পঁচাত্তর বছরের ডি-নিরোকে নিয়ে আইরিশম্যান বানিয়ে ফেলেন মার্টিন স্করসিজি, ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এসে 'বুড়িয়ে যাওয়া' অমিতাভ বচ্চন একের পর এক ভিন্নধর্মী সিনেমা উপহার দিয়ে যান। অথচ নায়করাজ থেকে হুমায়ূন ফরীদি অথবা ইলিয়াস কাঞ্চন- আমাদের তুখোড় অভিনেতারা পড়ে থাকেন ব্রাত্য হয়ে...

কেন্দ্রীয় চরিত্রে রবার্ট ডি নিরো'র অভিষেক হয়েছিল ১৯৬৮ সালে, সিনেমার নাম গ্রিটিংস। সেই সিনেমার ৫১ বছর পরে এসে ২০১৯ সালে রবার্ট ডি নিরো অভিনয় করলেন মার্টিন স্করসিজির দ্য আইরিশম্যান সিনেমায়, সেখানেও কেন্দ্রীয় চরিত্রেই ছিলেন তিনি। গডফাদার সিরিজ বা ট্যাক্সি ড্রাইভারের সেই ডি-নিরো এখন আর নেই, লোকটা বুড়িয়ে গেছেন, কিন্তু ফুরিয়ে তো যাননি। বয়স আর অভিজ্ঞতা তাকে আরও বেশি ঋদ্ধ করেছে, তারই ঝলক দেখা গেছে দ্য আইরিশম্যান সিনেমায়। এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেই, ক'দিন আগেই দ্য ফাদার সিনেমায় অনন্য অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে অস্কার জিতেছেন অ্যান্থনি হপকিন্স। 

দ্য আইরিশম্যান সিনেমায় রবার্ট ডি নিরো

অমিতাভ বচ্চন, যে মানুষটা নিজেই আস্ত একটা ইন্ডাস্ট্রি। নব্বইয়ের দশকেই নায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার শেষ করেছেন তিনি। এরপর রাজনীতিতে নেমেছেন, সিনেমা প্রযোজনা করেছেন, সাফল্য পাননি দুটোর একটাতেও। আবারও নিজের কমফোর্ট জোন সিনেমাতেই ফিরেছেন বিগ-বি, কিন্তু যা-তা রোল তো তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে, বয়সের সাথে, দর্শকের চাহিদার সাথে মিলিয়ে নিজেকে বদলে নিয়েছেন পুরোপুরি। এগিয়ে এসেছেন বলিউডের নির্মাতারাও। 

শূন্য দশক এবং গত দশকের অমিতাভ বচ্চনকে দেখুন, অজান্তেই শ্রদ্ধা-ভক্তি চলে আসে তার এই কুড়ি বছরের কাজগুলো দেখলে। ব্ল্যাক, সরকার, সরকার রাজ, নিঃশব্দ, চিনি কম, পা, আরক্ষণ, সত্যগ্রহ, পিকু, ওয়াজির, পিংক, ১০২ নটআউট, বদলা, গুলাবো সিতাবো- একটা মানুষ জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে, কিংবদন্তী খেতাব পাওয়ার পরে এই কাজগুলো করেছেন। ভাবতে অবাক লাগে না? 

এতে অমিতাভের যেমন অবদান আছে, তেমনই অবদান আছে বলিউডের নির্মাতাদের, দর্শকদের। রামগোপাল ভার্মা যেমন অমিতাভকে নিয়ে সরকার সিরিজ বানানোর ঝুঁকি নিয়েছেন, সুজিত সরকার বা অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর মতো পরিচালকেরাও বিগ বি-কে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার সাহস দেখিয়েছেন। এসবেরই মিলিত ফলাফল, গত দুই দশকে একের পর এক সিনেমা দিয়ে দর্শক-সমালোচক উভয়কেই তুষ্ট করে গেছেন অমিতাভ বচ্চন। 

পিংক সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন

অথচ আমাদের দেশের নাটক বা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে খুব বাজে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। এখানে কেউ মধ্যবয়সে পা দিলেও তাকে মোটামুটি বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া হয়। অথবা তার জন্য বরাদ্দ থাকে বড় ভাই-বোন, বাবা-মা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ভিলেনের রোল, যেগুলো আদতে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। 

নায়করাজ রাজ্জাক মারা গেছেন ২০১৮ সালে। আচ্ছা, মৃত্যুর আগের দশ বছরে রাজ্জাক অভিনীত একটা উল্লেখযোগ্য সিনেমার কথা মনে করতে পারবেন কেউ? হুমায়ূন ফরীদি মারা গেলেন ২০১২ সালে। এর আগের একযুগে কতখানি ব্যবহার করা হয়েছে এই বাংলায় জন্ম নেয়া সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাটিকে? তার সামর্থ্যের পাঁচ পার্সেন্ট, নাকি দশ? নাম নিতে শুরু করলে তালিকাটা শুধু লম্বাই হবে, আর বাড়বে আক্ষেপ। 

পরিচালক সঞ্জয় সমাদ্দার একটা টেলিফিল্ম বানাচ্ছেন। সাদাত হোসাইনের মরণোত্তম উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সেটির চিত্রনাট্য। সেই টেলিফিল্মে মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। খবরটা শুনে স্বস্তি পেয়েছি, একটা ভালোলাগা কাজ করেছে। উপন্যাসের আজিজ মাস্টারের চরিত্রটির জন্য এরচেয়ে পারফেক্ট কাস্টিং বোধহয় আর হতে পারতো না। শুটিংয়ের কয়েকটি স্টিল পিকচার দেখে সেই ধারণা আরও পাকাপোক্ত হলো।

পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, ছয় বছর পর ছোট পর্দায় ফিরছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। আর বড় পর্দায় সম্ভবত তাকে শেষবার দেখা গিয়েছিল 'বিজলি' সিনেমায়, সেটাও বছর তিনেক আগের কথা। ইলিয়াস কাঞ্চন, যে মানুষটা বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যবসায়ীকভাবে সবচেয়ে সফল সিনেমাটির (বেদের মেয়ে জোছনা) নায়ক, তিনি শুধুমাত্র পছন্দমতো চরিত্র বা গল্প পাচ্ছেন না বলে অভিনয় থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন অনেক বছর ধরেই। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বা অন্যান্য কাজ নিয়েই তার যত মনোযোগ। 

মরণোত্তম এর পোস্টার

এমন নয় যে কাঞ্চন অভিনয় করতে চান না। কিন্তু অগুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে, চেহারা দেখানোর জন্য তো তিনি ক্যামেরার সামনে হাজির হবেন না। গত দেড় যুগে তার কাছে উপযুক্ত গল্প বা চরিত্র নিতে ক'জন নির্মাতা গিয়েছেন? ক'জন চিত্রনাট্যকার কাঞ্চনকে ভেবে গল্প লেখার কথা ভেবেছেন? স্করসিজি যেমন 'আই হার্ড ইউ পেইন্ট হাউজেজ' উপন্যাসটি পড়ার সময়ই ডি-নিরোর কথা কল্পনা করে ফেলেছিলেন, সুজিত সরকার যেমন 'বচ্চন সাহেবকে নিয়ে সিনেমা বানাব' ভেবেই জুহি চতুর্বেদীকে গল্প লিখতে বলেন, সেরকমটা আমাদের সিনিয়র আর্টিস্টদের ক্ষেত্রে কি হয় খুব একটা? 

বয়স হয়ে গেলেই কাউকে বাবা-মা অথবা বড় ভাই-বোনের রোল গছিয়ে দিতে হবে- এমন গৎবাঁধা ধারণা থেকে নির্মাতাদের বেরিয়ে আসাটা খুব জরুরী। অভিনেতার মেরিট অনুযায়ী গল্প লেখা হোক, চরিত্র বানানো হোক, বয়স দেখে নয়। দেরীতে হলেও এমন কিছু ঘটছে দেখে ভালো লাগছে। বঙ্গবিডির বেজড অন বুকস প্রকল্পের আওতায় নির্মিত মরণোত্তমের জন্য শুভকামনা। শুভকামনা ইলিয়াস কাঞ্চন এবং সঞ্জয় সমাদ্দারের জন্যেও। মরণোত্তম যদি কন্টেন্ট হিসেবে ভালো হয়, দর্শকদের প্রত্যাশানুযায়ী সাড়া পায়, তাহলে হয়তো ইন্ডাস্ট্রিতে সিনিয়র আর্টিস্টদের গুরুত্বটা আরেকটু বাড়বে... 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা