মহামারীর পর বলিউড ক্রমশ শীর্ষস্থান থেকে খসে পড়েছে। মুনাফার হিসেবে সাউথের কাছে মার খেয়েছে। 'পুষ্পা'র মত মাসালা ফিল্ম হিন্দি বেল্টে ১০০ কোটির বেশি ব্যবসা করেছে, অথচ বিগ বাজেটের হিন্দি সিনেমাগুলো খেয়েছে হোঁচট। যে কারণেই মূলত সেই প্রশ্ন আবার উঠছে- কি করলে বলিউডি ফিল্ম জনপ্রিয় হবে দক্ষিণ ভারতে?

আমির খানের 'লাল সিং চাড্ডা'র ফ্লপ হওয়াটা বেশ রিমার্কেবল এক ঘটনা। রিমার্কেবল এই অর্থে, মূলত আমির খানের এই সিনেমার মধ্যে দিয়েই তিন খানের দুর্দশার প্যাথেটিক সার্কেলটা কমপ্লিট হয়েছে। শাহরুখ খান বহুদিন ধরেই অফ ফর্মে। সালমান খানের সিনেমাও তথৈবচ। শেষ ভর‍সা ছিলেন আমির খান। আমির খানের 'লাল সিং চাড্ডা' ভালো ব্যবসা করলে বলিউড বেশ ভালো একটা মোমেন্টামও পেতো। সেটা তো হয়ইনি, মধ্যিখান দিয়ে বলিউডের কপালের ভাঁজটা যেভাবে গাঢ় হয়েছে, যেন খানিকটা অশনিসংকেতেরই ইঙ্গিত হিসেবে এসেছে তা। 

'লাল সিং চাড্ডা' বক্স-অফিসে খেয়েছে হোঁচট 

মহামারীর পর থেকে যদি বলিউডের সিনারিওটা কেউ লক্ষ্য করেন, দেখবেন, শীর্ষস্থান থেকে বলিউড খসে পড়েছে ক্রমশ। রেভিনিউ'র হিসেবে সাউথের কাছে মার খেয়েছে। 'পুষ্পা'র মত মাসালা ফিল্ম হিন্দি বেল্টে ১০০ কোটির বেশি ব্যবসা করেছে, অথচ বিগ বাজেটের হিন্দি সিনেমাগুলো চলেনি। আল্লু অর্জুন, ফাহাদ ফাসিল, দুলকার সালমান, পৃথ্বীরাজ... সাউথের স্টারদের বেশ বড়সড় ফ্যানবেজ তৈরী হয়েছে মুম্বাইয়ে। অথচ, মুম্বাইয়ের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর তিন খান, খানখান হয়েই চুরমার হয়েছেন, হয়েছেন ব্যর্থ। 'আরআরআর', 'পুষ্পা', 'কেজিএফ' এর মত সিনেমাগুলো নিয়মিত ব্যবধানে বলিউডে রিলিজ পেয়েছে। বক্স-অফিসে ভাংচুর করেছে। এদিকে 'সম্রাট পৃথ্বীরাজ', 'শামসেরা'... অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট! 

'পুষ্পা' রীতিমতো শাসন করেছে হিন্দি বেল্টে

পাশাপাশি, সাউথের ডিরেক্টর-প্রোডিউসররাও বেশ ভালোভাবে ধরেছেন হিন্দি বেল্টকে। তাদের সিনেমায় অভিনয়শিল্পী নেয়া হচ্ছে বলিউড থেকে। সে সাথে, মুম্বাইয়ের মেইনস্ট্রিম চ্যানেলগুলোকে ধরে তারা চালাচ্ছেন এক্সট্রিম ক্যাম্পেইনও। অর্থাৎ, যত ভাবে সম্ভব, সাউথ ঠিক ততভাবেই চেষ্টা চালাচ্ছে হিন্দি বেল্টকে আয়ত্বে আনার জন্যে, এবং এ কাজে তারা বেশ সফলও। কিন্তু, মুদ্রার উল্টোপাশে যদি বলিউডের দিকে তাকাই, তারা নিজেদের ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেদের সিনেমাকে ব্যবসাসফল করতে তো ব্যর্থ হচ্ছেই, ক্রমশ উপেক্ষিত হচ্ছে সাউথ বেল্টেও। ব্যবসা তো হারিয়েছে আগেই, এবার হারাচ্ছে সম্মানও। 

যদিও একটা সময়ে সাউথ ইন্ডিয়ান বেল্টে হিন্দি সিনেমা বেশ চলতো। যদি 'পিকে'র কথা বলা হয়, কিংবা বলা হয় 'দাবাং' এর কথা... এসব সিনেমা বলিউডের পাশাপাশি দুর্দান্ত ব্যবসা করেছে সাউথেও। আবার, 'এইটি থ্রি' বলিউডে ভালো ব্যবসা না করতে পারলেও সাউথে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে। মহামারীর আগে নিয়মিত ব্যবধানেই হিন্দি সিনেমা সাউথে গিয়েছে। জনপ্রিয় হয়েছে। ব্যবসা করেছে। কিন্তু, এরপরেই ছন্দপতন। মহাপতন। 

বলিউডের এই মহাপতন কিংবা পদস্খলনের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও প্রথম কারণ হিসেবে দাঁড় হবে- গল্প। গল্প ভালো হলে সাউথ ইন্ডিয়ান অডিয়েন্স যে হিন্দি-তেলেগু বিভেদ করেনা, সে তো সর্বজনবিদিত। এবং সে কারণেই, ভালো গল্প না থাকায়, এক গল্পের পুরোনো কাসুন্দি বারবার ঘেঁটে ফেলায়, বলিউড ক্রমশই সাউথ বেল্টে হারিয়েছে আপেক্ষিকতা। যদিও শুধু ভালো গল্প থাকলেই যে সাউথের অডিয়েন্স হলমুখী হতো, মোটাদাগে এমনটাও বলা যায় না। এই রিজিয়নের অডিয়েন্সকে টানতে হলে, গল্প যেমন লাগে, পাশাপাশি লাগে বিগ স্টারও, সিনেমাটা সাউথের ভাষায় ডাবডও হতে হয়। এ প্রসঙ্গে যেমন মনে পড়েছে বলিউডের 'ওয়্যার' সিনেমার কথা। প্যান্ডেমিকের আগে যে সিনেমা বেশ ভালো ব্যবসা করেছিলো সাউথে। এবং, যে সিনেমায় এই দুই উপাদানও (বিগ স্টার, ডাবড ভার্সন) ছিলো বহাল তবিয়তে। 

আবার, এই ফর্মুলারও ব্যতিক্রম আছে। যেসব সিনেমা বেশ জনপ্রিয় হয় হিন্দিতে, ওয়ার্ড অফ মাউথে যেসব বলিউডি সিনেমা ছড়ায় বেশি, সেসব সিনেমা বড় তারকা না থাকলেও জনপ্রিয় হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে- 'বাধাই হো' কিংবা 'কাশ্মীর ফাইলস' এর কথা। এই দুই সিনেমা শুধুমাত্র ওয়ার্ড অব মাউথের জোরেই সাউথের অডিয়েন্সের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছিলো। হয়েছিলো জনপ্রিয়ও। অর্থাৎ, মোদ্দা কথা এটাই, ভালো গল্প, ওয়ার্ড অফ মাউথ, ডাবড ভার্সন, বিগ স্টার... সাউথে সিনেমা জনপ্রিয় করতে গেলে এই উপাদানগুলো থাকা জরুরি। এবং, বলাই বাহুল্য, বলিউডি সিনেমায় এই উপাদানগুলো ক্লিক করছেনা একসাথে। ফলাফল- বিপর্যয়। 

সে সাথে মনে রাখতে হবে বলিউডি ফিল্মি গানগুলোকেও। হিন্দি সিনেমাকে সাউথে জনপ্রিয় করার পেছনে এই গানগুলোর যে বরাবরই থাকে বড়সড় অবদান, অস্বীকার করার উপায় নেই তাও। একটা সময়ে যখন বলিউডে কালজয়ী সব গান আসছিলো, তখন এসব গানের জোরেই সিনেমাগুলো সাউথে সাড়া পাচ্ছিলো, হচ্ছিলো জনপ্রিয়ও। কিন্তু, আফসোস এটাই, সেসব গান এখন আর নেই। গান নিয়ে গ্রান্ড অ্যারেঞ্জমেন্টও নেই। নেই এক্সপেরিমেন্টও। ফলাফলে, সিনেমাগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। উলটো দিকে, সাউথ বেল্টের সিনেমাগুলোতে গান এক্স ফ্যাক্টর না হলেও মূলত ডাবড সিনেমা দিয়েই তারা ক্রমশ ঢুকে পড়েছে অন্দরমহলে। তাদের মাসালা ফিল্ম, সে ফিল্মের ওভার দ্য টপ অ্যারেঞ্জমেন্ট, কমিক রিলিফ, ফাইট, রোমান্স... মুখরোচক সব লেয়ার মিশিয়ে সর্বগ্রাসী হয়েই তারা বিস্তার করেছে তাদের জাল। কেউ যদি হিন্দি এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেলের যেকোনো এক দিনের শিডিউল ফলো করেন, তাহলে সেখানে হিন্দি ডাবড তেলেগু বা তামিলের কমপক্ষে দুটি সিনেমা পাবেনই পাবেন। যদিও হিন্দি সিরিয়ালগুলোও ডাবড হয়ে ক্রমশই ছড়াচ্ছে আশেপাশে। কিন্তু, কেন যেন, হিন্দি সিনেমার ক্ষেত্রেই হচ্ছে বিপত্তি। ছিঁড়ছেনা শিকে। 

'ফাহাদ ফাসিল'রা নিয়মিত জনপ্রিয় হচ্ছেন মুম্বাইতে

তবে, এও জানা, বিগ বাজেটের দুয়েকটা সিনেমা হিট হলেই বলিউড খানিকটা হলেও ফিরবে ট্রাকে।  পাশাপাশি, যদি সিনেমাগুলোকে নিয়মিত ডাবড ভার্সনে এবং সাবটাইটেলে সাউথে ছাড়া যায়, প্রমোশনাল ক্যাম্পেইন এবং সিনেমার কাস্টেও সাউথকে ঠিকঠাক ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা বলিউডকে খানিকটা হলেও সামনে নেবে। এসবের পাশাপাশি, নজর রাখতে হবে গল্পেও। বলিউড যেহেতু 'গল্প'কে দেয় সবচেয়ে কম গুরুত্ব, পাল্টাতে হবে সেই ন্যারো ন্যারেটিভও। মুম্বাই-কেন্দ্রিক গল্প থেকে বেরিয়ে এসে অন্য রিজিয়নের গল্পেও চালাতে হবে এক্সপেরিমেন্ট। এসব করলে আশা করা যায়, বলিউডের স্ট্যাটাস খানিকটা হলেও পাল্টাবে। যেহেতু ব্যবসাটা তারা জানেই, তাই ব্যবসার নাড়িনক্ষত্র নিয়ে না ভেবে এবার তাদের মূল ফোকাসটা রাখতে হবে কন্টেন্টে। কন্টেন্টের এক্সিলেন্সে। মূলত, বলিউডের সাফল্যের কিংবা ফিরে আসার এটাই একমাত্র সূত্র। একমাত্র সমীকরণ। এর কোনো ব্যত্যয় নেই। নেই কোনো শর্টকাটও৷ 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা