ঋতুপর্ণ ঘোষ পুরুষ না মহিলা? দীর্ঘদিন কলকাতার সিনেজগতে বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে ছিল এই বাক্যটা। ঋতুপর্ণ পুরুষ না মহিলা, সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, ছিলোও না। ঋতুপর্ণ একজন পরিপূর্ণ মানুষ, মেধাবী এক নির্মাতা, স্রোতের প্রতিকূলে চলা সাহসী এক যোদ্ধা।

শূন্য দশকের শুরুর দিকের কথা। ঐশ্বরিয়া রাই তখন ভীষণ ব্যস্ত নায়িকা। একের পর এক হিট দিচ্ছেন, ঠাসা শিডিউল, বেড়াতে যাওয়ার ফুরসৎটাও পাচ্ছেন না। এরইমধ্যে একটা ফোন এলো, বাঙালী এক পরিচালক কথা বলতে চান তার সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের গল্প থেকে সিনেমা বানানো হবে। বাংলা ভাষায়, কলকাতায় হবে শুটিং। সামনে-পেছনে কিচ্ছু চিন্তা না করেই ঐশ্বরিয়া 'হ্যাঁ' বলে দিলেন। জনশ্রুতি আছে, 'চোখের বালি' নামের সেই সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে অ্যাশ নাকি একটি পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি। জনপ্রিয়তার চূড়ায় দাঁড়িয়েও শুটিংয়ের সেটে পরিচালকের কথামতো উঠেছেন, বসেছেন, শিডিউল মেন্টেইন করেছিলেন পুরোপুরি। প্রযোজক তাকে বিমানের টিকেটের টাকাটা অন্তত নিতে অনুরোধ করেছিলেন খুব, ঐশ্বরিয়া ভদ্রভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

দেড় যুগ পরে আজ যখন ঐশ্বরিয়ার ফিল্মোগ্রাফি ঘাঁটতে যায় কেউ, তখন অবাক হয়েই তারা আবিস্কার করে, ঋতুপর্ণ ঘোষ নামের এক বাংলাভাষী পরিচালকের দুটো সিনেমাতে কাজ করেছিলেন সাবেক এই বিশ্বসুন্দরী! দুটো সিনেমাই ভীষণ আন্ডাররেটেড, কিন্ত সিনেমা জিনিসটা যারা বোঝেন, তাদের কাছে 'চোখের বালি' কিংবা 'রেইনকোট'- দুটোই মাস্টারপিস! অ্যাশের ক্যারিয়ারের সেরা দুটো কাজও কি নয়? 

ঋতুপর্ণ ঘোষ

ঋতুপর্ণ ঘোষ পুরুষ না মহিলা? দীর্ঘদিন কলকাতার সিনেমা জগতে বিশাল একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে ছিল এই বাক্যটা। ঋতুপর্ণ পুরুষ না মহিলা, সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, ছিলোও না। ঋতুপর্ণ একজন পরিপূর্ণ মানুষ, মেধাবী এক নির্মাতা, স্রোতের প্রতিকূলে চলা সাহসী এক যোদ্ধা। দারুণ, দুর্দান্ত, ক্ল্যাসিক সিনেমা অনেকেই বানিয়েছে, ভবিষ্যতেও বানাবে। ঋতুপর্ণ সিনেমা বানানোর পাশাপাশি প্রাচীর ভেঙেছেন। বাঙালীর ড্রয়িংরুমে ঢুকে তিনি আটপৌরে ভঙ্গিমায় এমন সব গল্প বলেছেন, যেগুলোর নাম শুনলেও তখন লোকে নাক সিঁটকে সরে পড়তে চাইতো। 

বাঙালি মোটাদাগে সিনেমা বলতে বুঝতো বেদের মেয়ে জোৎস্নাকে, বিনোদন যেখানে সব। একটু উঁচুদরের দর্শক যারা, তাদের কাছে সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালরা আবার পূজনীয়। তারা জীবনের গল্প বলেছেন ভদ্রস্থ ভঙ্গিমায়, তাতে বাঙালি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ঋতুপর্ণ এলেন, নিজস্ব একটা সিগনেচার তৈরী করলেন। বাঙালির তো আবার নতুনত্বে অ্যালার্জি, তারা বরাবরের মতোই ছি ছি করে উঠলো। ঋতুপর্ণ তার সিনেমায় গল্পের প্রয়োজনে যৌনতাকে এনেছেন। এনেছেন ট্রান্সজেন্ডার রিলেশনশীপকেও, বাঙালির কাছে যেটা 'ঘোরতর পাপ!' বাঙালি মুখে হাতচাপা দিয়ে আঙুলের ফাঁক গলে তাকিয়ে সেসব দেখেছে, তারপর মন খুলে খিস্তি দিয়েছে। মেতে উঠেছে ব্যক্তি আক্রমণে। 

তাতে অবশ্য ঋতুপর্ণ ঘোষকে দমানো যায়নি। ছেলেবেলাটা যার সিনেমার সঙ্গে কেটেছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটা বছর যিনি সিনেমা খেয়েছেন, সিনেমা পরেছেন, সিনেমাকে গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়েছেন- তাকে নিজের স্টাইলে গল্প বলা থেকে রুখে দেবে, এমন সাধ্যি কার? হ্যাঁ, সেন্সরবোর্ডের কারণে একটা প্যারামিটার তো মেনে চলতেই হয়েছে। কে জানে, আজকের মতো ওপেন ওয়েব প্ল্যাটফর্ম পেলে ঋতুর সাহসের অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সবটার দেখা হয়তো মিলতে পারতো! ঋতু জানতেন, বাঙালি তাকে ঘৃণা করতে পারে, অবজ্ঞা করতে পারে, কিন্ত উপেক্ষা করতে পারবে না। পরিচিতজনদের গর্ব করে বলতেনও- 'এই শহর না আমায় নিতে পারবে, না ফেলতে পারবে!'

ঋতুপর্ণ ঘোষ

উনিশে এপ্রিল, দহন, বাড়িওয়ালি, চোখের বালি, রেইনকোট, অন্তরমহল, দোসর, সব চরিত্র কাল্পনিক, আবহমান, আরেকটি প্রেমের গল্প, নৌকাডুবি, চিত্রাঙ্গদা, সানগ্লাস, মেমোরিজ ইন মার্চ- প্রতিটা সিনেমায় তিনি নিজের সিগনেচারটা ধরে রেখে আলাদা আলাদা আঙ্গিকে গল্প বুনেছেন। মানবিক সম্পর্কের মায়াজাল অনন্য হয়ে ধরা দিয়েছে তার সিনেমায়। তিনি নারীত্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকেও নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, অথচ তার একটা সিনেমাও কিন্ত নারীবাদের কথা বলেনি, বরং মানববাদের চর্চা হয়েছে সেখানে। 

রবীন্দ্রনাথের গল্পকে তিনি নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে উপস্থাপন করেছেন দর্শকের সামনে, বাংলা বলতে না পারা এক অভিনেত্রীকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে! প্রসেনজিত তখন পশ্চিমবঙ্গের সিনেমা হল বাঁচানোর জন্যে যা তা সিনেমা করে বেড়াচ্ছেন, পর্দার হিরো বা মঞ্চে দাঁড়ানো সুপারস্টার থেকে তাকে 'অভিনেতা' বানিয়ে ছেড়েছিলেন এই ঋতুপর্ণই। যীশু সেনগুপ্তের ভেতর প্রতিভার লুকিয়ে থাকা আগুনটা চোখে পড়েছিল তার। সেই প্রসেনজিত তারপর বাইশে শ্রাবণ, মনের মানুষ বা জাতিস্মর করেছেন, যীশু সেনগুপ্ত মুম্বাইয়ে নিয়মিত হয়েছেন, দক্ষিণী সিনেমায় বড়সড় রোলে কাজ করছেন- সেসবের ভিত্তিপ্রস্তর তো স্থাপন করে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণই! 

গল্পনির্ভর সিনেমা নিয়ে তিনি একা লড়েছেন, একদম একা। পাশে কেউ ছিল না, আর কোন পরিচালক না। ভেঙ্কটেশ ফিল্মজ ছাড়া ভালো কোন প্রযোজকের সাহায্যও মেলেনি। হাজার‍টা সীমাবদ্ধতা ছিল, ছিল ব্যক্তি আক্রমণের বিশাল পসরা। সেসবকে একপাশে সরিয়ে রেখে ঋতুপর্ণ ভালো সিনেমার জন্যে জায়গা তৈরী করেছেন টালিগঞ্জে, একটু একটু করে। তৈরী করেছেন দর্শক, সত্যজিত-মৃণাল-ঋত্বিক বা তপন সিনহা-অজয় করদের যুগ শেষে যারা হলবিমুখ হয়ে পড়েছিলেন। হাজারো গালমন্দ সয়ে তিনি শিক্ষিত মধ্যবিত্তকে সিনেমা হলের রাস্তাটা চিনিয়েছেন আবার। আজ মাল্টিপ্লেক্সে সৃজিত, শিবু-নন্দিতা, কৌশিক গাঙ্গুলিদের জয়জয়কার, এই প্ল্যাটফর্মটা তৈরী হতো না, বা হলেও আরও বছর কুড়ি পরে হতো, যদি না ঋতুপর্ণ সেই অস্থির সময়টায় প্রাচীর ভাঙার কাজটা না করতেন। 

মেমোরিজ ইন মার্চ সিনেমায় ঋতুপর্ণ ঘোষ

প্রকৃতি বড় অদ্ভুত। একটা কাছিমের আয়ু হয় দেড়শো বছর, একটা নিকৃষ্ট যুদ্ধাপরাধী বেঁচে থাকে ৯৩ বছর, পতিত স্বৈরাচারীও ৮৪ বছরের আয়ুকাল পেয়ে যায়। অথচ সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল মানুষগুলো হারায় অকালে। নইলে বারোটা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতা পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ কেন ঊনপঞ্চাশে মারা যাবেন ঘুমের মধ্যে? তার কাজটা তো শেষ হয়নি, কত গল্প বলার ছিল, অনির্বাণ বা ঋদ্ধির মতো দুর্দান্ত অভিনেতারা উঠে আসছে, তাদের ক্যারিয়ারে 'ঋতুদার সাথে কাজ করা হলো না' টাইপের আক্ষেপের সাইনবোর্ডটা ঝুলে থাকবে চিরকাল- এটা কি মেনে নেয়া যায়? 

শ্রীকান্ত আচার্য্যের গাওয়া সেই গানটা- 'মেঘপিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা, মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা...' অদ্ভুত মায়া জাগানো, বিষণ্ণতা উপহার দেয়া এই লাইনগুলোও ঋতুপর্ণই লিখেছিলেন। শিল্প-সাহিতের জঞ্জালে ঋতুপর্ণ ঘোষ একটা যুগের নাম, একটা বিশাল বড় অধ্যায়ের নাম, দিস্তাভর্তি মন খারাপ উপহার দিয়ে যে অধ্যায়টার দৈহিক সমাপ্তি ঘটেছিল ঠিক সাত বছর আগে...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা