রাম-সীতার এই আখ্যানে খলনায়ক অর্থাৎ 'রাবন'টি ঠিক কে, তা জানা হয়ে ওঠেনা। কারণ, ভাবনার মাঝেই আসে বাণপ্রস্থ। যেখানে দমকা বাতাস ওঠে। যে বাতাসে আচমকা ওড়ে খাতার ছেঁড়া পৃষ্ঠা। যে পৃষ্ঠায় রাম লিখেছিলো সীতার কাছে অশ্রুসজল এক চিঠি। যে চিঠি জেলখানার চিঠি। যে চিঠি পুনর্জন্মে হাত ধরার প্রতিশ্রুতিও...

একটা গল্প। দু'জন মানুষ। হিন্দু একজন। আরেকজন মুসলিম। ধনী-গরীব। আকাশ-মাটি। তেল, জল। তারা মেশে না। মেশার কথাও না। তারা তড়পায়। ভিন্ন স্থানাঙ্কে, ভিন্ন গ্রহে। তবু তো গল্প। ভাবি, তেল-জলের দুই মানুষ, আচমকা যদি আসে সেই বিন্দুতে, যে বিন্দুতে মিশে লীন হয় হৃদয়, হয় হরিহর আত্মা, তাহলে কেমন হয়? যদি তাদের প্রেম হয়, যদি একই নিয়তি এফোঁড়ওফোঁড় করে তাদের,  গল্পটা কি জমে? জমলেও কতটুকু? 

জানি, এরকম অসম প্রেমের বহু সিনেমা সেই হাঁটুর বয়স থেকেই দেখেছি আমরা। গোঁফের রেখা ওঠা বয়সে পড়েছি বুদ্ধদেব, সমরেশের রোমান্টিক সব বইও। এই উদ্ভট সমীকরণের অঙ্কও আমাদের বেশ চেনা। তবু চেনা গল্পেই যদি কতকটা পাই অচেনা সুর,  চেনা আকাশের শেষপ্রান্তে মন খারাপের মেঘ, সেটাও বা কি অপ্রাপ্তির? বোধহয় না। তেলেগু সিনেমা 'সীতা রামাম'ও বোধহয় সে কারণেই বেশ ভালো লাগলো। জানা পরিণতি, চেনা সুর। তবুও, চমকাই। বুঝতে পারি- ভেতরটা এখনো ঝুরঝুরে মাটি। বৃষ্টি হলেই কাদা। 

দুলকার সালমানের দ্বিতীয় তেলেগু সিনেমা, ম্রুণাল ঠাকুরের প্রথম তেলেগু সিনেমা, সিনেমাটার মুক্তিও এমন এক সময়ে, যখন তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বড় বড় তারকারা ঠিক জমাতে পারছেন না। এই অনিশ্চয়তার ডামাডোলে তাই ছিলো ভয়। 'সীতা রামাম' কেমন ব্যবসা করবে? কতটুকুই বা জাগবে  ধূলিধূসর থিয়েটার? প্রশ্ন ছিলো অজস্র। ছিলো চাপা ভয়ও। তবে, সেসব প্রশ্ন ও ভয় 'পরাজয়' এর স্বাদ নিয়ে হয়েছে নিকেশও। পাশাপাশি, বক্স অফিসে যেভাবে সাড়া ফেলেছে 'সীতা রামাম', মুগ্ধতা তো আছেই, জেগেছে বিস্ময়ও। 

বিস্ময় হবে নাও বা কেন! এ সিনেমায় তো এমন কিছু নেই, যা দর্শক আগে দেখেনি। কাশ্মীর, টেরোরিস্ট, হিন্দু-মুসলিম প্রেম, নায়কের হিরোইজম, নায়িকার গ্ল্যামার, ভালো গান, চোখজুড়ানো দৃশ্য, শেষে ভেজা চোখ... মন ছুঁয়ে যেতে যেসব উপাদান বরাবরই ধন্বন্তরি, এই সিনেমায় সেসব উপাদানের কমতি নেই একরত্তি। সিনেমা দেখতে দেখতে কিছু অংশে 'বীর জারা'র সাথে যোগসূত্র খুঁজে পাবে দর্শক। 'এ হিডেন লাইফ' এর কথাও মনে পড়বে কখনো কখনো। মাস্টার ফিল্মমেকার মনি রত্নমের ডিরেকশনের কথাও উঁকি দেবে মনে। যেসব রোমান্টিক সিনেমা দেখে ক্রমশ বড় হওয়া, বেড়ে ওঠা... সেসব সিনেমা-স্মৃতির মুমূর্ষু অলিগলিতে হাঁটিয়েই ক্লান্ত করবে 'সীতা রামাম' এর অদ্ভুত স্নিগ্ধ টেমপ্লেট। 

সীতা-রামাম এর চেনা টেমপ্লেটে অচেনা আখ্যান

যদিও এ টেমপ্লেটের রং-তুলি পরিচিতই মনে হবে, হাতের তালুর মতই লাগবে সব৷ কিন্তু গল্পবয়ান? সেখানেই নতুনত্ব। মুন্সিয়ানাও ঠিক সেখানেই। বলা হয়ে থাকে- পৃথিবীর সব গল্প নাকি বলা হয়ে গিয়েছে। সে প্রসঙ্গেই এক মার্কিন লেখক দাবী করেছিলেন- গল্প হয়তো একভাবে বলা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আরো সহস্রভাবে সে গল্প বলা বাকি। অর্থাৎ, চেনা রান্নাই অচেনা হতে পারে মশলার আড়ম্বরে। যে বিষয়টিই খুব স্পষ্টভাবে প্রকট 'সীতা রামাম' এ। নির্মাতা হনু রাঘাবাপুরী খুব যত্ন নিয়েই সাজান এখানের প্রতিটি প্রেক্ষাপট। শ্রীনগরের ডাল লেকে ভাসতে থাকা রঙিন হাউজ বোট এখানে যেমন মুগ্ধ করে, একই ভূখণ্ডের চরমপন্থীদের দৌরাত্ম্য দেখেও শিউরে ওঠে মগজ। সত্যজিৎ রায়ের 'ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর' বইয়ের কথাই যেন পড়ে মনে। স্বর্গীয় সৌন্দর্য আর শুনশান সহিংসতা... কাশ্মীরের দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্য যেভাবে মুদ্রার দুই পিঠের মত উঠে আসে এ নির্মাণে, যেভাবে আসে চরিত্রদের বিস্তার, বিস্তৃতি ও বিশ্লেষণ, বুঝি, নির্মাতা  বোঝাতে চাচ্ছেন এটাই- যত্ন নিয়ে গল্প বলায় কসুর তিনি করবেন না মোটেও। 

যত্ন নিয়ে গল্প বলায় কসুর করেননি নির্মাতা 

যদিও খুব যত্ন নিয়ে বানানো 'সীতা রামাম' এ আক্ষেপের জায়গাও আছে কিছু। এই সিনেমার যে গাঁথুনি, সেখানে 'নো ননসেন্স ড্রামা' রাখা যেতে পারতো। অপ্রয়োজনীয় কমিক রিলিফ, মাঝের কিছু পাজল, রানটাইমের স্থুলতা... কমানো যেতে পারতো। প্রেমের যে গল্প, সে গল্পের রাশ আরেকটু কড়াভাবে টানলে খারাপ হোতোনা। কিছু চরিত্র, কিছু ঘটনা... আরেকটু স্পষ্ট করা যেতো। কিছু বিষয় 'টিপিক্যাল কমার্শিয়াল ফিল্ম' এর মত মিলিয়ে না দেওয়াটাই বোধহয় হতো স্বস্তির।  

তবে এ সবই ব্যক্তিগত মতামত। ব্যক্তিগত স্বগতোক্তি। এবং এইসব চাপা আক্ষেপ থাকা সত্বেও 'সীতা রামাম' খুব প্রিয়, সযত্নে মনে রাখার মত কাজ৷ দুলকার সালমান আর ম্রুণাল ঠাকুরের গভীর রসায়ন, মিথোলজি আর রিয়েলিটির মিশেল, সেট ডিজাইন থেকে সিনেম্যাটোগ্রাফী, অদ্ভুত সুন্দর কিছু গান, শেষাংশের যবনিকাপাত...  কিছু সিনেমা এমন আত্মবিশ্বাসী, তারা জানে, তারা মুগ্ধ করবে। জানতো 'সীতা রামাম'ও। যে কারণেই এ সিনেমা অবলীলায় চলে আসে সে তালিকায়, যে তালিকায় মাঝেমধ্যেই আড়ি পাতি, শুনি প্রিয় নির্মাণের ফিসফাস। 

তুরস্কের বিখ্যাত কবি নজিম হিকমত 'জেলখানার চিঠি' কবিতায় লিখেছিলেন-

তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার
আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে৷ 
তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী। 
বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু 
বড়জোর এক বছর।

'বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর' কথাটা হয়তো অনেকের জন্যেই সত্যি, কিন্তু যাদের জন্যে মোটেও সত্যি না, তাদের প্রতিভূ হয়ে অপেক্ষা করা সীতা আর জল্লাদের রোমশ হাতের নীচে ওষ্ঠাগত রামের যে পরিণতি, তারই মাঝখানে সবার অগোচরে মঞ্চস্থ  হয় যে প্রণয়-আখ্যান, যে আখ্যানের আসা-যাওয়ার মাঝে মেশে মানচিত্রের গভীর দীর্ঘশ্বাস, সেটিই হয়তো 'সীতা রামাম।' এই যে গভীর দীর্ঘশ্বাস, এ দীর্ঘশ্বাসের প্রাচীরে অযোধ্যার রামচন্দ্র কোথাও এসে যেন মেশে মাদ্রাজ রেজিমেন্টের রামের সাথে। অগ্নিপরীক্ষা আর দুই দশকের হাপিত্যেশে মেশে সীতা আর সীতা মহালক্ষীর গল্পও। যদিও রাম-সীতার এ আখ্যানে খলনায়ক অর্থাৎ 'রাবন'টি ঠিক কে, তা জানা হয়ে ওঠেনা। কারণ, ভাবনার মাঝেই আসে বাণপ্রস্থ। যেখানে দমকা বাতাস ওঠে। যে বাতাসে আচমকা ওড়ে খাতার ছেঁড়া পৃষ্ঠা। যে পৃষ্ঠায় রাম লিখেছিলো সীতার কাছে অশ্রুসজল এক চিঠি। যে চিঠি জেলখানার চিঠি। যে চিঠি পুনর্জন্মে হাত ধরার প্রতিশ্রুতিও।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা