যদি মূল বইটি কারো পড়া না থাকে, যদি থ্রিলার মুভির সদ্যসদ্য সদস্য হয়েছেন, এমন কেউ এই কাজটি দেখেন, তাহলে তাদের হয়তো ভালো লাগলেও লাগতে পারে। কিন্তু যারা মূলবই পড়েছেন, যারা থ্রিলার সিনেমার 'আদর্শলিপি' মুখস্থ করে ফেলেছেন, তাদের কাছে এ নির্মাণ খুব একটা ভালো লাগবে না...

পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সৃজিত মুখার্জী কে ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেই 'গরীবের ক্রিস্টোফার নোলান' বলে ডাকেন। ক্যারিয়ারের প্রথমদিকে দুর্দান্ত কিছু কাজ করায় তার বড়সড় এক ভক্তকুলও আছে। তিনি যখন কোনো একটি কন্টেন্ট বানান, সেটা নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হয়, আলোচনা-সমালোচনা-তর্ক-বিতর্ক হয়। মোদ্দা কথা, তার প্রতিটি কন্টেন্টই লাইমলাইটের নীচে খুব অনায়াসেই চলে আসে। সেই তিনি যখন ঘোষণা দিলেন, বাংলাদেশের জনপ্রিয় থ্রিলার লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের বেস্টসেলিং থ্রিলার 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' অবলম্বনে তিনি ওয়েব সিরিজ বানাবেন, স্ট্রিমিং সাইট 'হইচই'তে আসবে সে নির্মাণ, আমরা নড়েচড়ে বসলাম। ভালো কিছুর আশায় দিন গুনতে শুরু করলাম সবাই। 

সে প্রত্যাশা যে এমনভাবে ধূলিসাৎ হবে, তা ভাবিনি। যদি মূল বইটি কারো পড়া না থাকে, যদি থ্রিলার মুভির সদ্যসদ্য সদস্য হয়েছেন, এমন কেউ এই কাজটি দেখেন, তাহলে তাদের হয়তো ভালো লাগলেও লাগতে পারে। কিন্তু যারা মূলবই পড়েছেন, যারা থ্রিলার সিনেমার 'আদর্শলিপি' মুখস্থ করে ফেলেছেন, তাদের কাছে এ নির্মাণ খুব একটা ভালো লাগবে না৷ বরং মনে হবে, কোনো অসাধারণ গল্পের মর্মান্তিক এক অপমৃত্যু হয়েছে এখানে। কেন অপমৃত্যু মনে হবে, সেটাই বলি বরং।

প্রথম কথা, মূলবইয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই ওয়েব সিরিজে অনুপস্থিত। সুন্দরপুর গ্রামের রহস্যময়তা, সেখানের 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' খাবার হোটেলের অভিনবত্ব প্রকটভাবে অনুপস্থিত। মুশকান জুবেরি, নুরে ছফা, ইনভেস্টিগেটর কেএস খান, ইনফর্মার আতর ওরফে বিবিসি, গোরখোদক ফালু...এই চরিত্রগুলোর আলাদা আলাদা আর্ক, ডাইমেনশন ছিলো মূলবইয়ের গল্পে, যেটা ওয়েব সিরিজে পুরোপুরি মিসিং। ঠিক কোনো চরিত্রই যেন এখানে ঠিকঠাক খাপ খায় না। ওয়েব সিরিজের কোনো দৃশ্যই যেন 'কাট ফ্রম বুক' না এখানে। 

দ্বিতীয়ত, কাস্টিং। একজন নির্মাতা যখন জনপ্রিয় কোনো উপন্যাস থেকে একটি কন্টেন্ট বানাবেন, তার প্রথমেই সতর্ক থাকা উচিত, কুশীলব বাছাই নিয়ে। যদি এই ওয়েব সিরিজের কথা বলি, এখানের কোনো চরিত্রই মূলবই থেকে উঠে আসা চরিত্রের প্রতি জাস্টিস করে না। ইনফর্মার আতর আলী একটু বেশিই চালাক, গোরখোদক ফালু একটু বেশিই ভয়ানক, সিবিআই অফিসার নিরূপম চন্দ একটু বেশিই অবাঙ্গালী, এবং সবচেয়ে বড় হতাশা- মুশকান জুবেরি, তিনি একটু বেশিই কামুক। প্রোটাগনিস্ট এ চরিত্রটির প্রবল প্রভাবের ছিটেফোঁটাও এলোনা এই নির্মাণে। 'মুশকান জুবেরি' চরিত্রের রহস্যময়তা দেখাতে বাঁধনকে আলো-আঁধারে হাঁটাহাঁটি আর হুটহাট রবীন্দ্রসংগীতের সাথে ঠোঁট মেলানোতে সীমাবদ্ধ রাখলেন নির্মাতা। কোনো মানে হলো না! এরকম সবাই। সবাই-ই তথৈবচ।  অথচ এসব চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে দুঁদে সব অভিনেতা-নেত্রীকেই নেয়া হয়েছিলো। রাহুল বোস, আজমেরী হক বাঁধন, অনির্বাণ চ্যাটার্জী, অঞ্জন দত্ত...সবাই-ই টপ কাস্ট। তবুও পাজলের টুকরোগুলো মিললো না৷ বেখাপ্পা লাগলো।

চরিত্রগুলোর মেকআপও কেমন যেন অদ্ভুতুড়ে! 

তৃতীয়ত, পরিমিতিবোধের অভাব। এই নির্মাণের গ্রাম্য চরিত্রগুলোর ভাষা ঠিক গ্রামের মানুষদের মতন নয়। মনেই হচ্ছিলো, শহরের মানুষজন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে অশুদ্ধ আঞ্চলিক বাংলা বলার জন্যে। মোটেও শ্রুতিগ্রাহ্য লাগলো না। প্রচুর মেদযুক্ত সংলাপ শোনানো হলো। সিরিজের নয় পর্ব জুড়ে চরিত্রগুলোর অনর্থক ছুটোছুটি, অহেতুক অ্যাকশন দেখানো হলো। গল্পের ন্যারেশন স্টাইলের বিক্ষিপ্ত পদসঞ্চারে মনোযোগ টুটলো বারবার৷ খেলো ক্লাইম্যাক্স আর অসার সাসপেন্সে দর্শক আকর্ষণ পেলো না। গানগুলোকে অযথা ব্যবহার করা হলো। ভালো লাগলো না৷ 

হতাশ করলেন মুশকান জুবেরি! 

তবে এতসব অসন্তোষের ভীড়েও কিছু জিনিস আবার ভালো লেগেছে। সিনেমার কিছু অংশের বিজিএম খুব ভালো। মাঝের দুয়েকটি পর্বের এক্সিকিউশন ভালো। কিছু দৃশ্য চোখের শান্তি দিয়েছে। প্রচুর টাকাপয়সা খরচ করা হয়েছিলো এ ওয়েব সিরিজের পেছনে। সেট ডিজাইন তাই অনেকক্ষেত্রেই চমৎকার। 'সুন্দরপুর' গ্রামের ছমছমে আবহও কিছুক্ষেত্রে ভালোভাবে এসেছে পর্দায়। সবচেয়ে চমৎকার লেগেছে, এই ওয়েব সিরিজের রবীন্দ্রসংগীতগুলো। যদিও ভুল সময়ে, ভুল জায়গায় গানগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে, তবুও প্রত্যেকটা গান সুন্দর। এত আবেগ দিয়ে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিনি বহুদিন।।

কিছু দৃশ্যের সিনেম্যাটোগ্রাফী খুব সুন্দর! 

সবমিলিয়ে 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' বেশ হতাশ করেছে। হয়তো অন্য কোনো নির্মাতা এ কাজটি করলে এতটা হতাশা আসতো না, কাজটি 'জাতিস্মর' কিংবা 'চতুষ্কোণ' এর নির্মাতা করেছেন বলেই আক্ষেপ এত বেশি। প্রত্যাশা থাকবে, সামনের কোনো এক দুর্দান্ত নির্মাণ দিয়ে সৃজিত মূখার্জী তার নামের প্রতি আবার সুবিচার করবেন, এবারের আক্ষেপ ভুলিয়ে দেবেন। প্রপার থ্রিলার কীভাবে বানাতে হয়, তা তিনি জানেন। কিন্তু এবারেই হয়তো ঠিকঠাক ব্যাটে-বলে মিললো না। 

সামনের সময়ের জন্যে শুভকামনা রইলো। দেখা যাক কী হয়...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা