ক্যারিয়ারে থ্রিলার আছে, রোমান্টিক সিনেমা আছে, ড্রামা আছে, অ্যাকশন আছে, অন্য খানদের চেয়ে অনেক বেশি ভার্সেটাইল, ভারতে নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজটার লিড কাস্ট তিনি- তবুও সাইফ আলী খান যেন খানিকটা অপাংক্তেয়...

কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় বলিউডের খানদের মধ্যে কার স্ক্রিপ্ট চয়েজ সবচেয়ে ভালো, কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেন, কিংবা সিনেমার গল্প আর চরিত্রের মিশেলে কার সবচেয়ে বেশি ভ্যারিয়েশন দেখেছেন দর্শকেরা- একশোতে পঁচানব্বই জনই আমির খানের নাম বলবেন। কারণ সবাই আমিরের তুলনাটা করবেন শাহরুখ এবং সালমানের সঙ্গে; একজন রোমান্সের কিং, অন্যজন অ্যাকশনের। তাদের তুলনায় আমির সত্যিই অনেক ভার্সেটাইল, সত্যি কথা। অবচেতন মনে, অথবা জেনেশুনেই কিন্ত আপনি একজন খানকে বাদ দিয়ে ফেলেছেন তালিকা থেকে- সাইফ আলী খান, খান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভার্সেটাইল এক্টরের তকমাটা তাকে দিলে কি ভুল হবে একটুও? 

ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা হবার কথা ছিল বেখুদি, যে সিনেমাটা দিয়ে কাজলের অভিষেক হয়েছিল বলিউডে। শুটিংয়েও অংশ নিয়েছিলেন সাইফ, কিন্ত একদিনের শ্যুট করার পরই বাদ দেয়া হয়েছিল তাকে, কারণ তার অভিনয় মনে ধরেনি পরিচালকের। যে কয়টা দৃশ্যধারণ হয়েছিল, সেটা দেখে পরিচালক ভেবেই নিয়েছিলেন, এই ছেলেকে দিয়ে আর যাই হোক, অভিনয় হবে না! যে স্বপ্ন নিয়ে ফিল্মি দুনিয়ায় এসেছিলেন সাইফ, সেটা সুতো কাটা ঘুড়ির মতোই মুখ থুবড়ে পড়েছিল বাস্তবের কঠিন জমিতে। 

মা শর্মিলা ঠাকুর ছিলেন ভারতীয় সিনেমা জগতের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, বাংলা এবং হিন্দি, দুই ভাষার সিনেমাতেই কাজ করেছেন চুটিয়ে। সত্যজিত রায়ের প্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন তিনি, সত্যজিত তাকে নিয়ে বানিয়েছেন অপুর সংসার, দেবী, নায়ক, অরণ্যের দিনরাত্রির মতো চমৎকার সব সিনেমা। আবার যশরাজের ব্যানারেও সমান্তরালে কাজ করেছেন শর্মিলা। কাজ বাবা ক্রিকেটে ভারতের অধিনায়কত্ব করেছেন, টাইগার পতৌদি নামে যাকে এক ডাকে চেনে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব। বলা হয়, স্বাধীনতার পরে মনসুর আলী খান পতৌদি ছিলেন প্রথম ভারতীয় অধিনায়ক, যার নেতৃত্বে ভারতীয় দল জেতার জন্য খেলতো! তার ওপরে তিনি ছিলেন পতৌদির নবাব বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী। সেই সূত্রে সাইফের রক্তেও মিশে আছে নবাবী গৌরব। 

রেস-২ সিনেমায় সাইফ আলী খান

এমনই এক বনেদী পরিবারে সোনার চামচ মুখে দিয়ে তার জন্ম, বেড়ে ওঠা। অভাবের মুখোমুখি তাকে কখনও হতে হয়নি, ভাতের চিন্তা, চাকরির চিন্তা করতে হয়নি- এটা সত্যি। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবার সুযোগ তিনি অনায়াসেই পেয়েছিলেন, কলেজের ফিস, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডোনেশন- এসব তার ভাবনার করিডোরে কড়া নাড়েনি। তবে স্ট্রাগল সাইফ আলি খানও করেছেন, আজও করছেন, এবং আমার ধারণা, গোটা ক্যারিয়ারজুড়েই তাকে স্ট্রাগলটা করে যেতে হবে- নিজেকে প্রমাণের স্ট্রাগল। 

তার ক্যারিয়ারের প্রথম ফিল্মটা বেখুদি হতে পারতো, হয়নি। বাদ পড়েছিলেন, আগেই বলেছি। সেই ধারাবাহিকতা বজায় আছে আজও। এইতো, কিছুদিন আগেই রেস ফ্র‍্যাঞ্চাইজি থেকে তাকে বাদ দেয়া হলো, যে সিরিজটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সাইফের দুর্দান্ত অভিনয় আর আব্বাস-মাস্তানের দারুণ পরিচালনার গুণে- সেই সিরিজের তৃতীয় কিস্তি থেকে তিনজনকেই একরকম বের করে দেয়া হলো! ফলাফল, বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে রেস-থ্রি'র গতি। 

সাইফ আলী খান সুপারস্টার নন, সত্যি কথা। প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে এখনও সেই অবস্থান তৈরি করতে পারেননি যে, শুধু তার নামেই সিনেমা একশো কোটির ব্যবসা করবে। কিন্ত সাইফ দর্শককে হতাশ করেছেন খুব কম, বরাবরই নিজের রোল বা স্ক্রিন টাইমের ওপরে প্রাধান্য দিয়েছেন সিনেমার গল্পকে। আর সেটাই সাইফকে অনন্য করে তুলেছে বাকি খানদের চেয়ে। 

ইন্সপেক্টর সরতাজ সিং, স্যাক্রেড গেমস সিরিজে

সাইফের ফিল্মোগ্রাফিতে নজর বুলিয়ে নিন একবার, সেখানে হাম তুম, পরিণীতা বা লাভ আজকালের মতো রোমান্টিক সিনেমা যেমন আছে, তেমনই আছে সালাম নমস্তে'র মতো রোমান্টিক কমেডি, ককটেলের মতো ভিন্নধর্মী উপস্থাপনার ভালোবাসার সিনেমাও। এক হাসিনা থি, কুরবান, রেস সিরিজ বা এজেন্ট বিনোদের মতো থ্রিলারে তিনি সাবলীল হিসেবে প্রমাণ করেছেন নিজেকে, আবার ওমকারার মতো ক্রাইম ড্রামাতেও ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের অপরিহার্যতা, নেটফ্লিক্সের স্যাক্রেড গেমসে ইন্সপেক্টর সারতাজের ভূমিকায় তার অভিনয় কি মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব? দিল চাহতা হ্যায় সিনেমায় তুলনামূলক অগুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্রেও তিনি আশ্চর্য্য রকমের সাবলীল ছিলেন! ককটেল, ফ্যান্টম, শেফ, কালাকান্দি, বাজার, তানহাজি অথবা ওয়েব সিরিজ তাণ্ডব- প্রতিটা সিনেমা সিরিজই সাইফের অভিনয়ের উৎকর্ষতার প্রমাণ হয়ে আছে। 

কিছুদিন আগে তানহাজি দেখছিলাম। অজয় দেবগনের বীরগাঁথার এই কাহিনিতে দারুণভাবে নজর কেড়েছেন সাইফ আলী খান, তার ঔজ্জ্বল্যা বাকীদের চোখেই পড়েনি একদম। তলোয়ারের এক কোপে হাতির শুঁড় ফেলে দেয়া, মরাঠা সেনা কিংবা নিজের বাহিনীর বিশ্বাসঘাতকের মাথা উড়িয়ে দিতে এতটুকু হাত না কাঁপা, নিজে হাতে অবলীলায় কুমিরের রোস্ট থেকে মাংস খুবলে নেওয়া নৃশংসতা, বিপক্ষের চোখে ধুলো দেওয়া চাতুর্য, প্রেমিকার সম্মতি ছাড়া তাঁকে অধিকার করতে না চাওয়া পৌরুষে এবং স্রেফ দৃষ্টি ও হাসির ক্রুর হিংস্রতার মিশেলে সেফের উদয়ভান বারবারই ছাপিয়ে গিয়েছেন বাকিদের, এবং বোধ হয় নিজেকেও। এই সিনেমা তাই তানহাজির পাশাপাশি উদয়ভানেরও নিঃসন্দেহে।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকে মনের আনন্দে কাজ করেছেন, সিরিয়াসনেস কম ছিল, নিজের রোলের গুরুত্ব কতটা, মূল চরিত্র নাকি পার্শ্বচরিত্র- সেসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। গল্প পছন্দ হলে, বিশ্বাসযোগ্য হলেই কাজ করেছেন, আজও করছেন।নইলে অজয়ের বিপরীতে ভিলেন হিসেবে সাইফ আলী খানের মতো কারো অভিনয় করার কথা নয়; সাইফ করেছেন, কারণ নিজেকে নায়ক কম, অভিনেতা বেশি ভাবতেই পছন্দ করেন তিনি। 

ভিলেনের রোলে দেখা গেছে তানহাজি সিনেমায়

শুরু থেকেই তিনি ডিরেক্টর্স এক্টর। পরিচালকেরা তাকে যেভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন, তিনি 'ইয়েস স্যার' বলে সেভাবেই উজাড় করে দিয়েছেন নিজেকে। যশ চোপড়া থেক্ব আশুতোষ গোয়াড়িকর, মহেশ ভাট থেকে মিলন লুথারিয়া, ইমতিয়াজ আলি থেকে অনুরাগ কাশ্যপ বা সুরজ বারজাতিয়া, ফারহান আখতার, বিশাল ভরদ্বাজ,নিখিল আদভানি, সিদ্ধার্থ আনন্দ, বিধু বিনোদ চোপড়া, আব্বাস মাস্তান, রাজ এন্ড ডিকে, তিগমানশু ধুলিয়া, কবীর খান- প্রত্যেকের সঙ্গে মনে রাখার মতো কাজ করেছেন সাইফ। স্টেজ শো হোস্টের বেলায়ও তিনি দারুণ সাবলীল, শাহরুখের সঙ্গে জুটি বেঁধে তার করা ফিল্মফেয়ারের আসরগুলো তো এখনও নস্টালজিয়ায় ভোগায় আমাদের! 

তার ক্যারিয়ারে থ্রিলার আছে, রোমান্টিক সিনেমা আছে, ড্রামা আছে, অ্যাকশন আছে, ভারতে নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজটার লিড কাস্ট তিনি- তবুও সাইফ আলী খান যেন খানিকটা অপাংক্তেয়। হ্যাঁ, তিন খানের মতো জনপ্রিয়তা নেই তার, নেই বিশাল ফ্যানবেজ, নেই গণ্ডায় গণ্ডায় হিট বা ব্লকবাস্টার। মাঝেমধ্যে তো মনে হয় সাইফের চেয়েও তার ছেলে তৈমুরের জনপ্রিয়তা বুঝি বেশি! কিন্ত এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, ভ্যারিয়েশনের দিক থেকে শাহরুখ-সালমান-আমির, তিনজনকেই বিশাল ব্যবধানে পেছনে ফেলেছেন সাইফ। কে জানে, কয়েক যুগ পর যখন সবাই অতীত হয়ে যাবেন, তখন হয়তো দর্শকেরা বুঝতে পারবেন, সাইফ আলী খান আসলে কি ছিলেন! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা