সিনেমায় কখন কোন অনুষঙ্গ যুক্ত করলে দর্শক আটকে যাবে মায়াজালে, তা বি-টাউনে রোহিত শেঠির চেয়ে আর কেউ ভালো জানেন বলে মনে হয় না। ঠাসা সব বিস্ফোরক এনে তিনি যেসব কমার্শিয়াল পটবয়লার বানান, তাতে সিনেমাহলে হুল্লোড় ওঠে, শীষ বাজে, অ্যাড্রেনালিন রাশ হয়...

'গল্পের গরু গাছে ওঠা' বলে এক বাগধারা আছে বাংলায়। রোহিত শেঠির সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে এই বাগধারাটি আরেক কাঠি সরেস। এখানে শুধু গল্পের গরুই গাছে ওঠে না। বরং গল্পের গাড়িও দেদারসে ওড়ে আকাশে। রোহিত শেঠির সিনেমা হবে আর সেখানে আকাশে গাড়ি উড়বে না, মাটিতে হুলস্থুল মারামারি হবে না, পাওয়ারপ্যাক বানিজ্যিক মালমশলার ছড়াছড়ি হবে না, তা তো হতে পারে না। দর্শকের পালস বুঝে একটা কমার্শিয়াল সিনেমায় কখন কোন অনুষঙ্গ যুক্ত করতে হবে, তা বি-টাউনে রোহিত শেঠির চেয়ে আর কেউ ভালো জানেন বলে মনে হয় না। ঠাসা সব বিস্ফোরক যুক্ত করে তিনি যেসব কমার্শিয়াল পটবয়লার বানান, তাতে সিনেমাহলে হুল্লোড় ওঠে, সিটি বাজে, অ্যাড্রেনালিন রাশ হয়। মানুষ অল্পসময়ের জন্যে হলেও ভুলে যায় যাপিত ক্ষোভ-আক্ষেপ-বঞ্চনা। 

রোহিত শেঠির সাম্প্রতিক 'সূর্যবংশী'তেও কমার্শিয়াল অ্যাসথেটিজম এর প্রমান মিললো আবার। বহুদিন পর খুলেছে প্রেক্ষাগৃহগুলো, মানুষজন মহামারীর পরে এখনো ঠিক ধাতস্থ হয়নি, এরকম এক সময়ে দারুণ এক কিক দরকার ছিলো সবারই। কিক দেয়ার সে কাজটিই করলেন রোহিত শেঠি। নিয়ে এলেন সিম্বা, সিংঘাম এবং সূর্যবংশীকে। নিজের বানানো কপ ইউনিভার্সের ত্রিমূর্তিকে নিয়ে যে অ্যাকশন-প্যাকড মুভি বানালেন, স্রেফ অনবদ্য। এই সিনেমা দেখার জন্যে সিনেমাহলগুলোর সামনে যে ভীড়, যে মাতামাতি, তা দেখে কে বলবে, এই দেশেই মহামারীর প্রবল সন্ত্রাসে সিনেমাহলগুলো বন্ধ ছিলো গত দেড় বছর? 

কপ ইউনিভার্স বানিয়ে তিনি দেখিয়েছেন চমক! 

গোলমালই বলি কিংবা দিলওয়ালে অথবা চেন্নাই এক্সপেস... রোহিত শেঠির সিনেমায় গল্প খুঁজতে বোধ করি কেউই যায় না৷ গল্প তথৈবচ কিন্তু সে গল্প যে ঝলমলে রাংতায় মুড়িয়ে পরিবেশন করছেন রোহিত শেঠি, চমক থাকে সেখানে। দারুণ অ্যাকশন সিকোয়েন্স, কমেডি রিলিফ, সিনেম্যাটোগ্রাফী, মিউজিকের যথাযথ ব্যবহার এবং অতি অবশ্যই স্ক্রিনপ্লে'র বিন্যাস...সব মিলিয়ে-মিশিয়ে বিষয়টা এমন হয়, মানুষ বুঝতে পারছে গল্প ঠিক জুতের না, তবুও হাততালি থামানো যায় না৷ এখানেই রোহিত শেঠির ইন্দ্রজাল। মাস-সেন্ট্রিক রিসার্চ করে কাহিনীর বিন্যাসে তিনি সে কারণেই একমেবাদ্বিতীয়ম। 

কমার্শিয়াল ফিল্মের সাত-সতেরো তার নখদর্পনে!  

যদিও যখন বলিউডে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, তখন হয়তো নিজেও ভাবেননি, কমার্শিয়াল সিনেমার তিনিই হবেন প্রোটাগনিস্ট ডিরেক্টর। সে সময়টা বড্ড কষ্টেরও ছিলো। শুরুর সময়টাতে তার প্রতিদিনের ইনকাম ছিলো পঁয়ত্রিশ রূপি। প্রতিদিনই টানা দুই ঘন্টা প্রখর রোদে হেঁটে তাকে পৌঁছোতে হতো সিনেমার সেটে। অনেক সময় এমনও হতো, রোজগারের সেই পঁয়ত্রিশ রূপি দিয়ে তাকে বেছে নিতে হতো দুটি অপশনের মধ্যে একটি; খাবার অথবা যাওয়ার খরচ। যেদিন বাসে, ট্যাক্সিতে ফিরতেন বাড়িতে, সেদিন খাওয়ার খরচ থাকতো না হাতে। আবার যেদিন পঁয়ত্রিশ রূপি খরচ করে খেতেন, সেদিন দুই ঘন্টা হেঁটে ফিরতে হতো বাড়িতে। নিজেদের বাড়িও ছিলো না। থাকতেন দিদিমার বাড়িতে। সেখান থেকে কর্মস্থলে পৌঁছোতে প্রতিদিনই এরকম অমানুষিক পরিশ্রম করতে হতো তাকে। 

সেখানের সেই সময় থেকে রোহিত শেঠি আজকের এই অবস্থানে... ভাবলে একটু দিশেহারা হতেই হয়। তার সিনেমার ঘোষণা এলেই চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়, এ সিনেমা সুপারহিট হবে। কারণ তিনি জানেন, সিনেমাকে কিভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, মগজে বিদ্ধ করা যায়। শুরুর সেই সংগ্রামের সময়টাতে প্রতিদিন হেঁটে হেঁটে যখন তিনি আন্ধেরি থেকে মালাদ পৌঁছোতেন, গভীর আগ্রহে দেখতেন আশেপাশের তৃণমূল মানুষদের। তাদের সুখ-দুঃখ-বিষাদ খুব কাছ থেকে দেখেছেন বলেই হয়তো তিনি জানেন, কিভাবে তাদের খুশি করা যায়, সাময়িক সময়ের জন্যে হলেও তাদের যাপিত কষ্ট ভুলিয়ে দেয়া যায়। সেজন্যেই তার সিনেমা৷ যে সিনেমা দিনশেষে খুশি করে সবাইকে। প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে নিয়ে আসে 'সব পেয়েছির দেশে'র উচ্ছ্বাস। এবং ঠিক এ কারণেই রোহিত শেঠি বরাবরই অনবদ্য। দুর্দান্ত। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা