পোস্টারে নায়কের 'ডাকাবুকো' ইমেজ নেই, নায়িকার আবেদনময়ী উপস্থাপন নেই। আছে কিছু অজানা চরিত্র, আছে গল্পের খানিক আভাস দেয়ার দারুণ একটা চেষ্টা। যেন পোস্টারেই বলে দেয়া হয়েছে- চরিত্র নয়, এই সিনেমার নায়ক হচ্ছে গল্প! বাংলাদেশী সিনেমার বিচারে যেটা উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রম...

ইংরেজীতে একটা প্রবাদ আছে- 'ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কভার'। মলাট দেখেই বইয়ের গুণাগুণ বিচার করতে যাবেন না। বই নয়, জীবনের অনেক অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রবাদটা খাটানো যায়। কিন্তু প্রসঙ্গ যখন সিনেমা, তখন 'মলাট' ব্যাপারখানা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই মলাটের মধ্যে সিনেমার পোস্টার আছে, টিজার আছে, আছে ট্রেলার, এমনকি সিনেমার গানও। 

এই ২০২১ সালে আপনি যদি দর্শককে নিজের সিনেমার ব্যাপারে আগ্রহী করতে চান, আপনি যদি চান যে দর্শক তার সময় এবং টাকা খরচ করে, ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে সিনেমা হলে এসে আপনার সিনেমাটা দেখুক- তাহলে অবশ্যই আপনাকে জুৎসই মলাট বানাতে হবে। আপনার পোস্টারে দম থাকতে হবে, টিজারে আকর্ষণ থাকতে হবে, ট্রেলারে দর্শককে বেঁধে রাখার উপকরণ রাখতে হবে আপনাকে। নইলে সেই সিনেমা দেখতে লোকে যাবে না। দর্শকের ভেতরে সেই তাড়নাটাই তৈরি হবে না যে, এই সিনেমার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে, এটা দেখা দরকার। 

একটা সময় এদেশীয় সিনেমার পোস্টারের মধ্যে শৈল্পিকতার নান্দনিক উপস্থিতি ছিল। পটুয়া কামরুল হাসান, আবদুস সবর, নিতুন কুণ্ডুর মতো বিখ্যাত শিল্পীরা এককালে সিনেমার পোস্টার এঁকেছেন। গুণী পরিচালক সুভাষ দত্ত শিল্পী হিসেবেও দারুণ ছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা 'মুখ ও মুখোশ' এর পোস্টার তার আঁকা। অনেকেই শুনলে অবাক হবেন, সেই পাকিস্তান আমলেই পূর্ব বাংলায় সিনেমার পোস্টার ডিজাইনের জন্য দুটো এজেন্সি ছিল। 'কামার্ট' এবং 'এভারসীন পাবিসিটিং' নামের সেই দুটি এজেন্সি অনেক বিখ্যাত সিনেমার পোস্টারের সঙ্গে জড়িত ছিল। 

সিনেমার সোনালী যুগ হারানোর সাথে সাথে পোস্টারের সেই সুদিনও হারিয়েছে। চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার সময়টায় গলাকাটা পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া রাস্তাঘাটের সাক্ষী তো আমরাই। সেসব পোস্টার এখনও চোখে পড়ে। সিনেমার উন্নতি নেই, তাই বাড়তি করে সিনেমার পোস্টারে মনোযোগ দেয়ার সময়টাও নেই কারো। দায়সারাভাবে কিছু একটা ঢুকিয়ে দিলেই হলো। বাণিজ্যিক সিনেমা হলে তো অবস্থা আরও খারাপ। কাকরাইলের পরিবেশকেরা তো পারেন না, সিনেমার পুরো টিমের সবার ছবিই পোস্টারে ঢুকিয়ে দিতে। সেসব পোস্টার দেখে সিনেমার প্রতি আকর্ষণ বোধ হওয়া তো দূরের কথা, বরং বিরক্তি জন্মে। 

দেয়ালে ফেলুদার পোস্টার আঁকছেন স্বয়ং সত্যজিৎ!

অথচ সিনেমার পোস্টার দিয়েও কিন্তু চমৎকারভাবে গল্প বলা যায়। যেমনটা জহির রায়হানের 'জীবন থেকে নেয়া' সিনেমার পোস্টারে বিমূর্ত হয়ে উঠেছিল। সত্যজিৎ রায় তো ফেলুদা'র পোস্টারের ডিজাইন নিজেই করতেন৷ কারণ তার মনে হতো, পোস্টারের ভিশনটা তিনি ছাড়া আর কেউ ধরতে পারবে না। আর কাউকে তিনি বোঝাতে পারবেন না, লেখক বা পরিচালক হিসেবে পোস্টারে তিনি ঠিক কী কী উপাদান চাইছেন। 

বিশ্বজুড়ে ভালো নির্মাতাদের ভালো ভালো সিনেমাগুলোর দিকে তাকান, স্যার আলফ্রেড হিচকক থেকে স্টিভেন স্পিলবার্গ, ক্রিস্টোফার নোলান থেকে আসগর ফরহাদী বা মাজিদ মাজিদী হয়ে অনুরাগ কাশ্যপ- সবার সিনেমার পোস্টারে নিজেদের সিনেমা নিয়ে, সিনেমার বিষয়বস্তু নিয়ে একটা বার্তা দেয়া থাকে। সিনেমার পোস্টারটা নিজেই যেন ছোট্ট একটা সিনেমা হিসেবে আবির্ভূত হয় কখনও কখনও। 

'শান' নামে একটা বাংলাদেশী সিনেমার অফিসিয়াল পোস্টার রিলিজ হয়েছে গতকাল। একদমই মেইনস্ট্রিম কমার্শিয়াল ফিল্ম, জনরা হচ্ছে অ্যাকশন থ্রিলার। অথচ সিনেমার পোস্টার দেখে বোঝার উপায় নেই, এটা বাংলাদেশী একটা বাণিজ্যিক সিনেমার পোস্টার! অন্তত গত তিন দশকে বাংলা সিনেমার পোস্টারের যে কালচার, সেখানে শানের এই পোস্টার উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রম। এজন্যেই সম্ভবত পোস্টারটা চোখে পড়লো, বিস্ময়ে মুখটাও হাঁ হয়ে গেল সামান্য। 

সিনেমার বিষয়বস্তু হিউম্যান ট্রাফিকিং। সিনেমার পোস্টারে তাই সীমান্তের কাঁটাতারের সরব উপস্থিতি৷ পোস্টারে নায়কের মাচোগিরি নেই, নায়িকার আবেদনময়ী উপস্থাপন নেই। আছে কিছু অজানা চরিত্র। সবার চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা। একজনের কোমরের কাছে কাটা দাগ। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না, গল্পে যে পাচার দেখানো হবে, সেটা শুধু মানুষের নয়, মানব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গেরও। 

শান সিনেমার সেই পোস্টার

'শান' সিনেমায় সিয়ামের মতো তারকা অভিনেতা আছেন, তার সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন পূজা চেরি। পোস্টারে পরিচালক আর গল্পকারের পাশাপাশি তারকা এই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নামও উল্লেখ করা আছে। কিন্তু সেটা একদমই গৌন আকারে। যেন পোস্টারেই বলে দেয়া হয়েছে- চরিত্র নয়, এই সিনেমার নায়ক হচ্ছে গল্প! বাংলাদেশী সিনেমার বিচারে যেটা উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রম। এমন কিছু সবশেষ কবে বাংলা সিনেমায় দেখেছি, মনে করতে পারছি না। এমন কিছু দেখার প্রত্যাশাও যে ছিল না, সেটাও অকপটে স্বীকার করছি।

শানের এই পোস্টারের ডিজাইন করেছে 'অ্যানোনিমাস' নামের কলকাতার একটা এজেন্সি। একই টিম এর আগে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মজের মন্দার, গোলন্দাজ, রঘু ডাকাতের মতো সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজের পোস্টার বানিয়েছে। তাদের প্রতিটা কাজই একটার চেয়ে আরেকটা আলাদা। তবে শানের পোস্টার দিয়ে তারা সম্ভবত নিজেদেরকেই ছাড়িয়ে গেছে। সিনেমা হিসেবে 'শান' কেমন হবে, সেটা রিলিজ পেলেই বোঝা যাবে। কিন্তু দারুণ একটা টিজার উপহার দেয়ার পর পোস্টারে শানের টিম যে চমকটা দিলো, সেটা অনেকদিন মনে থাকবে। 

দেরীতে হলেও বাংলাদেশী নির্মাতা এবং প্রযোজকেরা বুঝতে পারছেন যে, সিনেমার ভালো একটা পোস্টার বানানোটা সিনেমা বানানোর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভালো জিনিস পেতে হলে একটা মিনিমাম বাজেট রাখতে হবে, সেটার পেছনে টাকা খরচ করতে হবে, প্রফেশনাল লোকজনের হাতে দায়িত্বটা তুলে দিতে হবে। একটা সিনেমা হয়তো বিশাল ব্যাপার, কিন্তু সেই সিনেমাটা দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য পোস্টারটাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পোস্টারকে সেই গুরুত্ব বাংলাদেশী নির্মাতারা দিতে শুরু করছেন, এটা দেখেই ভালো লাগছে। বাংলাদেশী সিনেমায় সুদিন হয়তো ফিরবে একদিন, তার আগে পোস্টার শিল্পে সুদিনয়া ফিরুক। আর তার যাত্রাটা নাহয় এই শানের হাত ধরেই শুরু হোক! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা