সাহানার পাল্টা মন্তব্যের পরে জনৈক অর্বাচীনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাহানা বাজপেয়ী আমাদের শেখালেন, এই ব্যাকটেরিয়ার দলকে প্রশ্রয় দিলেই এরা মাথায় চড়ে বসবে, তারচেয়ে বরং ভদ্রভাবে প্রতিবাদ হোক, তাহলেই এরা লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হবে বারবার...

সালমান মুক্তাদিরকে আমার বেশ ভালো লাগে। না, তার ইউটিউব কন্টেন্ট বা নাটকে তার ন্যাকা ন্যাকা অভিনয়ের জন্য তাকে ভালো লাগে না, সেখানে সমালোচনার অনেক জায়গা আছে। সালমানকে ভালো লাগে তার ড্যামকেয়ার অ্যাটিট্যুডের জন্য। কেউ তার সঙ্গে মাত্রা ছাড়ানো অসভ্যতা করলে, গালিগালাজ করলে, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বাজে কথা বললে সালমান যেভাবে সেটার জবাব দেন- সেই সাহসটাকে আমার ভালো লাগে। 'সেলিব্রেটি হলে এতসবে কান দিতে হয় না' টাইপের স্টেরিওটিপিক্যাল বাণীটাকে ছুঁড়ে ফেলে তিনি যে অভব্য আচরণকারীকে সমুচিত জবাব দেন- সালমান মুক্তাদিরের সেই দুর্বিনীত স্পর্ধাটাকে আমার স্যালুট দিতে ইচ্ছে করে। 

আমাদের মতো হতাশা এবং ঘৃণায় পরিপূর্ণ আর কোন জাতি গোটা দুনিয়ার বুকে আর কেউ আছে কীনা সন্দেহ। একইসঙ্গে ওই আমাদের মধ্যে সিংহভাগই অকর্মণ্য এবং বেকার। সেই বেকার সময়ের বেশিরভাগটাই আমরা ব্যয় করি সেলিব্রেটিদের জীবন নিয়ে অনুসন্ধানে, আমাদের ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি আর ক্ষোভ ঢেলে দিতে চাই তাদের ওপর। সেলিব্রেটিদের ফেসবুক পোস্টের কমেন্টবক্সে গেলেই তার নমুনা পাওয়া যাবে। সাকিব আল হাসান থেকে জয়া আহসান, কিংবা শমি কায়সার থেকে মিথিলা- বাঙালির অনলাইন হ্যারেসমেন্ট থেকে বাদ পড়েছেন খুব কম সেলিব্রেটিই। 

সেলিব্রেটিরা এসবের কোন প্রতিক্রিয়া জানান না, গায়ে পড়ে ঝামেলায় জড়িয়ে কি হবে- এটাই ভাবেন সবাই। আর একারণে গালিবাজ গোষ্ঠীটা মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে সময়ের সাথে সাথে। ঠিকমতো বাংলা বানান করতে না জানা লোকটাও মোবাইল ফোন হাতে পেয়ে ফোরজি ডাটা কিনে নিজেকে বিশাল কুতুব ভাবছে, কোন সেলিব্রেটির পোস্টের নিচে শোভা পাচ্ছে তার নোংরা মানসিকতার ইতিবৃত্ত। ব্যক্তি আক্রমণ, তারকাদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে কুৎসা রটনা থেকে শুরু করে নোংরা গালিগালাজ- কিছুই বাদ থাকছে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কেউ এসব কুকর্মের প্রতিবাদ করলে তাকেও সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করা হয়, এতটাই বাড়বাড়ন্ত হয়েছে এই দোপেয়ে হায়েনাদের। 

সাহানা বাজপেয়ী

কলকাতার সঙ্গীতশিল্পী সাহানা বাজপেয়ী, এই ভদ্রমহিলার গায়কীর বিমুগ্ধ ভক্ত আমি। তার ব্যক্তিত্বও ভীষণ পছন্দের, কিন্ত গতকাল একটা ঘটনায় সাহানার প্রতি শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা দুটোই বাড়লো আরও। ২০১৫ সালের ৩ মার্চ লন্ডনে বিভিন্ন দেশের বিচিত্র সব সংস্কৃতির সঙ্গীতশিল্পী ও যন্ত্রশিল্পীদের সাথে মিলে একত্রে গান করেছিলেন সাহানা। সেই অনুষ্ঠানের ছবি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আপলোড দিয়েছিলেন তিনি। ছয় বছর পর সেই স্মৃতিটাই ফেসবুকের মেমরিটি শেয়ার করেছিলেন দুইদিন আগে। 

সেখানে গিয়ে বাংলাদেশী এক ফেসবুক ব্যবহারকারী অর্বাচীনের মতোই মন্তব্য করে বসলেন, 'অর্ণব ভাইয়া কেমন আছেন?' অনেক বছর আগে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক শায়ান চৌধুরী অর্ণবকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন সাহানা, পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে থেকে পরিণত হয়েছিলেন ঢাকায় বধু-তে। দুজনের সেই সম্পর্কটা টেকেনি, পারস্পরিক সম্মতিতেই তারা আলাদা হয়েছেন, দুজনের জীবন এগিয়েছে ভিন্ন দুটো পথে। 

সাহানার এখন একটা সংসার আছে, রোহিনী নামে ফুলের মতো ফুটফুটে একটা মেয়েও আছে তার। অর্ণবও নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন, বিয়ে করেছেন কিছুদিন আগেই। আলাদা হবার পরে গত একযুগে কেউ কারো প্রতি অভিযোগ করেননি, কটুকথা বলেননি। বরং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দুজনেই বলেছেন, কীভাবে মিউজিকের জার্নিতে একজন আরেকজনের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন সেই সময়টাতে, কীভাবে একে অন্যের পাশে ছিলেন সঙ্গী হয়ে, ভরসা হয়ে।

সম্পর্কের সেই প্রথম সময়টাতে দুজন দুজনকে যতটা সম্মান করতেন, আজও ততটাই করেন। এখনও সাহানা যখন বিভিন্ন জায়গায় সাক্ষাৎকার দেন, তখন উঠে আসে অর্ণবের কথা, অর্ণবের নামটা তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গেই উচ্চারণ করেন, সেখানে ফুটে ওঠে একজন বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা। সম্পর্ক নেই তাতে কি, শ্রদ্ধা, সম্মান, সবকিছুই আছে আগের মতোই অটুট। আবার অর্ণবও তার জীবনে, তার ক্যারিয়ারে সাহানার অবদানের কথা স্বীকার করেন অকুণ্ঠ চিত্তে।

কিন্ত আলাদা হয়ে কাউকে এভাবে ভালো থাকতে দেখলে অনলাইন ব্যাকটেরিয়াদের আবার পোষায় না, তাদের গায়ে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। তাই তারা মানুষগুলোকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করার মিশনে নামেন। সাহানার সেই ফেসবুক পোস্টেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলাদেশী সেই অভদ্রলোকটি সাহানার কাছে অর্ণবের খোঁজ জানতে চেয়েছেন। হয়তো তিনি ভেবেছেন, এই মন্তব্যটি করে তিনি নিজেকে ভীষণ 'কুল ড্যুড' হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন। কিন্ত গোটা ব্যাপারটা যে বুমেরাং হয়ে তার দিকেই আবার ফিরে আসতে পারে, সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। 

সেই উটকো মন্তব্য ও সাহানার জবাব

সাহানা বাজপেয়ী সেই উটকো মন্তব্যটি দেখেছেন, সেটির জবাবও দিয়েছেন। সাহানার উত্তরটি পড়লে যে কেউই মুগ্ধ হবেন, নিজের গানের মতোই প্রাঞ্জলভাবে সাহান লিখেছেন- 

'আপনার এই প্রশ্নটি যাকে নিয়ে, তাকে গিয়েই তো জিজ্ঞেস করতে পারতেন, তাই না? আপনি যার ব্যপারে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তার পোস্টে গিয়ে কি কখনও জিজ্ঞেস করেছেন যে সাহানা কেমন আছে? অবশ্যই না। কারণ একজন নারী এধরনের প্রশ্নের সহজ লক্ষ্যবস্তু, তাই না? একজন নারীকে নিয়ে মজা করা, ট্রল করা ও বাজে মন্তব্য করে ছোট করাটা খুব সহজ। আমি আশা করি, মেয়েদের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য করার এই বিচ্ছিরি মানসিকতা থেকে আপনি দ্রুত সেরে উঠবেন।'

সাহানার সেই মন্তব্যের পরে জনৈক অর্বাচীনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যাওয়ার কথাও নয়। এরা জবাব শুনতে অভ্যস্ত নয়, কেউ ঘুরে তাকালে এরা লেজ গুটিয়ে পালায়। সাহানা বাজপেয়ী আমাদের শেখালেন, এই ব্যাকটেরিয়ার দলকে প্রশ্রয় দিলেই এরা মাথায় চড়ে বসবে, তারচেয়ে বরং ভদ্রভাবে প্রতিবাদ হোক। কাউকে সম্মান দিতে না পারলে চুপ থাকাটাই যে শ্রেয়- সেটা এদের বোঝানো সম্ভব নয়। 

সেলিব্রেটি বলেই কেউ মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলে এরা পেয়ে বসবে, দলেবলে বাড়বে আরও। তারকারাও মানুষ, তাদেরও ব্যক্তিগত জীবন আছে, ভালো লাগা, খারাপ লাগা আছে, আছে কষ্ট-বেদনা সব অনুভূতিই। সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কারো নেই, সবচেয়ে বড় ভক্তটিরও নেই। তারকার সমালোচনা কর‍তে হলে তার কাজ নিয়ে করুন, পারফরম্যান্স নিয়ে করুন, তার ব্যক্তিজীবন নিয়ে টানাহেঁচড়া করার অধিকার তো তিনি কাউকে দিয়ে রাখেননি। পাবলিক ফিগার মানেই যে পাবলিক প্রোপার্টি নয়, সেটা বোঝার জন্য তো মাথায় সামান্য একটু ঘিলু থাকাই যথেষ্ট। আফসোসের ব্যাপার এটাই যে- সেটাও অনেকের নেই। 

আপনাকে ধন্যবাদ সাহানা, এই অর্বাচীন মন্তব্যকারীকে সমুচিত জবাবটা দেয়ার জন্য। আপনার প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাবোধটা এক লাফে আরও অনেকখানি বেড়ে গেল এই ঘটনার পর... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা