বাঙালির কাছে সৌমিত্রের মতো করে কেউই সেভাবে ফেলুদা হিসেবে জায়গা করে নিতে পারেননি। সব্যসাচী কিছুটা প্রভাব ফেললেও সৌমিত্র আর ফেলুদা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে আজও...

সেই পঞ্চাশের দশকে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন কেড়েছিলেন যে অভিনেতা, সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এতো বছর পরেও অভিনেতা হিসেবে এতোটুকু ম্লান হননি বরং একের পর এক সফল সিনেমাতে অভিনয় দক্ষতার ছাপ রেখে চলেছিলেন প্রতিনিয়ত। ৮৫ বছর বয়সে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চির প্রস্থানের মাধ্যমে এই দীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয় যাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটেছে দুই মাস আগে।। দুই বাংলা তো বটেই তার এই বিদায় শোক এবং শূন্যতা নিয়ে এসেছে পুরো বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতে।  

১৯৩৫ সালের ১৯শে জানুয়ারি নদিয়ায় জন্ম গ্রহন করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। নিজ বাড়িতে নাট্যচর্চার পরিবেশ ছিলো তাই অভিনয় বা আবৃত্তি বিষয়টার সাথে ভালোবাসা ছিলো বরাবরই। সময়ের ধারাবাহিকতায় দেশভাগ দেখেছেন আবার এক মিলেনিয়াম থেকে আর এক মিলেনিয়ামে যাত্রার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। মঞ্চ, টেলিভিশন এবং সিনেমা বিনোদনের প্রায় সব মাধ্যমেই তাঁর নিয়মিত কাজে বয়স কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। শুধু পূর্ব বা বর্তমান প্রজন্ম নয়, আগামী আরও কয়েকটি প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা হিসেবে রয়ে যাবেন অনন্তকাল।  

বাংলা চলচ্চিত্র জগতে এই কিংবদন্তি অভিনেতা কিন্তু প্রথমে অভিনেতা হিসেবে না বরং অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঘোষক হিসেবেই পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন। তাঁর ভরাট এবং গম্ভীর কণ্ঠস্বরের প্রশংসা পেতেন অল্প বয়স থেকেই। তার উপর কলেজ জীবন থেকেই মঞ্চাভিনয়ে হাতেখড়ি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের, সময়ের সাথে সাথে যা তাঁর বাচিক দক্ষতা আরও বাড়িয়ে তোলে। অভিনয়ে তাঁর প্রথম গুরু ছিলেন অহীন্দ্র চৌধুরী। কিন্তু অভিনেতা হিসেবেই যে জীবনে তিনি এগোতে চান, সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মঞ্চে শিশির ভাদুড়ির একটি নাটক দেখার পরে। কিন্তু যদি তাঁর পেশাগত জীবন ধরা যায়, তবে মঞ্চ বা পর্দা কোনওটিই নয়, রেডিওই ছিলো এই প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার প্রথম পেশাগত মাধ্যম। 

ছোটবেলা থেকেই নাটকে অভিনয় করতে শুরু করেন তিনি। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে সৌমিত্র ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়েই স্নাতকোত্তর করেন সৌমিত্র। কলেজের ফাইনাল ইয়ারে হঠাৎই একদিন মঞ্চে শিশির ভাদুরির নাটক দেখার সুযোগ হয়। জীবনের মোড় ঘুরে যায় সে দিনই। পুরোদস্তুর নাটকে মনোনিবেশ করেন তিনি। তাঁর থিয়েটার কেরিয়ারে চিরকাল শিশির ভাদুরিকে গুরুর মান্যতা দিয়ে এসেছেন সৌমিত্র। নিজেও বলেছেন, অদ্ভুত এক বন্ধুত্ব ছিল তাঁদের মধ্যে। 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর প্রথম সিনেমা হতে পারতো ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’। সব কথাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্ক্রিন টেস্টে বাদ পড়ে যান সৌমিত্র। তাঁর জায়গায় নেওয়া হয় অসীম কুমারকে। ১৯৫৬ সালে যখন সত্যজিৎ রায় ‘অপরাজিত’-র জন্য নতুন মুখের সন্ধান করছেন, তখনই প্রথম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হয় এই বিশ্ববরেণ্য পরিচালকের। তখন বছর ২০ বয়স অভিনেতার, সদ্য কলেজ পাশ করেছেন। সৌমিত্রকে দেখে অপু হিসেবে পছন্দও হয়ে গিয়েছিলো সত্যজিৎ রায়ের। কিন্তু তখন ‘অপরাজিত’র অপু চরিত্রে তিনি আরও কম বয়সী কাউকে চেয়েছিলেন। তারপর ১৯৫৮ সালে সৌমিত্র গিয়েছেন সত্যজিতের ‘জলসাঘর’ সিনেমার শুটিং দেখতে। সেখানেই বাংলা সিনেমা জগতের অন্য এক কিংবদন্তি ছবি বিশ্বাসের কাছে সৌমিত্রকে সত্যজিৎ পরিচয় করান অনেকটা এই ভাবে, ‘এই হল সৌমিত্র। আমার পরবর্তী সিনেমা ‘অপুর সংসার’ এ অপু চরিত্র করছে।’

তারপরের অধ্যায়টা শুধুই ইতিহাস তৈরীর। ‘অপুর সংসার’ সিনেমার মধ্য দিয়ে সিনেমার জগতে হাতেখড়ি হয় সৌমিত্রের। প্রথম সিনেমাই বাজিমাত। ফার্স্ট শটেই সিন ওকে। এসেই যেন লাইমলাইট কেড়ে নিয়েছিলেন এই দীর্ঘাকৃতি, সুদর্শন তরুনটি। সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকের হাত ধরে সিনেমা জগতে অভিষেক হওয়া সৌমিত্রকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এর পর একে একে ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দেবী’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘চারুলতা’ তালিকাটা আসলে গুনে শেষ করা যাবে না। সত্যজিতের প্রায় ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন তিনি। সত্যজিতের নায়ক বলতে তার নামটাই একমাত্র নাম। 

১৯৬১ এই বছরটি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় জীবনে একটা মাইলস্টোন বছর। ওই বছরেই মুক্তি পায় তপন সিনহা পরিচালিত ছবি ‘ঝিন্দের বন্দী’। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে সৌমিত্রকে প্রথম দর্শক পেয়েছিলেন একটি নেগেটিভ চরিত্রে। যে অভিনেতা অপু হিসেবে দর্শকের মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘দেবী’ অথবা ‘সমাপ্তি’তে যে সুদর্শন নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সেই সুদর্শন অভিনেতাকে তপন সিনহা দিলেন একটি নিষ্ঠুর ভিলেনের চরিত্র। বলা বাহুল্য সেই সময়ে বাংলা সিনেমার দর্শকদের মধ্যে সাহিত্য পড়ার অভ্যাস ছিল প্রবল। তাই উপন্যাসের চরিত্র রূপায়ন করতে যেয়ে বুঝলেন চ্যালেঞ্জটা আসলে বেশ কঠিন। উপন্যাসে ময়ূরবাহনকে একজন অত্যন্ত সুদর্শন ও লম্পট যুবক হিসেবে বর্ণনা করেছেন শরদিন্দু। এমন একটি চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে যে কেউ ভাবতে পারেন, সেটাই ছিল আশ্চর্যের। অভিনেতার পেশাগত জীবনে তাই এই সিনেমাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিলো। 

সত্যজিতের আরেক অমর সৃষ্টি ফেলুদাকে বড় পর্দায় জীবন্ত করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গল্পের বই থেকে সেলুলয়েডের পর্দা ফেলুদা যে বাঙালির হৃদয়ে এভাবে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিবে তা বোধহয় সত্যজিৎ বা সৌমিত্র কেউই ভাবেননি৷ ‘ফেলুদা’ এর পরেও বহুবার হাজির হয়েছে বড় পর্দায় এবং ছোট পর্দায়। কিন্তু বাঙালির কাছে সৌমিত্রের মতো করে কেউই তেমনভাবে ফেলুদা হিসেবে জায়গা করে নিতে পারেননি। সব্যসাচী কিছুটা প্রভাব ফেললেও সৌমিত্র আর ফেলুদা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে আজও। 

সৌমিত্র যখন 'অপু'

সত্যজিতের সঙ্গে জুটি বেঁধে ইতিহাসের খাতায় নাম লিখলেও তপন সিনহা, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মতো নির্মাতাদের সিনেমাতেও এতো সাবলীল আর অসাধারন অভিনয় উপহার দিয়েছেন সৌমিত্র যে নিজেকে একভাবে প্রায় অপরিহার্য করে তুলেছিলেন তিনি।

সাত পাকে বাঁধা, শাখা প্রশাখা, বাক্স বদল, আকাশ কুসুম, অশনি সঙ্কেত, ঝিন্দের বন্দী, অরণ্যের দিনরাত্রি, ঘরে বাইরে, আবার অরণ্যে, চারুলতা,  মণিহার, কাঁচ কাটা হীরে, ঘরে বাইরে, পরিণিতা, সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশ, অসুখ বা সাম্প্রতিক বেলা শেষে, প্রাক্তন এর মত সিনেমার মধ্য দিয়ে সৌমিত্র স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন সমালোচক তথা সাধারণ দর্শকের হৃদয়ে।

প্রায় কাছাকাছি সময়ের আরেক কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের তুলনা এসেছে বারবার। অভিনয়ে কার চেয়ে কে বড়, সে তর্কে বহুদিন মশগুল থেকেছে ভক্তকুল। তবে মহানায়ক উত্তম কুমারের অকাল মৃত্যুর পরে এই বিতর্ক থেমে গেলেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজগুনে বাংলা চলচ্চিত্রে অবিরাম কাজ করে গেলেন ছয় দশকের বেশি সময়। 

নায়ক হিসেবে তিনি তাঁর সমসাময়িক সব নায়িকার বিপরীতেই সাফল্য পেয়েছেন। সম্ভবত এই কারনে বিশেষ করে কারও সঙ্গে ‘জুটি’ গড়ে উঠেনি তার। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘দত্তা’ সিনেমাতে সুচিত্রা-সৌমিত্র জুটি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য। তেমনই শর্মিলা ঠাকুর, সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, অপর্ণা সেনের সাথেও উপহার দিয়েছেন ব্যবসা সফল এবং নান্দনিক সিনেমা। আমাদের দেশের ববিতার সাথে অশনি সংকেত সিনেমাটিও তার নান্দনিক সিনেমার লিষ্টে থাকবে অবলীলায়। পরবর্তীতে দেবশ্রী রায়, ইন্দ্রাণী হাওলাদার, শতাব্দী রায়, ঋতুপর্না সেন গুপ্ত বা কোয়েল মল্লিকের সাথেও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন অবলীলায়।

ছয় দশকেরও বেশি অভিনয় জীবন সৌমিত্র চট্টোপাধ‌য়ের। দীর্ঘ ষাট বছরের কেরিয়ারে তিনশোরও বেশি সিনেমায়। ২০০৪ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ২০০৬ সালে ‘পদক্ষেপ’ ছবিতে জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত সৌমিত্র ২০১১ সালে ভারতীয় সিনেমার সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পান। ‘অর্ডার দি আর্ট এ দে লেটার’ হল শিল্পীদের জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ থেকে তিনিই প্রথম এই সম্মানে ভূষিত হন। ২০১৮ সালে তিনি ভূষিত হন ফরাসি সরকারের সেরা নাগরিক সম্মান ‘লিজিয়ঁ দ’নর’-এ। তবে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বারবারই বলে গিয়েছেন যে তার সেরা পুরস্কার ভক্তদের ভালোবাসা। 

সৌমিত্র নিজেই জানিয়েছিলেন, অনেক সত্ত্বার মধ্যে অভিনয় তাঁর একটি সত্তা মাত্র। কবিতাচর্চা, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্যসংগঠন তাঁর বিপুল বৈচিত্রের এক একটি দিক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সব কিছু নিয়েই অনন্য। তাইতো ৮৫ বছর বয়সে এসেও ক্লান্তি তার উপর ভর করতে পারেনি। শেষ জীবনেও একই রকম প্রাণশক্তি নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। বলা চলে, ম্যারাথন দৌড়ের এক অসামান‌্য সেলুলয়েড-দর্পণ তাঁর জীবন। নিজেকে সবসময়ই বলতেন থিয়েটারের মানুষ। তাঁর দরাজ কণ্ঠের আবৃত্তি শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। কবিতার বই লিখেছেন ১৪টি।

করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় গত ৬ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল সৌমিত্রকে। প্রায় দশ দিন চিকিৎসার পর ১৬ অক্টোবর তার করোনাভাইরাস রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ আসে, শারীরিক অবস্থারও কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা থাকায় তার অবস্থার আবার অবনতি হতে শুরু করে। প্রস্টেটের পুরনো ক্যান্সারও আবার ফিরে আসে, সেই সঙ্গে ছিল শ্বাসতন্ত্রের পুরনো সমস্যা। তিন দিন আগে সৌমিত্রর শ্বাসনালীতে অস্ত্রোপচার করেছিলেন চিকিৎসকরা। এর মাঝেই শুক্রবার থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় সৌমিত্রর দেহ চিকিৎসায় আর সেভাবে সাড়া না দেওয়ায় অনেকটাই হাল ছেড়ে দেন চিকিৎসকরা। কলকাতার সেই বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ই নভেম্বর মৃত্যু হয় এই অভিনেতার। তবে তিনি বেঁচে রইবেন অনন্তকাল তার কাজের মধ্য দিয়ে, তার সেই অসাধারন আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। সৌমিত্র হয়তো জগতের মায়া ত্যাগ করে বিদায় নিলেন তবে ফেলুদা, অপু বাঙালির জীবনে রয়ে যাবেন অনন্তকাল।

সুত্র- আনন্দলোক, উইকিপিডিয়া 

ফিচার্ড ইমেজ: নীলোৎপল দাস


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা