মনে রাখতে হবে 'শান' আর্টফিল্ম না৷ পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল ফিল্ম। সে হিসেবে গল্প কতটা থাকবে বাস্তব আর কতটা হবে অলীক কল্পনা, তা জানা নেই কারো। সাসপেন্স, রোমান্স, অ্যাকশনের মধ্যে মূল গল্প কতটুকু খোলতাই হবে, নাকি গল্পের গণ্ডি আড়ষ্ট হয়েই থেকে যাবে শেষতক, সেখানেও থাকবে চ্যালেঞ্জ!

পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম ব্যবসা কোনটি? খানিকটা মাথা চুলকে ইতিউতি তাকিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে হবে না। দ্ব্যর্থভাবেই জানতে হবে, পৃথিবীর সবচেয়ে আদিমতম ব্যবসা- আদম ব্যবসা। মানুষকে 'পণ্য' বানিয়ে এখন পর্যন্ত করা সমস্ত ব্যবসার মধ্যে এ আদিম ব্যবসা সবচেয়ে বেশি লাভজনকও। সে সাথে ঝুঁকিরও বালাই নেই অতটা। মানুষের নিরক্ষতার, মূর্খতার, লোভের সুযোগ নিয়ে যে ব্যবসা চলে আসছে সৃষ্টির শুরু থেকেই।

যাপিত জীবনে বহুবিধ বিড়ম্বনায়, নিরন্তর প্রহসনে বির্পযস্ত মানুষ ক্ষণেক্ষণে ভাবে, বেড়ার ওপাশের ঘাসগুলো বোধহয় বেশিই সবুজ। এই সবুজ ঘাসের সন্ধানেই তারা টপকাতে চায় কাঁটাতার। যেতে চায় ভিন্ন মানচিত্রে। ভাগ্যের মানচিত্র খানিকটা পরিবর্তনের আশায়। খানিকটা স্বস্তির আশায়। যদিও তাদের ভাগ্যের মানচিত্র পালটায় না, বরং পুরোপুরি পালটে যায় জীবনের মানচিত্রই। নীল বিষাদে ছেয়ে যায় কোনো এক কালের রঙিন ঝলমলে জীবন। 

'শান' নামের এক বাংলাদেশি সিনেমার সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া পোস্টারে বিষাদগ্রস্ত নীল রঙ এবং চোখে পট্টি বাঁধা একদল ক্ষতবিক্ষত তৃণমূল মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে খানিকটা স্থানু হলাম। উপরের কথাগুলো দলাপাকিয়ে জমে উঠলো বুকে। আচমকাই যেন থেমে গেলাম। থমকানোর পেছনে দুটি কারণ মূখ্য। প্রথমত- বাংলাদেশের সিনেমায় এত সুন্দর পোস্টার হয়ইনা বলতে গেলে। একাধিক মেটাফোরিক্যাল বিষয় এমন আশ্চর্য সাবলীলতায় দিয়ে দেয়া হয়েছে পোস্টারে, স্রেফ দুর্দান্ত। দ্বিতীয়ত- পোস্টার দেখে বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে- আদম ব্যবসা, নারী পাচার এবং মানবাঙ্গ পাচারের নানা চলক নিয়েই কথা বলবে এ সিনেমা৷ এত গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত এই বিষয় নিয়ে এর আগে বহু বাংলা গল্প, উপন্যাস পড়লেন কোনো বাংলা সিনেমা কে কেন যেন এই বিষয়ে কথা বলতে দেখিনি কোনোদিন। সে কারণেই তাই পোস্টারের চমৎকারিত্ব এবং বিষয়ের স্বকীয়তায় এ সিনেমা প্রথমেই ইতিবাচক এক আবহ নিয়েই মস্তিষ্কে গেড়ে নিলো ঘাঁটি।

পোস্টারের চমৎকারিত্বে প্রথমেই মুগ্ধ হলাম! 

খেয়াল করলে দেখা যাবে, উপমহাদেশের সিনেমাগুলোতে রহস্যজনকভাবে 'মানব পাচার' ব্রাত্য থাকলেও আন্তর্জাতিক নির্মাণে এই বিষয় উপেক্ষিত না মোটেও। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যেতে পারে- দ্য স্টর্ম মেকারস এর কথা৷ যেই ডকুমেন্ট্রি ফিল্মে কম্বোডিয়ার আদম ব্যবসার বীভৎসতার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক প্রতিবাদই করা হয়েছিলো৷ 'দ্য হুইসলব্লোয়ার' এর কথাও আসবে আগেভাগে। বায়োগ্রাফিকাল এই ক্রাইম ড্রামার উপজীব্য ছিলেন ক্যাথরিন বলকোভাক, যিনি ইউএন এর এক বিশেষ পিসকিপার টিমের সাথে থাকা অবস্থায় সে টিমের মধ্যেই কিছু আদম ব্যবসায়ীকে খুঁজে পান। এরপর শুরু হয় তার লড়াই। আদম ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করার লড়াই। সেক্স ট্রাফিকিং ইন আমেরিকা কিংবা নেটফ্লিক্সের 'আই অ্যাম জেন ডো'তেও খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে মানব পাচারের উপাখ্যান। এই নির্মাণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বহু স্থানের আদম ব্যবসা নির্মুলও হয়েছে চিরতরে। সেদিক বিবেচনায় তাই আগ্রহ থাকবে 'শান' এর দিকেও। কতটুকু 'শান' দিতে পারে এ নির্মাণ, মানের মাপকাঠিতে কতটুকু করতে পারে বাজিমাত, তা নিয়ে খানিকটা কৌতূহল থাকা বোধহয় স্বাভাবিকও।

সিয়াম-পূজা জুটির দিকে চোখ থাকবে সবার! 

তবে এখানে খানিকটা সতর্কতাও আছে। মনে রাখতে হবে 'শান' আর্টফিল্ম না৷ পুরোদস্তুর কমার্শিয়াল ফিল্ম। সে হিসেবে গল্প কতটা থাকবে বাস্তব আর কতটা হবে অলীক কল্পনা, তা জানা নেই কারো। সাসপেন্স, রোমান্স, অ্যাকশনের মধ্যে মূল গল্প কতটুকু খোলতাই হবে, নাকি গল্পের গণ্ডি আড়ষ্ট হয়েই থেকে যাবে শেষতক... সেখানেও থাকবে চ্যালেঞ্জ। তবে বিচক্ষণতা হবে এটাই, যদি হয় কর্মাশিয়াল পটবয়লার এবং আর্টের মধ্যে এক সাবলীল ফিউশন। তাহলেই সর্বাঙ্গসুন্দর। স্বস্তি। 

পাশাপাশি আরেকটি বিষয় বলার। নির্মাতা এম রহিমের অভিষেক নির্মাণ এটি। বলা হয়ে থাকে, প্রথম সবকিছুই বিশেষ। সে হিসেবে নিজের প্রথম চলচ্চিত্রে তিনি ঠিকঠাকভাবে উতরে যাবেন কী না, সেদিকে যেমন থাকবে আগ্রহ, তেমনি এই নির্মাণে তার আস্তিনের তুরুপের তাস ওরফে সিয়াম-পূজা-তাসকিন কী চমক দেখান, চোখ থাকবে সেদিকেও। আপাতত নতুন বছরের অপেক্ষা। 'শান' এর শোণিত উপাখ্যান দেখার অপেক্ষা।

শুভকামনা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা