কানে দেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেশের দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হোক রেহানা মরিয়ম নূর, এটাই চাওয়া। কারণ, রেহানার গল্প আমাদের জানা দরকার। এই গল্পগুলো যে আমাদেরই।

বাংলাদেশের বর্ষার মৌসুমি হাওয়া বঙ্গোপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে যায় না বুঝি? সে হাওয়া সেইন নদী পর্যন্তই যাক। সেইন নদী থেকে আসা শীতল বাতাস দুবুসির সামনে বিছানো লাল গালিচা পর্যন্ত আসবে নাকি কে জানে! আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ ও আজমেরি হক বাঁধন দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াতে ব্যস্ত যে লাল গালিচায়। যে লাল গালিচায় বাংলাদেশী একটি সিনেমা নিয়ে তারা গিয়েছেন। পারির লোকজন মুখ উঁচু করে দেখবেও হয়তো ইংরেজিতে লেখা সিনেমাটির নাম- Rehana Maryam Noor।

‘রেহানা মরিয়ম নূর’- শুধু একটা নাম ছিল ক’দিন আগেও। এখন প্রতিটি বাংলাদেশী সিনেমাপ্রেমির স্বপ্নের নাম, গর্বের নাম। এই নামে ভর করেই তো প্রথমবারের মতো কানে পৌঁছে গেল বাংলাদেশের সিনেমা। এতদিন তো শুধু নামই শুনে গিয়েছিলাম আমরা। অবশেষে ট্রেইলার দেখার সুযোগ হল। এবছরের কান চলচ্চিত্রের অভিষেকই হতে যাচ্ছে আমাদের সিনেমা দিয়ে। আগামী ৭ জুলাই, দুপুর ৩ টা ১৫ মিনিটে দুবুসি প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হবে রেহানা মরিয়ম নূর। একটু আগে মুক্তি পেল এই সিনেমাটির ট্রেইলার। কেমন হল ট্রেইলার, কী হতে পারে এই সিনেমার গল্প? চলুন আলোচনা করা যাক।

ট্রেইলারের শুরুতেই দরজা ধাক্কানোর শব্দ। দরজা খুলে বের হয়ে আসে রেহানা চরিত্রে অভিনয় করা বাঁধন। এই দরজা মূলত হাজার বছর ধরে সমাজে রয়ে যাওয়া সেসকল দরজা যেগুলো নারীদের দেখলে বন্ধ হয়ে গেছে। রেহানার মতো নারীরা সেসকল দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলার সাহস রাখে। রেহানা একটি মেডিকেল কলেজের সহকারি অধ্যাপক। একইসাথে সে শিক্ষিকা, সে মা, সে একজন নারী। একদিন সে কলেজে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে দেখে এক ছাত্রীর সাথে। পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠানের ভয়েই হোক ছাত্রীটি সে ঘটনা চেপে রাখতে চায়। কিন্তু রেহানা চুপ থাকতে চায় না। সে বলতে চায়, প্রতিবাদ করতে চায় তার হয়ে। সে বলে ওঠে, ‘ঠিক আছে তুমি কাউকে কিছু বলতে চাও না, কিন্তু আমি এভাবে দিনের পর দিন চুপ করে বসে থাকতে পারবো না।’

কিন্তু ছাত্রীটি চায় না এই ঘটনা সম্মুখে আনতে। হয়তো সে ভয় পায় সমাজকেই, সমাজের মানুষগুলোকে; যাদের সে দিনের পর দিন দেখেছে ভিক্টিম ব্লেমিং করতে। দেখেছে যার সাথে দুর্ঘটনা হয়, তাকেই দোষী সাব্যস্ত করতে। কিন্তু রেহানা জানে এভাবে ভয় পেলে চলবে না। প্রতিবাদ করতে হবে, দোষীদের সামনে আনতে হবে। হোক সে মেডিকেল কলেজের উচ্চপদের কেউ কিংবা ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। ঘটনা জানাজানির ভয়ে সেখান থেকেও হুমকি-ধামকি আসতে থাকে রেহানার দিকে। রেহানা হার মেনে নেয় না। ওদিকে তাঁর মেয়ের স্কুলেও ঝামেলা হয়। সিঙ্গেল মাদার হয়তো রেহানা, এজন্যই তাকে কোণঠাসা করে ফেলতে চায় সবাই। এমনকি তাঁর পরিবারও যেন বিরুদ্ধে চলে যায়। কিন্তু রেহানা লড়াই করে। ছাত্রীটি হুমকি দেয় যে এই ঘটনা কাউকে বললে সে ছাদ থেকে লাফ দিবে। সে এটাও বলে, ম্যাম, আপনার সাথে তো কিছু হয়নাই, আপনি কেন এরকম করছেন? এই প্রশ্ন হয়তো দর্শকের অনেকেরও। যে রেহানার সাথে তো কিছু হয় নি, সে কেন এতো লাফাচ্ছে?

কিন্তু রেহানারই তো করার কথা, তাই না? কারণ, রেহানাকেও এমনকিছুর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে!

রেহানা মরিয়ম নূর ট্রেইলার
ট্রেইলারে দেখে মিলেছে বাঁধনের অনবদ্য পারফরম্যান্সের

দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়েদেরই এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় পথে-ঘাটে, সামাজিক মাধ্যমে, সব জায়গায়। বাংলাদেশে একটা মেয়েও বলতে পারবেনা যে আমাকে উত্যক্ত করা হয় নি বা আমাকে একজনও খারাপ চোখে দেখে নি। আমাদের মা-বোন-স্ত্রী সকলেই রেহানা। কোন রেহানাকে কোণঠাসা করে ফেলতে পেরেছে সমাজ-পরিবার, আবার কোন রেহানাকে পারে নি। যেমন এই রেহানা, রেহানা মরিয়ম নূর। সে কোণঠাসা হবে না। সে প্রতিবাদ করবে। অন্যের সাথে হলেও করবে, কারণ তাঁর সাথেও হয়েছিল, তাঁর সাথেও হতে পারে, তাঁর ছোট মেয়েটার সাথেও হয়তো হবে। তাই, প্রতিবাদের বিকল্প সে খুঁজে পায় নি। মেডিকেল কলেজের মতো জায়গা, যেখানে উচ্চশিক্ষিত সবাই সেখানেও সে মানুষের বেশে পশু দেখেছে। তাই তাকেও সংহারি হতে হবে। রেহানার নীরব চিৎকার দিয়ে শেষ হওয়া ট্রেইলারের পরও তাই কানে বাজে রেহানার ক্ষিপ্র নিঃশ্বাস। আগুনের হলকায় পারলে সে যেন নিঃশেষ করে দেয় সবকিছু।

রেহানা মরিয়ম নূরের ট্রেইলারের এডিট থেকে শুরু করে সিনেম্যাটোগ্রাফি, সাউন্ড ডিজাইন সবকিছুই আন্তর্জাতিক মানের লেগেছে। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের নিজস্বতার ছাপও স্পষ্ট। পুরো ট্রেইলারজুড়ে কালার গ্রেডিং চোখে লাগার মতো। নীলচে একটা আভা যেন পুরো সিনেমার টোনকে সেট করে দিয়েছে। সিনেম্যাটোগ্রাফার তুহিন তমিজুল মেলানকোলিক আবহে সিক্ত করেছেন যেন। বাঁধনের ডায়লগ ডেলিভারি পুরো ট্রেইলারজুড়েই দুর্দান্ত ছিল। বিশেষ করে ট্রেইলারের শেষের দিকে তাঁর চিৎকার করে তেড়ে যাওয়া আর মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে তাকিয়ে থাকা দেখে টের পাওয়া যায় অনবদ্য একটা কাজ দেখতে পাবে দর্শক। কানে দেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেশের দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হোক রেহানা মরিয়ম নূর, এটাই চাওয়া। কারণ, রেহানার গল্প আমাদের জানা দরকার। এই গল্পগুলো যে আমাদেরই।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা