দেয়ালের মাছি থেকে সুপারহিরো-কেন্দ্রিক প্রাথমিক আইডিয়া পেয়ে স্ট্যান লি এরপর ভাবতে বসলেন নাম নিয়ে। এরকম এক সুপারহিরোর নাম কী হতে পারে? মশা-মানব? মাছি-মানব? নানারকম নাম আসা-যাওয়া করতে করতে অবশেষে যে নাম মাথায় গেঁথে গেলো তার, সেটি- স্পাইডার ম্যান।

'স্পাইডার ম্যানঃ নো ওয়ে হোম' নিয়ে ইদানীংকালে যত মাতামাতি হলো, সাম্প্রতিক অতীতে আর কোনো সিনেমা নিয়ে এমন হয়েছে বলে মনে পড়ে না৷ ওয়েবসাইট ক্রাশ থেকে শুরু করে সিনেমাহলে হাতাহাতি... হয়েছে সবই। এত মাতামাতির এই যে সিনেমা, সেটি কেমন হয়েছে, সে আলাপ বাদ রাখি। বরং চোখ রাখি 'স্পাইডারম্যান' এর স্রষ্টা স্ট্যান লি'র গল্পে, যে গল্পে তিনি বলেছিলেন, কিভাবে মস্তিষ্ক থেকে প্রথমবারের মতন মাকড়সা মানব এসেছিলো কমিকসের রঙিন বইয়ে, প্রেক্ষাগৃহের রুপোলী পর্দায়। 

বেশ অনেকদিন ধরেই তিনি ভাবছিলেন, এমন এক শক্তিশালী মানুষ তিনি তৈরী করবেন, যে কি না সবার থেকে খানিকটা আলাদা। স্ট্যান লি'র যিনি প্রকাশক, তিনিও চাচ্ছিলেন নতুন এক সুপারহিরো আসুক। স্ট্যান'কে তিনি বিশেষভাবে বলেও রেখেছেন, যাতে খুব তাড়াতাড়িই সে এরকম কোনো চরিত্র নিয়ে আসে। অগত্যা, স্ট্যান শুরু করলেন প্রবল ভাবনাচিন্তা। ভাবতে ভাবতে যখন রীতিমতো গলদঘর্ম হচ্ছিলেন তিনি, আচমকা একদিন হঠাৎ করে তার চোখ পড়ে যায় দেয়ালের দিকে। যে দেয়াল বেয়ে বেয়ে একটা মাছি উপরে উঠছিলো ক্রমশ। স্ট্যান লি ভাবলেন- আরে! আমি যদি এমন এক সুপারহিরো বানাই, যে দেয়ালে সেঁটে থাকতে পারে, দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে পারে, তাহলে বিষয়টা বেশ অন্যরকম হয় না? দারুণ হয় না? বেশ উৎফুল্ল হলেন তিনি। দেয়ালের মাছি থেকে প্রাথমিক আইডিয়া পেয়ে এরপর ভাবতে বসলেন নাম নিয়ে। এরকম এক সুপারহিরোর নাম কী হতে পারে? মশা-মানব? মাছি-মানব? নানারকম নাম আসা-যাওয়া করতে করতে অবশেষে যে নাম মাথায় গেঁথে গেলো তার, তা স্পাইডার-ম্যান।

স্ট্যান লি! 

এরপর স্ট্যান ভাবলেন, স্পাইডার-ম্যান কে টিনেজার করতে হবে। কারণ, তখনও কোনো টিনেজার সুপারহিরো'র আবির্ভাব ঘটেনি পৃথিবীতে। এছাড়াও স্ট্যান এই সুপারহিরোর জীবনে কিছু ব্যক্তিগত সমস্যাও যুক্ত করে দিলেন। সবকিছু একসাথে করে তার মনে হলো দুর্দান্ত এক সুপারহিরো তৈরী করেছেন তিনি। এরপর তড়িঘড়ি করে দৌড়ালেন প্রকাশকের কাছে। উত্তেজিত কন্ঠে তাকে জানালেন নিজের আবিষ্কারের কথা। প্রকাশক নীরবে পুরোটা শুনলেন। এরপর বললেন-

স্ট্যান, পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে সুপারহিরোর আইডিয়া নিয়ে এসেছো তুমি। প্রথমত- মাকড়সাকে মানুষ অপছন্দ করে। তাকে নিয়ে সুপারহিরো বানালে কেউ দেখবে? এর উপর, তাকে তুমি বানাচ্ছো টিনেজার। টিনেজার সুপারহিরোকে কেউ গুরুত্ব দেবে? এখানে শেষ হলেও হতো। তুমি আবার তাকে ব্যক্তিগত সমস্যায় জেরবার করে তুলবে। সুপারহিরোদের ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে? কী নিয়ে এলে তুমি স্ট্যান? হতাশ করলে। 

যদিও প্রকাশকের কথায় বিস্তর মনঃক্ষুণ্ন হলেন স্ট্যান, কিন্তু তিনি তবুও মাথা থেকে 'স্পাইডার-ম্যান' এর মাকড়সা-জাল ছাড়াতে পারছিলেন না। সে সময়ে তিনি একটি ম্যাগাজিনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। সে ম্যাগাজিনটার একেবারে শেষ সংখ্যায় তিনি ভাবলেন স্পাইডার-ম্যানকে আনা যাক। এ ভাবনার পেছনে বিশেষ দুটি কারণ আছে। প্রথমত তিনি চাচ্ছিলেন- মাথা থেকে স্পাইডার-ম্যানের এই ভারটা নামুক। দ্বিতীয়ত- যেহেতু ম্যাগাজিনের শেষ সংখ্যা, এই সুপারহিরো'কে নিয়ে তামাশা করার মতও বেশি মানুষ থাকবে না। কেউ হয়তো দেখবেও না। উইন উইন সিচুয়েশন। যা ভাবা তাই কাজ। 'অ্যামেজিং ফ্যান্টাসি' নামের সেই ম্যাগাজিনের শেষ সংখ্যার কাভারে তিনি আনলেন লাল-নীল স্পাইডার-ম্যানকে।

লাল-নীল স্পাইডার-ম্যান! 

এরপরেই ঘটলো অঘটন। হুলস্থুল জনপ্রিয় হয়ে গেলো স্পাইডারম্যান। যে পাবলিশার প্রথমে স্পাইডার-ম্যানের কথা শুনে নাক কুঁচকেছিলেন, তিনি রীতিমতো ছুটে এসে স্ট্যান লি কে বললেন-

স্ট্যান, এই সুপারহিরোই থাকবে। একে নিয়ে নতুন ভেঞ্চার করবো আমরা। 

এই গল্পটা বলার পরে স্ট্যান লি বরাবরই একটু মুচকি হাসেন এবং বলেন- 

যদি তোমার কাছে সত্যিই কোনো আইডিয়া থাকে এবং তুমি মনে করো আইডিয়াটা দারুণ, তাহলে সে আইডিয়াকে সফল করতে হলে যা যা লাগবে, সবই করবে। ভেতরের ডাক এলে সে ডাককে অবশ্যই সাড়া দেবে। এবং আমি হলফ করে বলতে পারি, এই কাজে তুমি কোনোদিন ঠকবে না।

এভাবেই জন্ম স্পাইডারম্যানের। স্ট্যান লি'র এ গল্প আমাদের সে বার্তাই দেয়, যে বার্তা আমরা শুনেছি প্রায় সবাই-ই, কিন্তু ভেতরে ধারণ করিনি কেউ। যে বার্তার মূলকথা এটাই- হৃদয়কে অনুসরণ করো। সফল হবেই। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামির কথা। যিনি বলেছিলেন, আচমকা বেসবল খেলা দেখার মাঝখানেই তার মাথায় পরিকল্পনা আসে, উপন্যাস লিখবেন। ছয় মাস ধরে লিখলেন- হিয়ার দ্য উইন্ড সিং। বাকিটা, ইতিহাস। বিখ্যাত মানুষেরা হয়তো ঠিক এভাবেই বিখ্যাত। ভেতরের ডাককে সাড়া দেওয়ায়, ভেতরের আলোড়নকে সম্মান করায়। এটাই হয়তো গড়পড়তা আমাদের জন্যেও শিক্ষা। স্বকীয় চিন্তার মশাল হাতে অনিশ্চিতের পথে নেমে যাওয়ার শিক্ষা। শঙ্কাকে জয়ের শিক্ষা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা