প্রত্যাশা থাকবে, প্রথাগত ফুল-পাখি-লতাপাতার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশি নির্মাতারা 'আউট অব বক্স' কনসেপ্টের সিনেমা নিয়ে ভাববেন। দূষণ, দুর্নীতি, ধর্মনীতি, প্রশ্নফাঁস... সামাজিক সমস্যার তো অভাব নেই আমাদের। দরকার শুধু সে ইস্যুতে কমার্শিয়াল এলিমেন্টস যুক্ত করে চমকপ্রদ গল্প বলা। সেটা যদি সম্ভব হয়, তাহলেই হবে চমৎকারিত্ব!

আয়ুষ্মান খুরানা মানেই আজকাল হয়ে দাঁড়িয়েছে 'আউট অব বক্স' সিনেমার সমার্থক শব্দ। সিনেমাগুলোও এমন, সেখানে কমার্শিয়াল মালমশলা- লাউড ডায়লগস, চিজি রোমান্স, হালকাপাতলা সাসপেন্স, ঝাঁ-চকচকে গান যেমন থাকবে, আবার সেখানে প্রকট হবে সোশ্যাল ট্যাবুও। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া 'চণ্ডীগড় কারে আশিকী' তেও যেমন রোমান্টিক কমেডির মধ্যে আলগোছে উঠে এলো এলজিবিটি ইস্যু। ট্রান্স জেন্ডার এক মেয়ের সাথে আয়ুষ্মানের প্রেম, এবং যাপিত বৈষম্য। এসবে সওয়ার হয়েই পুরো নির্মাণ। 

আয়ুষ্মান খুরানার সিনেমাগুলোর বিশেষ এই প্যাটার্ণ বেশ উপভোগ্যও। গত বছরেই যেমন তিনি অভিনয় করেছিলেন- শুভ মঙ্গল জাদা সাবধান' এ। সেখানে 'সমকামী' এক পুরুষের চরিত্রে অভিনয় করে বেশ সাড়া ফেলেছিলেন আয়ুষ্মান। বেশ ব্যবসাসফলও হয়েছিলো সিনেমাটি। কিংবা যদি বলা হয় 'ভিকি ডোনার' সিনেমার কথা, 'স্পার্ম ডোনেশন' এর এই গুরুত্বপূর্ণ অথচ বিতর্কিত ইস্যুকে যেভাবে আন-অর্থোডক্স ন্যারেশনে নিয়ে আসা হয়েছিলো সামনে, অনবদ্য। আবার 'বাধাই হো', 'বালা' কিংবা 'আর্টিকেল ১৫'... এই সিনেমাগুলোতেও ক্রমশ এসেছে সামাজিক নানা সমস্যার সাত-সতেরো, কমার্শিয়াল জমকালো মোড়কে! 

আয়ুষ্মান খুরানা মানেই 'আউট অব বক্স' সিনেমা! 

এ বছরে মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় 'মিমি' সিনেমাতেও যেমন 'সারোগেট মাদার' থিমের দারুণ এক কমার্শিয়াল পটবয়লার হলো। নাচ, গান, কমেডি সবই থাকলো। আলতো করে সমসাময়িক এক বিষয়কেও নিয়ে আসা হলো সামনে। কিংবা তাপসী পান্নুর 'রেশমি রকেট' অথবা অক্ষয় কুমারের 'প্যাডম্যান',  'টয়লেটঃ এক প্রেম কথা' সিনেমাগুলোতেও রইলো সামাজিক নানা কুসংস্কার-অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ৷ রইলো সমাজ সংস্কার। নির্মাণগুলোতে দর্শককে আকৃষ্ট করার মতন মালমশলাও রইলো প্রচুর। এই যে কমার্শিয়াল রঙিন মোড়কে সামাজিক বার্তা... এই কাজটিতে বলিউড বরাবরই সিদ্ধহস্ত। সিরিয়াস কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বলার ভঙ্গি মোটেও সিরিয়াস না। হালকা চালে 'সহজ কথা যায় যে বলা সহজে' নীতিতে এগোনো এই যে সিনেমাগুলো, সেসব দেখে অন্য ইন্ডাস্ট্রি চাইলে খানিকটা ঈর্ষান্বিত হতেই পারে। 

'সারোগেট মাদার' থিমে নির্মিত হয়েছিলো 'মিমি!' 

ঠিক এ জাতীয় নির্মাণগুলোর অভাব জনিত দৈন্যদশা দেখতে পাই নিজের দেশের ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালে। এদেশে প্রতিবছরই কিছু না কিছু নির্মাণ হয়। দেশপ্রেম, অ্যাকশন, কমেডি নিয়ে হয় বহুকিছু। কিন্তু সেসব নির্মাণে ফান এবং সিরিয়াসনেসের মিশেল থাকে না, এই দুই অনুষঙ্গকে ব্লেন্ড করে বানানো কোনো সামাজিক বার্তার প্রচার থাকে না। যেটা কমেডি, সেটা শুধুই কমেডি। আর যেটা গম্ভীর, সেটা পুরোপুরি গম্ভীর। আর যদি বলা হয় স্যাটায়ার, হিউমার, ডার্ক কমেডির কথা...এসব নিয়ে এদেশে কথা বলাও আরেক বিড়ম্বনা। নির্মাতা বানাবেন একরকম, অডিয়েন্স বুঝবে আরেকরকম...মধ্যিখান দিয়ে হট্টগোল৷ অথচ চাইলেই কিন্তু ব্যালেন্স করে বানানো যায় সব। উদাহরণ হিসেবে পড়ে রইলো নাহয় বলিউডের সিনেমাগুলোই। 

প্রখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটক বলতেন- 

সামাজিক বার্তা প্রচারের জন্যে সিনেমার চেয়ে বড় কোনো মাধ্যম এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। 

এ কথাকে ধ্রুবসত্যি মেনেই সময়ের নানা প্রকোষ্ঠে আমরা দেখেছি, সমাজ ও সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে কটাক্ষ করে বানানো অগুনতি নির্মাণ। একটা সময়ে যখন 'সামাজিক বার্তা'নির্ভর সিনেমাগুলো তাদের আপেক্ষিকতা হারিয়েছে, তখন এসেছে বানিজ্যিক মালমশলার মোড়কে যাপিত সব সোশ্যাল কনটেক্সট। বিশেষ এ স্ট্রাকচার রাতারাতি হয়েছে জনপ্রিয়। যে স্ট্রাকচারে বলিউড এখনো বানাচ্ছে দর্শক-প্রিয় একেকটা নির্মাণ। প্রত্যাশা থাকবে, প্রথাগত ফুল-পাখি-লতাপাতার বাইরে বাংলাদেশের নির্মাতারাও এরকম 'আউট অব বক্স' কনসেপ্ট নিয়ে ভাববেন। দূষণ, দুর্নীতি, ধর্মনীতি, প্রশ্নফাঁস... সামাজিক সমস্যার তো অভাব নেই আমাদের। দরকার শুধু সে ইস্যুতে কমার্শিয়াল এলিমেন্টস যুক্ত করে চমকপ্রদ গল্প বলা। সেটা যদি সম্ভব হয়, তাহলেই হবে চমৎকারিত্ব। এভাবেই নির্মাণ পৌঁছোবে বহু মানুষের কাছে। এবং ঠিক তখনই নির্মাণের উদ্দেশ্যও হবে সফল। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা