মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারের রিহার্সেলে তরুণ শাকিব খানের সাথে নাচতে চাইছিল না কেউ। শাকিব তখন চুপচাপ এক কোণে বসে ছিলেন। শ্রাবন্তী তার কাছে গিয়েই হুংকার দিলেন, 'অ্যাই ছেলে, উঠো! চলো নাচি!' এরপর তো ইতিহাস। এটাই শ্রাবন্তী...

ইপশিতা শবনম শ্রাবন্তী। এই নামটি শুনলেই বা কোথাও দেখলেই একটি মায়াবী মিষ্টি মেয়ের ছবি আমাদের চোখের সামনে উঠে আসে। অনেক বছর ধরেই লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনের জমকালো দুনিয়া থেকে অনেকটা দূরে তিনি। তবুও তার ভক্তদের মনের মাঝে এখনো অভিনয় দক্ষতা, মিষ্টি হাসি আর অসাধারন সৌন্দর্য্য নিয়ে তিনি ভালোলাগা আর ভালোবাসার একটা জায়গা ধরে রেখেছেন। আজ একসময়ের এই তুমুল জনপ্রিয় এবং আলোচিত অভিনেত্রীর জন্মদিন। 

ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক জগতের সাথে শ্রাবন্তীর চেনাজানা। মাত্র ছয় বছর বয়সে ফেরদৌস হাসানের 'ফেরা' নাটক দিয়ে অভিনয়ের হাতেখড়ি। তবে দর্শকদের কাছে প্রথমবার নজর কাড়েন হেনোলাক্সের বিজ্ঞাপন দিয়ে। বিজ্ঞাপনে তার সৌন্দর্য্য এবং হাসি মুগ্ধ করেছিলো সবাইকে। তারপরে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির একটি গানে মডেল হওয়ার সুবাদে ভক্তদের মনের আরো কাছাকাছি চলে আসেন শ্রাবন্তী। বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনে এই লাস্যময়ী তারকা কে দেখে তখন মুগ্ধ ছিলো সবাই। এছাড়া পরবর্তীতে কোমল পানীয় ইউরো লেমনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার ধাপ আরো অনেকটা বেড়ে যায়। অল্প সময়েই মিডিয়া জগতে শ্রাবন্তী হয়ে উঠেন এক আলোচিত নাম।

পরিনত বয়সে মতিউর রহমান গাজীপুরীর 'ভালোবাসা তুমি' নাটকের মধ্যে দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু। বিটিভিতে প্রচারিত ‘পাথরে জলপ্রপাত’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনেত্রী হিসেবে জায়গা করে নেন তিনি। ২০০১ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর 'কানামাছি' নাটক দিয়ে তিনি অভিনেত্রী হিসেবে আরেক ধাপ এগিয়ে যান।

ইপশিতা শবনম শ্রাবন্তী

তবে আক্ষরিক অর্থে জনপ্রিয়তার দেখা পান ২০০৩ সালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘৫১ বর্তী’ নাটকের মাধ্যমে। অপি করিম, মাহফুজ আহমেদ, শহীদুজ্জামান সেলিম, ফারহানা মিঠু, দিলারা জামান, ফজলুর রহমান বাবু'র মতো অসাধারন দক্ষ অভিনেতা অভিনেত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও আলাদাভাবে নজর কাড়েন বাড়ির ছোট মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করা শ্রাবন্তী। তার অভিনয় দক্ষতা জানান দেয় যে তিনি সব চরিত্রেই মানানসই।

২০০৪ সালে ওই বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই ধারাবাহিক নাটক 'জোছনার ফুল' এবং 'নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল'তে প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করে হয়ে শ্রাবন্তী হয়ে উঠেছিলেন ওই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তরুন প্রজন্মের পাশাপাশি সব শ্রেনীর দর্শকদের কাছেই তার জনপ্রিয়তা রীতিমতো চমক জাগানিয়া ছিলো।

২০০৫ সালে ক্যারিয়ারের একমাত্র চলচ্চিত্র ‘রং নাম্বার’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় নায়িকা হিসেবে নাম লেখান শ্রাবন্তী। মতিন রহমান পরিচালিত ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত এই সিনেমায় তখনকার জনপ্রিয় নায়ক রিয়াজের সাথে জুটি বাধেন তিনি। টেলিভিশনের নায়িকারা তখনকার সময়ে বানিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করতে স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করতেন না। তবে শ্রাবন্তী ছিলেন ব্যতিক্রম। নাচ,গান, রোমান্স, বিরহ সব মিলিয়ে পুরোপুরি বানিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সিনেমার একটি গান এতোটাই জনপ্রিয় হয়েছিলো যে আজো সেই জনপ্রিয়তা একই রকম। বলা যায় সেই এক 'প্রেমে পড়েছে মন' গান দিয়েই বাজিমাৎ করেছিলেন তৎকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী।

প্রথম সিনেমার ব্যাপক সাড়া পাবার পরে অবশ্য আর তাকে সিনেমাতে আর দেখা যায় নি। ওই সময় টেলিভিশন নাটকেই ছিল তার সব ব্যস্ততা, বাংলা নাটক জগতে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় এবং ব্যস্ত তারকা। মোহন খান, আহমেদ ইউসুফ সাবের, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অরুণ চৌধুরী, আকরাম খান,  চয়নিকা চৌধুরী, শাকুর মজিদ সহ সেই সময়ের প্রায় সকল আলোচিত এবং প্রতিভাবান নির্মাতাদের নাটকে অভিনয় করেছেন শ্রাবন্তী।

হৃদয়ের একুল ওকুল, ভাতঘুম, অনুর একদিন, বন্ধু এবং ভালোবাসা, মনোবীক্ষণ যন্ত্র, রৌদ্র ছায়ার খেলা, বাড়ির নাম শান্তিকুঞ্জ, হাসি বাড়ি কান্না বাড়ি, অপু দ্য গ্রেট, নীড়, তুলিতে আঁকা স্বপ্ন, সুইট ফ্যামিলি, বহুরুপী, গোলাপ কেন কালো, ট্রাইএঙ্গেল, লাল টি শার্ট  সহ বেশিকিছু অসাধারণ জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেন শ্রাবন্তী।

নাটকে জুটি বেঁধে সফল হয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা মাহফুজ আহমেদের সঙ্গে। এছাড়া শাহেদের সঙ্গেও তার জুটি আলোচনায় ছিলো। রিয়াজের সঙ্গেও একটা দারুন জুটি গড়ে উঠেছিল। তবে ২০০৮/২০০৯ সালের দিকেই আস্তে আস্তে অনিয়মিত হতে থাকেন শ্রাবন্তী। সর্বশেষ ২০১০ সালের ‘ডালিম কুমার’ নাটকে তাকে শেষবার অভিনয় করতে দেখা যায়। স্বল্প কালীন ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি পেয়েছিলেন দর্শক জরিপে মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার সহ আরো অনেক পুরস্কার।

ব্যক্তিজীবনে অসাধারন বন্ধুত্বপূর্ণ এবং হাসিখুশি মানুষ শ্রাবন্তী। মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রুম্মান রশীদ খান একবার তার সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শ্রাবন্তী সম্পর্কে একটি ঘটনা শেয়ার করেছিলেন। ঘটনাটি হচ্ছে- তখন মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার ২০০৩ এর মহড়া চলছিল তখন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে (২০০৪ সালে)। শ্রদ্ধেয় হানিফ সংকেত দা দেশীয় সুর ব্যবহার করে ৫টি জুটি নিয়ে একটি পরিবেশনার পরিকল্পনা করলেন। ছোট ও বড় পর্দা মিলিয়ে ১০ জন তারকা।

কবির বকুল ভাই বসলেন কার সাথে কে জুটি হতে পারে, সেটা নিয়ে। তখন অমুক অভিনেত্রী বললেন, অমুক’কে আমার সাথে দিন। ওর সাথে আমার জুটি জনপ্রিয়। আরেকজন বললেন, অমুককে আমার সাথে দিন। ও নাচে ভালো। এভাবেই সবাই যে যার মত নায়ক পছন্দ করে নিলেন। বাকি রইলেন শুধু শ্রাবন্তী। আর নায়কদের মধ্যে রয়ে গেলেন শুধু শাকিব খান। তার সাথে কেউ নাচতে চাইলেন না! কিন্তু শ্রাবন্তী বললেন, ঠিক আছে, আমি এই ছেলের সাথেই নাচবো। কেউ কেউ হাসলেন (!)। এই ছেলে, মানে, শাকিব খান তখন চুপচাপ এক কোণে বসে ছিলেন। শ্রাবন্তী তার কাছে গিয়েই হুংকার, অ্যাই ছেলে, উঠো! চলো নাচি! এরপর তো ইতিহাস। এটাই শ্রাবন্তী। মানুষকে আপন করে নেয়া বা সবার সাথেই মিশে যাবার অসাধারন গুন নিয়েই শ্রাবন্তী।

শ্রাবন্তী। ছবি- প্রথম আলো

ব্যক্তিজীবনে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন গায়ক এবং অভিনেতা পার্থ বড়ুয়াকে। তবে প্রেমের সেই বিয়ে টেকেনি বেশিদিন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খোরশেদ আলমের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘর বাঁধেন শ্রাবন্তী। খোরশেদ আলম স্যাটেলাইট চ্যানেল এনটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

২০১১ সালে জুন মাসে তাদের সংসারে আসে এক কন্যাসন্তান। কাজে অনিয়মিত হয়ে যাবার কারন হিসেবে তখন একটি টেলিভিশনের এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, "বাচ্চা রেখে কোথাও গিয়ে শ্যুটিং করতে ভালো লাগে না। আমি পারি না। কাজ করাটা কমিটমেন্টের ব্যাপার। কারও সঙ্গে ফাজলামি করতে পারব না। পরে দু-একটা কাজ করতে পারি, তবে তা নিশ্চিত নই।"

একসময় স্বামী সন্তান নিয়ে আমেরিকায় চলে যান শ্রাবন্তী। এখন সংসার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করছেন শ্রাবন্তী। কিছুদিন আগে আমেরিকায় জামাইকায় অবস্থিত ‘অ্যালেন স্কুল অব হেলথ সাইসেন্স’ থেকে মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্টের উপর এক বছর মেয়াদী একটি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। দ্রুতই সব কিছু সামলে আবার সুন্দর এক সময়ে ফিরবেন এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী সেই কামনা রইলো।

খুব অল্প সময়ে কোনো টিভি অভিনেত্রী শ্রাবন্তীর মতো জনপ্রিয়তা যেমন পান নি তেমনি আবার অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়ে এত দ্রুত অনিয়মিতও হয়ে যান নি। ধুমকেতুর মতোই হাজির হয়েছিলেন তিনি আমাদের মিডিয়া জগতে। এই অল্প সময়ের জনপ্রিয়তার মধ্য দিয়েই তিনি রয়ে যাবেন দর্শকদের মাঝে। ক্যারিয়ারের শুরুতে শ্রাবন্তী এক সাক্ষাৎকার বলেছিলেন, কোনো একদিন মানুষ তাকে স্মরণ করে বলবে, শ্রাবন্তী নামের মেয়েটি অন্যরকম ছিল, খুব ভাল অভিনয় করতো সে। বাস্তবে তাই ঘটেছে। তবে টেলিভিশনের পর্দায় আবারো ভিন্নধর্মী চরিত্রে অসাধারন অভিনয় দক্ষতা নিয়ে হাজির হবেন মিষ্টি হাসির লাস্যময়ী এই অভিনেত্রী এটাই তার ভক্তদের চাওয়া।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা