে, সিনেমা-সিরিজের খোঁজখবর যারা রাখেন, তাদের এ তথ্য নখদর্পনে। সত্যজিৎ রায়ের চার গল্পকে কেন্দ্র করে তিন পরিচালক- সৃজিত মুখার্জি, অভিষেক চৌবে, ভাষাণ বালার পরিচালনায় 'রে'র ট্রেলার রিলিজ পাওয়ার পর খুঁটিয়ে দেখলাম বেশ কিছুক্ষণ। মনোযোগ দিয়ে দেখার পর একটা জিনিস স্পষ্ট হলো, 'ক্রিয়েটিভ লিবার্টি'র সুযোগ নিয়ে পরিচালকেরা ইচ্ছেমত ভেঙ্গেছেন সত্যজিৎ রায়ের গল্পগুলোকে।

মডার্ণ টাইমে আনতে গিয়ে গল্পগুলোকে নানা ছাঁচে ফেলে যেসব অবয়ব দেয়া হয়েছে, তা মূল সড়ক থেকে হয়তো অনেকটুকুই ভিন্ন পথে হাঁটবে। এখানেই ভয়। অন্য ভাষাভাষী অডিয়েন্স যারা সত্যজিৎ এর গল্প খুব বেশি পড়েননি বা সাহিত্য থেকে সিনেমায় অ্যাডাপ্টেশন-জনিত পরিবর্তনে যাদের কোনো হেলদোল নেই, তাদের হয়তো ভালো লাগবে। কিন্তু বাঙ্গালি সমাজ প্রচণ্ড গোঁড়া। তারা তাদের আইকনদের কাজ নিয়ে বরাবরই রক্ষণশীল। সত্যজিৎ রায়ের গল্পকে খোলনলচে পাল্টে অন্য চেহারা দেয়ার এই দক্ষযজ্ঞে  বাঙালি দর্শকেরা কিরকম প্রতিক্রিয়া দেখাবে, ধন্দের বিষয় সেখানেই। 

এই সিনেমার চার গল্পের মধ্যে দুটিই সৃজিত মূখার্জীর।  কয়েকদিন আগে যিনি সত্যজিৎ রায়ের 'ফেলুদা' সিরিজের দুটি গল্প থেকে ওয়েব সিরিজ বানালেন। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, ওয়েব সিরিজে তিনি রায়বাবুর মূল বইয়ের সংলাপ, দৃশ্যপট, ফ্রেম টু ফ্রেম ন্যারেশন... সবই রেখেছিলেন অবিকৃত। সেই তিনিই যখন 'রে' মুভির দুটি গল্পের দখলদারিত্ব পেলেন, ইচ্ছেমত যে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছেন, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। বাকি দুইজন পরিচালকও সেভাবেই এগিয়েছেন৷ যদিও ট্রেলার দেখেই সিনেমার ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা বলা মোটেও সমীচীন নয়। তবে অ্যাডাপ্টেড গল্পগুলো যদি ঠিকঠাকভাবে এক্সিকিউট করা না যায়, তাহলে ট্রেলার দেখে এখন যে হাততালি পাওয়া যাচ্ছে, তা গালিতে রূপান্তরিত হতে খুব বেশি সময় যে লাগবে না, তা হলফ করে বলা যায়।

'বহুরূপী' গল্পে কেকে মেনন! 

ট্রেলার দেখে এমনিতে মুগ্ধ হয়েছি। হবো নাও বা কেন!  একই নির্মাণে যদি মনোজ বাজপেয়ী, কেকে মেনন, গজরাজ রাও, শ্বেতা বসু প্রসাদ, অনিন্দিতা বোস, হর্ষবর্ধন কাপুর রা থাকেন, তাহলে নড়েচড়ে বসা বাধ্যতামূলক৷ এরকম অনসম্বল কাস্ট, সাথে মাস্টারমাইন্ড সত্যজিৎ রায়ের গল্প, নেতৃত্বে তিনজন দুঁদে পরিচালক...প্রত্যাশার পারদ মনুমেন্ট ছুঁইছুঁই হওয়া উচিত৷ হয়েছেও। 

দম্ভ, প্রতিশোধ, ঈর্ষা এবং বিশ্বাসঘাতকতা'কে মূল রঙ রেখে এগোনো এই চতুষ্কোণ গল্পে এক কবি আছেন, এক পাগলাটে মেকআপ আর্টিস্ট আছেন, এক টাইপকাস্ট অভিনেতা আছেন, সাথে আছেন এক কর্পোরেট টাইকুন। তাদের যাপিত গল্পে নির্মিত সিনেমা নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার বিগত উল্লেখযোগ্য কাজ- লাস্ট স্টোরিজ, গোস্ট স্টোরিজ বা আজিব দাস্তানস'কে ছাপিয়ে যেতে পারবে কী না , মূল লক্ষ্য থাকবে সেখানেই। 

মনোজ বাজপেয়ীর উপরে প্রত্যাশা থাকবে বেশি!

শেষ করি এক প্রশ্ন দিয়ে। ট্রেলারের সবই ভালো। কিন্তু একটাই খটকা, 'ব্ল্যাক উইডো'র ট্রেলারের বিজিএম কেন কপি করতে হলো 'রে'র ট্রেলারে? এর পেছনের মূল রহস্য কী? 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা