রিভেঞ্জ-সাসপেন্স-থ্রিলার নিয়ে এত এত সিনেমা আশেপাশে, এই জনরায় তাই নতুন কিছু বলা বেশ কঠিন। সেদিক ভেবেই হয়তো 'রোরশাক' এমন এক দিকে গল্পকে ফোকাস করে, যে দিক কেউ ভাববেই না। গড়পড়তা চিন্তার চেয়ে এককাঠি সরেস, মনস্তাত্বিক গ্রে ম্যাটারে চাপ দিয়ে এই গল্প এমন এক রিয়েলিটিকে এক্সপোজ করে, যে রিয়েলিটি উদ্ভট, অ্যাবসার্ড এবং চুড়ান্ত উপভোগ্য...

'রোরশাক ইংকব্লট টেস্ট' বেশ অদ্ভুত এক সাইকোলজিক্যাল পরীক্ষা। বিষদভাবে বললে, এই পরীক্ষা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিক আইডেন্টিফাই করার পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় একজন মানুষকে কালির বিক্ষিপ্ত দাগের মাধ্যমে আঁকা দশটি ছবি দেখানো হয়। ঐ ছবিগুলোর সাথে ব্যক্তিটি বাস্তব জীবনের কোন বিষয়ের সাথে মিল পাচ্ছেন, সেটার মাধ্যমেই মূলত ঐ ব্যক্তির মানসিকতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, সাব-কনশাস মাইন্ডের টানাপোড়েন ধরার চেষ্টা করা হয়। মনোবিজ্ঞানী হারম্যান রোরশ্যাকের এই অভিনব পরীক্ষা, যে পরীক্ষা তার নামানুসারে হয়ে গেলো 'রোরশাক ইংকব্লট টেস্ট', এই টেস্ট নিয়ে যে বিতর্ক নেই, তা না। তবে, এও ঠিক, বিশেষ এই টেস্টকে এখনও বেশ কিছু জায়গায় ব্যবহার করা হয় মানুষের মানসিক অবস্থা নির্ধারণের জন্যে। এবং অন্যরকম এই টেস্টের নামকেই যখন মালায়ালাম এক সিনেমার টাইটেল হিসেবে দেখি, চমকাতে বাধ্য হই। যে চমক গল্প শেষেও থাকে বজায়। 

গল্পের প্রথম দৃশ্যে, ঝড়জলের সন্ধ্যায়, হেঁটে হেঁটে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছান এক মানুষ। যার নাম লুক অ্যান্টনি। যিনি এ সিনেমার প্রোটাগনিস্ট। যার কাঁধেই এ সিনেমাকে টেনে নেয়ার অনেকটুকু ভার। তিনি পুলিশ স্টেশনে আসেন। দিশেহারা অবয়বে পুলিশকে জানান- তার স্ত্রী নিখোঁজ। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। পুলিশ তড়িঘড়ি অনুসন্ধানে নামে৷ আশেপাশের জঙ্গলে বিস্তর খোঁজাখুঁজির পরে তারা একসময়ে এই সিদ্ধান্তে আসে- লুকের স্ত্রী'কে হয়তো কোনো বন্যজন্তুতে খেয়ে নিয়েছে। তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ফলাফল- খোঁজাখুঁজি বন্ধ। যদিও তাতে লুক অ্যান্টনি হাল ছাড়েনা। সে গোঁ ধরে, এই জঙ্গল থেকে সে বেরোবে না। যতদিন না তার স্ত্রীকে সে খুঁজে পাচ্ছে, এখানেই সে বসবাস করবে। 

শুরু হয় অ্যান্টনির বনবাসে বসবাস। ক্রমশ তার সাথে পরিচয় হয় আরো কিছু মানুষের। লুক অ্যান্টনি এখানে ঘর কেনেন, ফ্যাক্টরি কেনেন, বিয়েও করেন। খুব অল্পদিনের মধ্যে রীতিমতো জমিয়ে বসেন। তবে, এসব ঘটনার ডামাডোলেও তিনি মনে রাখেন- তার স্ত্রী নিখোঁজ। তার স্ত্রী'কে খুঁজে পাওয়ার জন্যেই তার এ পাণ্ডববর্জিত গ্রামে আসা। এবং এভাবেই নানাবিধ কাহিনী-পরম্পরায় গল্প এগোয় প্রথমার্ধে। যে গল্প  দ্বিতীয়ার্ধে গিয়েই নেয় অদ্ভুতুড়ে, অপ্রত্যাশিত এক মোড়। যা আঁচ করার অসাধ্য, এরকমই এক ঘটনাপ্রবাহে যুক্ত হন লুক অ্যান্টনি এবং আশেপাশের বিভিন্ন মানুষ। গল্প এগোয় ভিন্ন খাতে। 'রোরশাক' নামের সার্থকতাও খুঁজে পাওয়া যায় তখন। 

Revenege is a dish that tastes best when served Cold

'গডফাদার' সিনেমা থেকে নেয়া এ উক্তিই হতে পারতো এ সিনেমায় ট্যাগ লাইন। এখানেই চাইলে হতে পারতো ঠাণ্ডা কোনো প্রতিশোধের মঞ্চায়ন। কিন্তু তা না হয়ে এই রিভেঞ্জ ড্রামা আচমকাই যে কুইর্কি পথে এগোলো, সেটা ভাবনারও অতীত। এবং এটা হওয়ারও ছিলো। কারণ,  রিভেঞ্জ-সাসপেন্স-থ্রিলার নিয়ে এত এত সিনেমা আশেপাশে, এই জনরায় তাই নতুন কিছু বলা বেশ কঠিন। সেদিক ভেবেই হয়তো 'রোরশাক' এমন এক দিকে গল্পকে ফোকাস করলো, যে দিক কেউ ভাববেই না। গড়পড়তা চিন্তার চেয়ে এককাঠি সরেস, মনস্তাত্বিক গ্রে ম্যাটারে চাপ দিয়ে এ গল্প এমন এক রিয়েলিটিকে এক্সপোজ করলো, যে রিয়েলিটি এক অর্থে খুব অ্যাবসার্ড। আবার, আরেক অর্থে- অবসেশনের চূড়ান্ত। যে রিয়েলটির গল্প খুব যে রুদ্ধশ্বাস গতিতে এগোয়, তাও না। গল্পের গতি কমে, বাড়ে, টুইস্ট করে। খেলিয়ে খেলিয়েই দর্শককে কমপ্লেক্স এ গল্পের সাথে যুক্ত করেন নির্মাতা। 

'রোরশাক' মুগ্ধ করেছে গল্পবয়ানের অভিনবত্বে

এবং এরকম এক সিনেমা, যে সিনেমার কাঠামো খুব অ্যাবস্ট্রাক্ট এক গল্পের উপর দাঁড়ানো, সে সিনেমার প্রোটাগনিস্টের উপরে দায়টাও থাকে বেশি। যে দায় লিজেন্ড ম্যামোথি বেশ ভালোভাবেই মেটান। এমন এক চরিত্রের তিনি প্রতিনিধি, যিনি অতীত এবং বর্তমানের মাঝামাঝি নো ম্যান'স ল্যান্ডে বসবাস করেন। কখনো কপট, কখনো এলোমেলো, কখনো অসহায়, কখনো হিংস্র... একটা চরিত্রের এতগুলো লেয়ার, এত সীমারেখা থাকা সত্বেও ম্যামোথি একচুল এদিক-সেদিক হন না। গল্পের চড়াই-উতরাই এর সাথে তার চরিত্রও ক্রমশ পালটায়, পালটায় বিলিভিবিলিটির লেয়ারও। গণ্ডি বুঝে যেভাবে তার অভিনয়, তা চক্ষু চড়কগাছও করে! ম্যামোথি'র পাশাপাশি বাকিরাও দুর্দান্ত। বিশেষ করে 'সীতা' চরিত্রে বিন্দু পানিকার এর কথা বলতে হয়। এই ক্যারেক্টারটা যেভাবে এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটে সুইচ করে... সিনেমার অন্যতম মনে রাখার দিক হয়ে থাকে সেটাও। গ্রেজ অ্যান্টনি, শরফুদ্দিন, জগদীশ সহ বাকিরাও যার যার জায়গা বুঝে যথাযথ। কারো অভিনয়ে তাই আক্ষেপের জায়গা থাকেনা একবিন্দুও। 

'মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রি'র এই বিষয়টা বরাবরই অন্যরকম। সেটি হচ্ছে- সময়ের কথা না ভেবে অন্যরকম গল্প বলার ভাবনা। এখন যে সময় চলছে,তাতে রগরগে থ্রিলার কিংবা ইমোশনাল কোনো জার্নি নিয়ে সিনেমা বানালেই নিশ্চিন্ত থাকা যায়। আর, এই দুই জনরাতেই 'মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রি' যে বেশ সিদ্ধহস্ত, তাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু, কমফোর্ট জোনের উষ্ণ চৌহদ্দিতে না থেকে নিজাম বশির 'রোরশাক' সিনেমায় এমন কিছু বিষয় নিয়ে ডিল করেন, সেগুলো যে দর্শককে প্রভাবিত করবে, এমনটা হলফ করে বলা যায় না। অনেকটুকু ঝুঁকি নিয়ে এ গল্পের বিল্ডাপ যেভাবে হয়, সেই সাহসের প্রশংসা তাই একটু উচ্চকন্ঠ হয়েই করাটা সমীচীন। 

বেশ রিস্কি এক গল্প, যে গল্পে ক্রমশ জনরা শিফটিং হচ্ছে, সে গল্প ব্যবসাসফল হবে কি না, তা নিয়ে না ভেবে গল্প বলার এই যে প্রয়াস... মলিউড মুগ্ধ ও বিস্মিত করে ঠিক এখানটাতেই। প্রযুক্তির ঝা-চকচকে প্রগতিতে মালায়ালাম সিনেমার ঠাটবাট যে বেড়েছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। যে বিষয়টা খানিকটা আশঙ্কিতও করে। সময়ের ফেরে মলিউডও মূলস্রোতে গা ভাসানো গড়পড়তা ইন্ডাস্ট্রি হবে কি না, সে নিয়েও ভয় হয়। কিন্তু, এই ইন্ডাস্ট্রিই যখন আবার এরকম কিছু মগজ-নাড়ানো গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়, তখন স্বস্তি জাগে। এই ভেবে তৃপ্তি  হয়- তাদের ভালো গল্পের কোষাগারের জৌলুশ এখনো অমলিন। অক্ষয়। সেজন্যেই থাকে চাওয়া- যারা মাটির কাছাকাছি থেকে উঠে এসে আজকের এ অবস্থানে, তাদের পা বরাবরই মাটিতেই থাকুক। পা মাটিতে রেখেই তারা বলুক- নক্ষত্র-স্পর্শের গল্প! করুক বিস্মিত। তৃপ্তও। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা