শেষে গিয়ে যখন খুব তাড়াহুড়ো করে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল কেন আগাচ্ছে সময়, থাকুক না থেমে। একদিন একদিন করে যাক, ওদের সাথে থেকে যাই, ওদের গল্প দেখি-শুনি। কিন্তু কিছুই থেমে থাকে না আদতে...

অবশেষে

এসে মেশে

অতীতেরা

স্মৃতি ঘেঁষে।

পরিবার, বন্ধু

সুখে-দুঃখে

যেচে আসে।

প্রতিবেশি বললে

কম হবে তাই বুঝি

পরিবারের চেয়ে বেশি

বুঝি তারা ভালোবাসে।

ডক সাং, সান উ,

তায়েকের মায়া বেশি,

আইগো কিম সাজায়

কুটিকুটি হই হেসে।

স্মৃতিগুলো রয়ে যায়

সময়টা একপেশে,

মনে পড়ে একদিন

একদিন বেলাশেষে!

Reply 1988 নিয়ে রিভিউ করতে বলেছিল এক বন্ধু। বলেছিল যে আমিই নাকি পারবো সবচেয়ে ভালো রিভিউ করতে। ওর কথা শুনে ভেবেছিলাম মারাত্মক একটা রিভিউ করবো। রিভিউতে উঠে আসবে অভিনয়, সিনেম্যাটোগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, কোথায় কী কমতি ছিল, কোন জায়গাটা ভালো লেগেছে এসব। কিন্তু পুরো সিরিজ শেষ করার পর ওসব কিছু এতো গৌণ হয়ে গেছে যে সেগুলো নিয়ে কিছুই লেখার নেই। বরং ওদের গল্পের সাথে আমার নিজের গল্প কিছুটা মেলানো যাক। এরকম মেলাতে সবারই পারার কথা। আমরা সবাই ই এরকম একটা সময় পার করে এসেছি। কেউ এসব অনুভূতি, এসব সম্পর্ক বেশি দেখেছি আর কেউ কম। কিন্তু সবাই দেখেছি এটা নিশ্চিত। কারণ, এই ড্রামার গল্পটাই এমন। এখানে পরিবার আছে, প্রতিবেশি আছে, বন্ধু আছে, এটুকুই। আমাদের কাছের মানুষদের সাথে চাইলেই মেলানো যাবে এই গল্পের চরিত্রগুলোকে।

ছোটবেলা আমার কেটেছে একটা কলোনিতে। কলোনির তখনকার পরিবেশটা অন্যরকম ছিল। পুরো এলাকার সবাই সবাইকে চিনতো। আমি সবার কোলে কোলেই বড় হয়েছি। ভাসা ভাসা যেটুকু স্মৃতি আছে সেটুকু অসম্ভব দুরন্ত। অথচ আমি খুবই গোটানো এখন, আমার পরিবারও। অথচ এখনো মনে আছে আম্মুর সাথে পাশার বাসার আন্টিদের কতো খাতির ছিল এবং এখনো আছে। শুধু পাশের বাসা না, ঐ বিল্ডিং-তার পাশের বিল্ডিং, সবার সাথে সবার অসম্ভব খাতির। সব বাসায় আমাদের ছিল অবাধ যাতায়াত। বিকেল হলেই কলোনির মাঠে খেলার ধুম। কারও বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে ডেকে এনে খাওয়ানো। ঈদের সময় বাচ্চাবাহিনী আমরা দলবেঁধে সালামি তুলতে যেতাম বাসায়-বাসায়। দু টাকার নোটের বান্ডিল হয়ে যেত। বিপদে-আপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো।

ধনী-গরিবের কনসেপ্টটাই তখন ছিল না বোধহয়। যাদের বাসায় টিভি আছে তাদের বাসায় দলবেঁধে যাওয়া, জন্মদিনে এদের নিয়েই সকল আয়োজন। আত্মীয়-স্বজন, রক্তের সম্পর্ক এগুলো আমি কমই দেখেছি; আমার দেখা হয়েছে এই পাড়া-প্রতিবেশির ভালোবাসাই বেশি। ভাড়া থাকার ফলে এক জায়গায় বেশিদিন থাকা হতো না। ৩-৪ বছর পরপর যখন অন্য কোথাও যাওয়া লাগতো তখন একেকজনের মুখে অন্ধকার নেমে আসতো। সেসব গলি, সেসব মাঠ, সেসব পলেস্তরা খসা বিল্ডিং এখনো আমাকে টানে। আমাকে টানে সেসময়কার মানুষগুলো। যাদের প্রায় সবাইকেই বাস্তবতার কাছে হারিয়ে ফেলেছি।

reply 1988 সেসব সম্পর্কের কথাই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। ৫ জন বন্ধুর গল্পের চেয়ে ৩ জন মায়ের বন্ধুত্ব এখানে কম গুরুত্ব পায় নি, বাবারা একসাথে বসে অফিসশেষে আড্ডায় মেতে ওঠে সেটাও বাদ যায় নি। একজনের বাসায় একপদ রান্না হলে বাকিদের বাসা থেকে আসে পঞ্চপদ। এক পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তার দেখাশোনা করে পাশের বাড়ির লোকেরা। সেসব পরিবারের গল্পগুলোও আমাদের পরিবারগুলোর মতোই। বাবারা অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে, রাস্তা থেকে উল্টাপাল্টা জিনিস কিনে এনে বকা খায় মায়ের কাছে। মায়েরা ব্যস্ত সারাদিন খাবারের যোগাড়যন্ত্র করতে। রাতে অবসর পেলে সব মায়েরা একসাথে বসে খুনসুটি আর গল্প। ছেলেমেয়েরা একসাথে দলবেঁধে স্কুলে যাওয়া শীতের সকালে, পড়াশোনা, গ্রেড নিয়ে চিন্তা সারাক্ষণ; মাঝে বয়সের দোষে প্রেম প্রেম ভাব এসে ওলট পালট করে দেয়া সবকিছু।

রিপ্লাই ১৯৮৮ এর চরিত্রগুলো

রিপ্লাই এসবকিছু এতো নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছে যে চমকে যেতে হয়। চমকে যেতে হয় যখন নিজেদের ফেলে আসা সময়কে দেখতে পাই এখানে। টিনেজ বয়সের সে প্রেম, ছোট ছেলে/মেয়ে হবার যন্ত্রণা, বড় ছেলে/মেয়ে হবার দায়িত্ব, বাবা-মায়ের আদর-শাসন, সবকিছুই যেন আমাদের গল্প। প্রতিটা পরিবারের সাথে এখানে দর্শকের ভালোবাসার সম্পর্ক হতে বাধ্য। মিরান-কিম পরিবারের কথাই ধরি, কিমের দুষ্টুমি-বাঁদরামি শুরুতে বিরক্ত লাগতো, ভাবতাম লোকটার সমস্যা আছে মনে হয়। কিন্তু সে ই কীনা পরে হয়ে ওঠে প্রিয়, তার মতো করে যেন জীবনটাকে সহজ করে ভাবতে পারি ঐ বয়সে গিয়ে সেটাই ভাবি।

মিরান ওদিকে স্ট্রং আয়রন লেডি, যেভাবে সংসার সামলায়, আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখে সেটা দেখে তার প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়। ওদিকে ডক সাঙের বাবা তো আমাদের বাবাদের মতোই। সারাদিন অফিস করে, নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, সামনে কিছু বলে না-পাহাড়সম কিন্তু আড়ালে গেলে ঠিকই আমাদের জন্য ভালোবাসা প্রকাশ করে। নিজেদের সন্তানকে সারাক্ষণ বকুনির ওপর রাখা ওদিকে আড়ালে তাদের নিয়ে গর্ব করা, তাদের অবুঝ কাজে-কর্মেও মুগ্ধ হওয়া। এরকম বাবাই তো আমরা পেয়েছি, এরকম বাবাই তো আমরা হতে চাই।

সান উর মায়ের কথা আর কী বলবো? একা এক হাতে নিজের সংসার সামলেছেন, নিজের দু সন্তানকে দারুণভাবে লালন-পালন করেছেন। কখনো অভিযোগ করেন নি, নিজের একাকীত্বকে নিজের মাঝেই দাফন দিয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গীর প্রয়োজন সবারই হয়। সবারই লাগে একটা কথা বলার মানুষ। তিনি নিজেকে বিলিয়ে দেন নি, সন্তানরাও বুঝেছে এটাও দারুণ ব্যাপার। আমরা কজনই বা এমন করে বুঝতে শিখি। কজনই বা দেখে বুঝি বাবা-মায়ের কষ্ট।

রিপ্লাই ৫ বন্ধুর গল্প। তাদের একসাথে বেড়ে ওঠা, একসাথে গল্পে মাতা, একে অন্যের সুখের সাক্ষী হওয়া, দুঃখের অবলম্বন হওয়ার গল্প। তারপর এদের মাঝেই প্রেম আসে। বয়সের দোষে দুষ্টু হয় যেমন তেমনি ম্যাচুরিটি আসলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হয় না তারা। কিন্তু বন্ধুত্ব তাদের অটুট থাকে। তায়েকের বেডরুমে তাদের আড্ডার আসর বসতো। নতুন হলিউড সিনেমার ক্যাসেট এনে দেখতো সবাই। কেউ রামেন বানিয়ে নিয়ে আসতো, কেউ গানের সময় নেচে উঠতো টিভির সামনে গিয়ে, তারপর হুট করেই একটা শব্দ আর গন্ধে সবার বমি চলে আসা, তারপর ধুন্ধুমার মার গন্ধ উদ্রেককারী বন্ধুকে। একদিকে মার খাচ্ছে কেউ, অন্যদিকে হাসছে হিহি করে। তাদের হাসিতে মনে হতো পুরো গলিটা যেন আলোকিত হয়ে আছে। অলিম্পিকের সময় টিভিতে সবার চোখ আটকে থাকা।

কোরিয়ার সংস্কৃতি, সেসময়কার বিভিন্ন ট্রেন্ড, গান, স্নোফল, ক্রিসমাস উদযাপন সবই উঠে এসেছে সে সময়ের গল্প বলতে গিয়ে। আমরাও মেলাতে পারি যেন সেসব দেখে। ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময় টিভিতে চোখ আটকে থাকা, ওয়াকম্যান-এফ এম রেডিও কানে গুঁজে হুট করে ক্লাসে স্টাইলিশ হয়ে যাওয়া, পছন্দের রেডিও শোতে এসএমএস করে রিকুয়েস্ট করা, পছন্দের গান বেজে ওঠা, বৃষ্টির প্রথমদিনে হুট করে ভালোলাগা জেগে ওঠা, চিঠি লিখে ভালোবাসার কথা জানানো, ডায়েরিতে সবকিছু টুকে রাখা-আমাদেরই গল্প মূলত reply 1988।

এই ড্রামা শুধু ৮৮তেই থেমে থাকে নি। এগিয়ে ২০১৬ পর্যন্তও এসেছে। এই সময়ের মাঝে সবার বড় হয়ে ওঠা, যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে ওঠা সবকিছুই আনা হয়েছে পরম যত্নে। শেষে গিয়ে যখন খুব তাড়াহুড়ো করে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল কেন আগাচ্ছে সময়, থাকুক না থেমে। একদিন একদিন করে যাক, ওদের সাথে থেকে যাই, ওদের গল্প দেখি-শুনি। কিন্তু কিছুই থেমে থাকে না আদতে। ছেলেমেয়ে বড় হয়, দায়িত্ব নেয় পরিবারের, পছন্দের মানুষকে পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, বাবা-মা তাদের সর্বস্ব দিয়ে লালন-পালন করা সন্তানকে বিয়ে করে পর হতে দেখে চোখের সামনে, কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবা-মা-ভাই-বোন, তারপর নতুন জীবন, নতুন বাস্তবতা, নতুন একটা গল্প।

আমরা এখন যারা যে বয়সেই আছি আমাদের অতীতের সবারই কোন না কোন গল্প আছে, বর্তমানেও তৈরি করছি আমরা গল্প। যে গল্পগুলো, যে সময়গুলো আমরা পরে গিয়ে খুঁজি। এর মাঝে মানুষ হারিয়ে যায়, গল্পের ডায়েরিতে অনেক পাতা ছেঁড়া পড়ে, তবুও একটা সময় গিয়ে হুট করে একদিন মনে হয় সে সময়ে ফিরে যেতে পারলে মন্দ হতো না। একদিন সকালে উঠে দেখলাম নাহয় ফিরে গিয়েছি পুরনো সে গলিতে, পাশের বাড়ির আঙ্কেল গলি পরিষ্কার করছে, বন্ধুরা খেলার জন্য ডাকছে, ওদিকে পেপারে ঢাকা বাবার মুখ আর মায়ের ডাক খাবারের জন্য। ‘যা এই বাটিটা দিয়ে আয় পাশের বাসায়’- বিরক্ত হয়ে বাটি হাতে দৌড়াদৌড়ি শুরু। একবার যদি ফিরে যাওয়া যেত ১৯৮৮ কিংবা ২০০৬ এ...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা