নির্মাতা নির্মাণের গল্পে নতুনত্ব না রাখলেও চমৎকারিত্ব আনলেন গল্প-বয়ানে। একেবারে 'র' কিংবা 'নগ্ন' করে তিনি গল্পকে ছাড়লেন জনস্রোতের মাঝখানে। নীল সোফাসেটে মিঠে খুনসুটি নেই, প্রমিত ভাষার বালাই নেই, চকচকে দৃশ্যায়নের ঝক্কি নেই, পুরোটাই একেবারে বন্য, আদিম। কান গরম করে দেয়া সব গালি, আলুথালু বিবস্ত্র চেহারার একগাদা অভিনেতা, রিয়েলিজম কিংবা রিয়েলিস্টিক ভিজ্যুয়ালের একেবারে চূড়ান্ত!

'রাজশাহী' নানা কারণে আলোচিত। আমের জন্যে।  রাজশাহী সিল্কের জন্যে। কালাই রুটি-বেগুন ভর্তার জন্যে। মানুষের স্নিগ্ধ ব্যবহারের জন্যে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্যেও। তবে এসবের পাশাপাশি এখন থেকে হয়তো বিশেষ এক নির্মাণের জন্যেও রাজশাহী যুগপৎভাবে আলোচিত হবে। যে নির্মাণের নাম- শাটিকাপ। রাজশাহীর প্রেক্ষাপটে রাজশাহীর নির্মাতার যে নির্মাণের সব কুশীলবও রাজশাহীর!  ভাষা রাজশাহীর। এমনকি এই নির্মাণের যে টাইটেল, অর্থাৎ- শাটিকাপ, সেটিও রাজশাহীর। যার অর্থ- ঘাপটি মেরে থাকা।

'শাটিকাপ' নামের এই নির্মাণ দেখার আগেই মুগ্ধ হয়েছিলাম চিন্তার অভিনবত্বে। যেকোনো নির্মাণে প্রোটাগনিস্ট তো অনেককিছুই হতে পারে, কিন্তু কোনো এক জনপদ যে একটা নির্মাণের প্রোটাগনিস্ট হতে পারে, এরকম ভাবনার নজির খুব বেশি কি আছে আশেপাশে? মনে হয় না। সেই প্রাথমিক মুগ্ধতা নিয়েই দেখতে বসলাম এই ওয়েব সিরিজ। যে সিরিজের পুরোটাজুড়ে চেনাপরিচিত গল্প, শুকনো মাদক, বিস্তর গালিগালাজ, পুলিশ-চোরের চোরপুলিশ, সিনেম্যাটোগ্রাফীর চূড়ান্ত। অনেকটা যেন শীতের জমাটি খেজুরগুড়! 

রাজশাহীর 'পঞ্চবটী' নামের জায়গায় মাদকের অবাধ আড্ডা। এই পঞ্চবটীতে বহুবছর ধরে মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন যেই শক্তিশালী মাফিয়া, একদিন তার দুই কাছের সাগরেদই তার ব্যবসার পুরো মাল লোপাট করে দেয়। বলাই বাহুল্য, এ ঘটনায় দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী মাফিয়া বিস্তর ক্ষুব্ধ হন। তিনি লোক লেলিয়ে দেন এই দুই বিশ্বাসঘাতককে ধরার জন্যে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই মাফিয়া যে লোকদের নিয়োগ দিলেন পলাতক চোরদের ধরার জন্যে, তারা আবার আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর লোক। ফলাফল- শুরু হয় পুলিশ-চোরের ইঁদুরদৌড়। গল্প এগোয়। এগোয় গালিগালাজ। এঁদোবস্তি। প্রশাসন। সর্ষে। সর্ষের ভূত।

যদি জিজ্ঞেস করা হয়, গল্পটি কেমন? কোনো কিছু না ভেবেই বলে দেয়া যাবে- এ গল্প আমাদের বিস্তর পরিচিত। 'নার্কো থ্রিলার' জঁরার এরকম গল্পের অজস্র নাটক-সিনেমার নিদর্শন আশেপাশে কম নেই মোটেও। বোধকরি নির্মাতাও এ বিষয়টি জানতেন। তাই তিনি গল্পে নতুনত্ব না রাখলেও চমৎকারিত্ব আনলেন গল্প-বয়ানে। একেবারে 'র' কিংবা 'নগ্ন' করে তিনি গল্পকে ছাড়লেন জনস্রোতের মাঝখানে। নীল সোফাসেটে মিঠে খুনসুটি নেই, প্রমিত ভাষার বালাই নেই, চকচকে দৃশ্যায়নের ঝক্কি নেই, পুরোটাই একেবারে বন্য, আদিম। কান গরম করে দেয়া সব গালি, আলুথালু বিবস্ত্র চেহারার একগাদা অভিনেতা, রিয়েলিজম কিংবা রিয়েলিস্টিক ভিজ্যুয়ালের একেবারে চূড়ান্ত! 

গল্পকে নগ্ন করে আনা হলো এখানে! 

নির্মাণের ন্যারেশন স্টাইলের মুগ্ধতা আরো বাড়লো অভিনয়ে এসে। জানতাম, এ নির্মাণে যারা মূখ্য কিংবা গৌন ভূমিকায় আছেন, তাদের কাউকেই চিনবো না৷ চিনিওনি। কিন্তু কথায় তো আছেই - বৃক্ষের পরিচয় ফলে। সেই ফলের ফলাফল পেলাম অভিনয়ে৷ কী দারুণ একেকজনের অভিনয়! পুরোপুরি পেশাদার। বাহুল্যবর্জিত। টানটান। যদিও অনেকের কাছে অভিনেতাদের নোংরা কথার ফুলঝুড়ি কিংবা আপত্তিকর চ্যাংড়ামিপনা খানিকটা অস্বস্তিরই লাগবে, কিন্তু নির্মাণের শুরুতেই সতর্কবার্তা দেখার পরেও যারা এ নির্মাণ দেখতে এসেছেন, গালিগালাজ-জনিত তাদের অভিযোগ যে মোটেও ধোপে টিকবেনা, তাও বলা যায় নির্দ্বিধায়। বউপাগল বাবু, দ্বিধাগ্রস্ত জয়নাল, ধীরস্থির হান্নান, ধূর্ত উত্তম কিংবা কিংকর্তব্যবিমুঢ় লিয়াকত... স্ক্রিনটাইম যতটুকুই থাকুক না কেন, নিজ নিজ গণ্ডি থেকে যে বিস্ময়কর অভিনয় প্রত্যেক শিল্পীর, বিস্ময় বেড়েছে সেখানেই। 

দুর্দান্ত সিনেম্যাটোগ্রাফী! 

আলাদা করে এই নির্মাণের নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামও ভূয়সী প্রশংসার যোগ্য। প্রথমত- গল্পবয়ানে বেশ সাহসী এক কন্ঠস্বর বজায় রেখেছেন শুরু থেকে শেষতক। এক্ষেত্রে একটা কথা স্পষ্ট করি। অকথ্য গালিগালাজ থাকলেই যে কোনো নির্মাণ সাহসী হয়, বিষয়টি মোটেও এমন না। তেমনি যেমন সত্যি না, নগ্নতা আনলেই শিল্প হয়। গল্পের সাথে সামঞ্জস্যবিধানে যেখানে যা আসবে, সেটা সেখানে দিতে পারাই মুন্সিয়ানা। এই নির্মাণে যেমন স্থানীয় খিস্তিখেউড় এসেছে বিস্তর, কিন্তু তা গল্পের সাথে দ্বৈরথে নামেনি, বরং গল্পকে সমর্থন দিয়েছে পুরোপুরি। মুগ্ধতা এখানেই।দ্বিতীয়ত- নির্মাণের বিকেন্দ্রীকরণ। সিনেমা-নাটকের দুর্দান্ত কাজ যে ঢাকার বাইরেও হতে পারে, ঢাকার বাইরের আনকোরা সব মুখ দিয়েও যে হতে পারে মনে রাখার মতন নির্মাণ, সে দৃষ্টান্ত 'শাটিকাপ' স্থাপন করে দিয়ে গিয়েছে প্রবল দাপটে।

আশা থাকবে, এখানের কুশীলবদের সিংহভাগকেই মূলস্রোতের নানা নির্মাণে দেখবো নিয়মিত। পাশাপাশি প্রত্যাশা থাকবে, এই নির্মাণের নির্মাতাও সামনে আরো চমকপ্রদ সব কাজ নিয়ে হাজির হবেন। দর্শককে বিস্মিত করবেন। করবেন মুগ্ধও! শুভকামনা।  


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা