একঘেয়ে জীবনে মোটেও অভ্যস্ত হতে চান না এই অভিনেতা। তাই ক্ষুধার্ত হয়ে করে চলেন অভিনয়, লেখালেখি, পড়াশোনা। 'বালা'র হরি শুক্লা কিংবা 'বরফি'র সুধাংশু দত্ত হয়ে এক জীবনেই ঢুকে পড়েন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে। অভিনয়ের দর্শনটা বোঝেন বলেই খুব সহজেই চিনে ফেলেন ভিন্ন চরিত্রের খোলস। বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই সমাপ্ত করতে থাকেন অসাধ্যসাধনের একেকটি অধ্যায়...

'জলি এল.এল.বি' দেখে যতটা না মুগ্ধ হয়েছিলাম আরশাদ ওয়ারসির অভিনয়ে, তার চেয়েও বেশি মন জয় করেছিলেন 'জাস্টিস সুন্দরলাল ত্রিপাঠী' ওরফে সৌরভ শুক্লা। সাইড ক্যারেক্টার হিসেবে এসেও যে সপ্রতিভ অভিনয়-দৌড় তার, চমকেই উঠেছিলাম একরকম। এরপর পিকে'র সেই 'তপস্বী মহারাজ' কিংবা 'রেইড' এর 'তাউজি', ভিন্ন মোড়কের চরিত্রে এসে সৌরভ শুক্লা সৌরভ ছড়িয়েছেন নিয়মিতই। টাইপকাস্ট হওয়ার কোনো বাসনা তার নেই, তা তার অভিনীত চরিত্রগুলো থেকেই বোঝা যায়। 

জাস্টিস ত্রিপাঠী! 

থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেছিলেন বহু আগেই। ছোটখাটো অভিনয়, মৃদুমন্দ হাততালি আর অল্পবিস্তর উপার্জন দিয়ে কাটছিলো সময়। পরবর্তীতে রাম গোপাল ভার্মার কাল্ট ক্ল্যাসিক 'সত্য' সিনেমার অন্যতম স্ক্রিপ্ট রাইটার হওয়ার সুযোগ যখন পেলেন, শুক্লা বুঝলেন থিয়েটারের ছোটখাটো চৌহদ্দি থেকে 'সিনেমা'সমুদ্রে জোরেসোরেই নেমে পড়ছেন তিনি। 'সত্য' সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবেই তিনি শুধু সীমাবদ্ধ রইলেন না। অভিনয়ও করলেন সেখানে। 'কাল্লু মামা' নামের সে চরিত্রও মনে রাখারই মতন। 

সৌরভ শুক্লা এরপর নিয়মিতই করেছেন অভিনয়। শুধু অভিনয়ই বা কেন, পরিচালনা, লেখালেখি সবই করেছেন এবং করছেন সমানতালে। পর্দায় যতই বিচিত্র সব রোলে অভিনয় করুক না কেন, তার বাস্তব জীবন যে পর্দার চেয়েও বিচিত্র, তা নিয়েও সন্দেহ নেই একটুও। প্রথাগত গণ্ডিতে আটকে না থেকে, 'বয়স' নামক অভিশাপকে মৃদু বকুনি দিয়ে আগ্রহী শিশুর মতন অকৃত্রিম কৌতূহলে চোখ রাখেন সবদিকে। নতুন নতুন সবকিছু জানার অসামান্য ইচ্ছেশক্তি তার। সে ইচ্ছেশক্তির জোরেই নিয়মিত নানা বিষয়ের চর্চা করেন তিনি। কেন সবকিছু নিয়ে এত আগ্রহ, এ প্রশ্নের জবাবে হাসতে হাসতেই বলেন-

জীবন তো একটাই। এই জীবনেই সব কিছু না করতে পারলে করবো কবে? আর আগ্রহ না থাকলে, জীবন তো থেমে যাবে পুরোপুরি। 

নতুন কোনো বিষয়ে কতটা আগ্রহ তার, তা একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারা যাবে। গত বছরের মার্চের দিকে ভারতে যখন লকডাউন চলছে, তখন মানসিকভাবে সবাই মোটামুটি ঝিমিয়ে গেলেও সৌরভ শুক্লা থমকে যেতে চাইলেন না। বসে বসে ভাবতে লাগলেন, নতুন কী করা যায়। হঠাৎই মাথায় এক পরিকল্পনা আসে। পরিকল্পনা মাফিক সিনেম্যাটোগ্রাফার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে শিখে ফেললেন ক্যামেরার খুঁটিনাটি। এরপর ঘরে বসেই শুরু করলেন ক্যামেরা দিয়ে শুটিং। নিজেই স্ক্রিপ্ট রাইটার। নিজেই পরিচালক। নিজেই অভিনেতা। নিজেই এডিটর। একসময় বানিয়ে ফেললেন নব্বই মিনিটের এক সিনেমাও। আটান্ন বছর বয়স্ক একজন মানুষ, মহামারীর আতঙ্কে জবুথবু না হয়ে নতুন কিছু শিখে মেতে উঠছেন সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে, এই বিষয়ের মধ্যে যে অভিনব এক চমৎকারিত্ব আছে, সে বলাই বাহুল্য। 

'পিকে'র 'তপস্বী মহারাজ' হয়ে দেখিয়েছিলেন চমক! 

এখানেই শেষ না। মহামারীর এই থমথমে সময়েও তিনি আরো একটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। আরেকটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট শেষ, সেটি নিয়েও কাজ শুরু করবেন খুব তাড়াতাড়ি। তার অভিনীত দুটি নির্মাণ ইতোমধ্যেই মুক্তি পেয়েছে এবং সুনামও কুড়াচ্ছে৷ তাছাড়া স্ট্রিমিং সাইটের জন্যেও কাজ করছেন তিনি। প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করা মানুষটি আবার সুযোগ পেলেই বসে যাচ্ছেন বই নিয়ে, নেমে যাচ্ছেন টেবিল টেনিস খেলতে। এসবের পাশাপাশি একটি কমিক থিয়েটারেও নিয়মিত পারফর্ম করছেন তিনি। 

প্রখ্যাত লেখক শাহাদুজ্জামান বলেছিলেন-

জীবন যেহেতু একটাই, সে জীবনেই হতে হবে সবকিছু। কখনো গৃহী৷ কখনো সন্ন্যাসী। কখনো প্রেমিক। কখনো বিপ্লবী।

সে বিষয়টিই লক্ষ্য করি সৌরভ শুক্লার ক্ষেত্রে। উর্দির নীচে বার্ধক্য আনার কোনো বাসনা নেই তার। একঘেয়ে জীবনেও অভ্যস্ত হতে চান না তিনি। তাই ক্ষুধার্ত হয়ে করে চলেন অভিনয়, লেখালেখি, পড়াশোনা। 'বালা'র হরি শুক্লা কিংবা 'বরফি'র সুধাংশু দত্ত হয়ে এক জীবনেই ঢুকে পড়েন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে। অভিনয়ের দর্শনটা বোঝেন বলেই খুব সহজেই চিনে ফেলেন ভিন্ন চরিত্রের খোলস। বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই সমাপ্ত করতে থাকেন অসাধ্যসাধনের একেকটি অধ্যায়। খুব স্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দেন- 'বয়স' শুধুমাত্র এক সংখ্যা। পাশাপাশি এ শিক্ষাও দেন- কোনো কিছু শেখার জন্যে, করার জন্যে বয়স মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। নিজের ইচ্ছেশক্তিই মূখ্য।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা