বিএনপি'র আমলে টিএসসিতে দাঁড়িয়ে কী উদ্ধতভাবে তিনি বলছেন- 'আপনারা যদি না বলেন কর্নেল তাহেরের খুনি কে... তাহলে আমি গান না গেয়ে এখান থেকে চলে যাবো...!' কী ভয়ংকর দুঃসাহস!

স্কুল জীবনে সঞ্জীব চৌধুরীর 'স্বপ্নবাজি' গানটা যখন শুনি, তখনো জানতাম না এই গানের গুম করে ফেলা ৩০০টি লাশ কাদের লাশ, তবে এটা বুঝতাম- কর্নেল তাহেরের ফাঁসির কথাটি সঞ্জীব কতোটা আবেগ নিয়ে বলেছেন। বলেছেন-

'মাটি ভিজে যায় রক্তে,
আর একজন কর্নেল তাহের
পৃথিবীর সমান বয়সী স্বপ্ন নিয়ে-
আলিঙ্গন করেন ফাঁসির রজ্জু...'

'পৃথিবীর সমান বয়সী স্বপ্ন', কি চমৎকার কিছু শব্দ। এই শুরু কর্নেল তাহেরকে খোঁজা। খুঁজে খুঁজে পড়লাম সাহাদুজ্জামানের 'ক্রাচের কর্নেল'। আরও পড়লাম, জানলাম সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যার কথা, পড়লাম আনোয়ার কবিরের 'সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যা'। জানলাম জিয়ার হাতের শতশত মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারের রক্তের কথা। পড়লাম একরাতে একটানা শত শত ফাঁসির কথা। পড়লাম মৃতদেহ ইউনিফর্ম সহ মাটিচাপা দেয়ার সত্যিকারে গল্পকথা। জানলাম তাদের অনেকে ঠিকমত মারা যাওয়ার আগেই জিয়ার পাণ্ডারা কবরস্থ করে ফেলে। জানলাম দশ-বিশ বছরেও সেই সেনা অফিসারদের ইউনিফর্ম পচে না।

সঞ্জীব চৌধুরীর একমাত্র গ্রন্থ রাশপ্রিন্ট পড়ার পর বুঝতে পারলাম সেই ৩০০টি লাশ হচ্ছে জিয়ার হাতে নিহত সেনা অফিসারদের লাশ। দেখলাম টিএসসিতে সঞ্জীব'দার ঐতিহাসিক কনসার্ট। বিএনপি'র আমলে কী উদ্ধতভাবে বলছেন- 'আপনারা যদি না বলেন কর্নেল তাহেরের খুনি কে... তাহলে আমি গান না গেয়ে এখান থেকে চলে যাবো...!' কী ভয়ংকর দুঃসাহস!

আমি আমার জীবনে যত হুমকি-ধামকি পেয়েছি, সেটার ২০ ভাগ মৌলবাদীদের কাছ থেকে আর ৮০ ভাগ জাতীয়তাবাদী মনস্কদের কাছ থেকে। এটার পেছনে একটাই কারণ, কারণটা হচ্ছে সাব্বির ভাইয়ের সাথে 'অফেন্ডিং জিয়া' সম্পাদনা করা। বাঙালি সো-কল্ড নিরপেক্ষতার নামে বঙ্গবন্ধুর কতইনা সমালোচনা করে, অথচ নরপশু জিয়ার রক্তাক্ত হাত সম্পর্কে কিছুই জানে না।

আমি অবাক হয়ে যাই বাকশালের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা নিয়ে কত আলোচনা-সমালোচনা অথচ এই যে জিয়ার পুরো আমল জুড়ে এত শত-সহস্র সেনা অফিসার হত্যা করা হল (প্রায় তিন সহস্রাধিক), কই কেউ তো কিছু বলে না, কয়টা বই বেরিয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম সেই হত্যাযজ্ঞ নিয়ে? সেই সময়ের কয়টা পত্রিকা রিপোর্ট করেছে? তাহলে কেন বাকশালের পাশাপাশি জিয়ার আমলের খুনগুলোর কথাও সামনে আসবে না?

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কত সমালোচনা কত অপ-তথ্যের ডকুমেন্টারি, কেন জিয়ার কুকর্ম গুলো এভাবে ঢাকা পড়ে যাবে?

সঞ্জীব চৌধুরীর স্বপ্নবাজী থেকেই সাহস করেছিলাম জিয়ার কুকর্মের কথাগুলো কিছুটা হলেও বলে যেতে হবে, অন্তত যারা বলেছেন তাদের কথাগুলো সংকলন করে যেতে। সঞ্জীব'দা যদি দুঃসময়ে সাহস করে এই উচ্চারণ করতে পারেন, তাহলে এই দুঃসময়েও আমরা পারবো। পুরো স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সমস্ত 'দালাল' তকমা মাথা পেতে নিয়ে জিয়ার ওপর প্রায় বিশজন লেখকের সমৃদ্ধ তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধের সঙ্কলন 'অফেন্ডিং জিয়া' প্রকাশিত হয়, মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভের ওয়েবসাইট থেকে বিনামূল্যে ডাউনলোড করা যায়।

হয়তো এই সংকলনের অপরাধে এর সাথে জড়িতদের অনেক বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তবে তাতে আসলে কিছু যায় আসে না। সত্য সত্যই, মিথ্যাকে পরাজিত করাই তার কাজ। সেই সত্যকে বুকে নিয়ে সঞ্জীব চৌধুরীর মতই এখনো স্বপ্ন দেখি শ্রেণীহীন সমাজের, এখনো বলতে চাই স্বপ্নের কথা...

"আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া, সন্ধান করিয়া
স্বপ্নের ওই পাখি ধরতে চাই,
আমার স্বপ্নের কথা বলতে চাই;
আমার অন্তরের কথা বলতে চাই..."

একজন সঞ্জীব চৌধুরীর একটা গান 'স্বপ্নবাজী' আমাকে সাহস জুগিয়েছিল সত্যকে জানার। আজ আমার প্রিয় এই শিল্পীর তেরোতম মৃত্যুবার্ষিকী। এখানে তো শুধু তার একটা গান নিয়ে আলোচনা করলাম। এই একটা গান থেকেই আমি সামরিক দুঃশাসনের কথা জেনেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার নির্মম ইতিহাসটা জেনেছিলাম। আমার সমসাময়িক কোন শিল্পী আমার ভেতরে এত গভীর দাগ কাটতে পারেন নাই। সঞ্জীব চৌধুরীর প্রতিটা গান নিয়ে এমন করে আলোচনা করা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে।

সঞ্জীব'দা চলে গেছেন। এই নষ্ট শহরের নাম না জানা যে কোন রাস্তায় সিগারেট ফুকতে ফুকতে সঞ্জীব চৌধুরীর কথা মনে পড়ে। ইতিহাসের গলি-ঘুপচিতে ঘুরতে ঘুরতে সঞ্জীব চৌধুরীর কথা মনে পড়ে। লুতুপুতু প্রেমের গান লিখে সুর করে গেয়ে সঞ্জীব চৌধুরী অনেক নষ্টদের মত টিকে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই, তিনি তার জীবনের সাথে গানকে জড়িয়েছেন, তিনি তার ভালোবাসার সাথে গানকে মিশিয়েছেন। তার গানে সংকট ছিল, রাজনীতি ছিল, সময় ছিল, সত্য ছিল, ভালোবাসা ছিল। তার কণ্ঠ ছিল, আবগে ছিল, জীবনীশক্তি ছিল। সঞ্জীব চৌধুরী আসলে বেঁচে থাকবেন আরও অনেকদিন, যতদিন আমরা তাকে নিয়ে আলোচনাটা বাঁচিয়ে রাখবো।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা