চমকে গিয়েছি যখন শুনলাম, সম্প্রচারের পরে সিরিজটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, নেটফ্লিক্সের নন-ইংলিশ শোগুলোর মধ্যে 'নাম্বার ওয়ান' এ অবস্থান করছে এখন এটি! এবং এ অভূতপূর্ব অর্জন সাধিত হয়েছে মাত্র দশদিনের মধ্যে! নেটফ্লিক্সের কর্তাব্যক্তিরা এও ধারণা করছেন, 'স্কুইড গেম'ই হয়তো হতে যাচ্ছে তাদের সামনের দিনগুলোর তুরুপের তাস...

মাসকয়েক আগে 'রিপ্লাই ১৯৮৮' নামের কোরিয়ান এক ড্রামা দেখে যারপরনাই চমকে গিয়েছিলাম। বলা ভালো, ভাবনার গভীরে তলিয়ে গিয়েছিলাম। আজকাল চারপাশে সময় কাটানোর এত এত মাধ্যম, বিশেষ কোনো সিনেমা, সিরিজ, বই তাই অতটা গভীরভাবে ভাবায় না। এত অজস্র বিষয়ের ভীড়ে মানুষের ভাববার সময়টাও তো নেই! সেরকম এক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে 'রিপ্লাই ১৯৮৮' দেখে থমকে গিয়েছিলাম কিছু সময়ের জন্যে। কোরিয়ান সিনেমার ভক্ত আমি আগে থেকেই। 'রিপ্লাই ১৯৮৮' দেখার পর এটা বুঝেছিলাম, ড্রামা নির্মাণেও তারা কারো থেকে একবিন্দু পিছিয়ে নেই। বিশ্বব্যাপী 'কে-ড্রামা'র কেন এত জনপ্রিয়তা, বিশেষ এই টিভি সিরিজ দেখার পরে সেটাও বেশ ভালোভাবেই টের পেয়েছিলাম। 

আসি সিনেমার প্রসঙ্গে। সিনেমা দেখেন, অথচ প্রিয় সিনেমার তালিকায় কোরিয়ান সিনেমা নেই, এরকম মানুষ খুঁজতে গেলে বৃথাই পণ্ডশ্রম হবে। মিরাকল ইন সেল নাম্বার সেভেন, ওড টু মাই ফাদার, হোপ, দ্য টিচার্স ডায়েরি, কনফেশন অফ আ মার্ডারার..বলা যেতে পারে অনেক সিনেমার কথাই। এসব সিনেমায় মুগ্ধ হওয়ার রসদ যেমন আছে, তেমনি ভাবনার গভীর অতলান্তে ডুবে যাওয়ার খোরাকও নেই কম। আবার এই নির্মাণগুলোতে বিনোদনের উপাদানও অবিরল।  বিনোদন-ভাবনা-মুগ্ধতার এই যে বিরল মিশেল, ঠিক এ  কারণেই হয়তো কোরিয়ান সিনেমা/সিরিজ আমাদের বরাবর প্রিয়। পাশাপাশি যেকোনো নির্মাণে ডিটেইলিং এর কাজটি যেভাবে যত্ন নিয়ে করেন এই ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতারা কিংবা স্টোরিটেলিং এ যে অভিনব মুন্সিয়ানা তারা দেখান, তাতে করে তাদের নির্মাণ যে সবার খুব প্রিয় হবে, তাতে অবাক হওয়ারও সেরকম কিছু থাকে না। 

মজার বিষয়, বাংলাদেশে কে-ড্রামা, কে-পপ কিংবা কোরিয়ান সিনেমার ভক্তের সংখ্যা অগুনতি। বাংলাদেশের তাদের এত জনপ্রিয়তার পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে কোরিয়ান সংস্কৃতির সাথে আমাদের সংস্কৃতির আঙ্গিকগত মিলও হয়তো একটি কারণ। সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের কারণেই আমরা খুব সহজেই কোরিয়ান নির্মাণগুলোর গূঢ় বার্তা টের পাই। উপলব্ধি করতে পারি। তাছাড়া যেসব গল্পে নির্মাণগুলো হয়, অনেকক্ষেত্রেই সেসব গল্প খাপ খায় আমাদের জীবনবোধের সাথে। সবমিলিয়ে তাই কোরিয়ান নির্মাণ আমাদের জন্যে বরাবরই প্রাসঙ্গিক। এবং আমরাও নিয়মিত মুখিয়ে থাকি কোরিয়ান কন্টেন্টের জন্যে। 

ঠিক সে কারণেই যখন শুনি, কোরিয়ান কোনো নির্মাণ বিশ্বমঞ্চে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে, খুশি হই। আত্মিক যোগসূত্র অনুভব করি। গত বছরে অস্কারের মঞ্চে কোরিয়ান সিনেমা 'প্যারাসাইট' বিজয়ী হওয়ার পর যেমন সন্তুষ্ট হয়েছিলাম। প্রসঙ্গত বলে রাখি, বং জুন হো আমার খুব প্রিয় একজন পরিচালক। স্নোপিয়ার্সার, দ্য হোস্ট সিনেমাগুলো দেখেই ক্রমশ তাঁর সিনেমার গুনমুগ্ধ ভক্ত হওয়া। যখন জানলাম, তাঁর নির্মাণ 'প্যারাসাইট' অস্কার-বিজয় করেছে, যারপরনাই তৃপ্তি পেয়েছিলাম। এই সিনেমার নির্মাণশৈলী কিংবা সিনেমার মেটাফোরিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড এতটাই দুর্দান্ত, এ নির্মাণ যে বিশ্বমঞ্চ কাঁপাবে, তা নিয়ে হয়তো সংশয় ছিলো না কারোরই। 

প্যারাসাইট! 

বং জুন হো'র মতন কোরিয়ান আরেক নির্মাতা প্রিয় আমার। তিনি ডং হোক হোয়াং৷ যার নির্মিত সিনেমা 'সাইলেন্সড' দেখে একরকম স্তম্ভিতই হয়ে গিয়েছিলাম। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমায় তথাকথিত বিচারব্যবস্থার এমন কদর্য রূপ দেখেছিলাম, মন বিষিয়ে উঠেছিলো। মন্ত্রমুগ্ধের মতন দেখেছিলাম 'সাইলেন্ডস।' এবং সিনেমা শেষে আক্ষরিক অর্থেই 'সাইলেন্সড' বা স্তব্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো।

'সাইলেন্সড' এর নির্মাতা প্রিয় পরিচালক ডং হোক হোয়াং সম্প্রতি বানিয়েছেন 'স্কুইড গেম' নামে এক ওয়েব সিরিজ। এই টিভি সিরিজ যে বেশ প্রশংসিত হয়েছে, তা জানতাম। স্ট্রিমিং জায়ান্ট 'নেটফ্লিক্স' এ সম্প্রচারিত হওয়ার পর অনেক মানুষকেই 'স্কুইড গেম' নিয়ে কথাবার্তা বলতেও শুনেছি। কিন্তু চমকে গিয়েছি যখন শুনলাম, সম্প্রচারের পরে সিরিজটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, নেটফ্লিক্সের নন-ইংলিশ শোগুলোর মধ্যে 'নাম্বার ওয়ান' এ অবস্থান করছে এখন এটি! এবং এ অভূতপূর্ব অর্জন সাধিত হয়েছে মাত্র দশদিনের মধ্যে! নেটফ্লিক্সের কর্তাব্যক্তিরা এও ধারণা করছেন, 'স্কুইড গেম'ই হয়তো হতে যাচ্ছে তাদের সামনের দিনগুলোর তুরুপের তাস! 

স্কুইড গেম!

জেনে রাখা ভালো, নয় পর্বের  স্কুইড গেম' এর যে কনসেপ্ট, তা গড়পড়তা সাধারণ জীবনযাত্রার সাথে খুব বেশি প্রাসঙ্গিক না। এখানের থ্রিল, ড্রামা সাসপেন্স কিংবা সারভাইভাল ব্রুটালিটির সাথে বাস্তব জীবনের মিল খুব একটা নেই। তা সত্বেও এই ওয়েব সিরিজ জনপ্রিয় হয়েছে নির্মাতার নির্মানশৈলী ও অভিনব স্টোরিটেলিং এর কারণে। যে কারণেই বিশ্বব্যাপী 'স্কুইড গেম' এখন ভাসছে প্রবল প্রশংসাবাক্যে! টিভি সিরিজের আঁতুড়ঘর  নেটফ্লিক্সই যখন বলছে, তাদের আর্সেনালের নন-ইংলিশ অস্ত্রগুলোর মধ্যে 'স্কুইড গেম'ই নাম্বার ওয়ান, এরপর আর কীই বা বলার থাকতে পারে?

কোরিয়ান যে দুই নির্মাতার কাজ বরাবরই প্রিয়, তারা পরপর এভাবে বিশ্বমঞ্চে ভাস্বর হলেন, এটা দেখে যারপরনাই অবাক, তৃপ্ত এবং মুগ্ধ হয়েছি। পাশাপাশি তাদের এ অর্জন উপলব্ধি করিয়েছে সে প্রাচীন শিক্ষাও। যে শিক্ষা বলে-

প্রতিভা থাকলে তা প্রকাশিত হবেই। আজ অথবা কাল।

'স্কুইড গেম' কিংবা 'প্যারাসাইট' যেন এ বেদবাক্যের স্বপক্ষেই সাক্ষ্য দিয়েছে আবার! সাথে সাথে কোরিয়ান কন্টেন্ট ইন্ডাস্ট্রির প্রতি বাড়িয়েছে শ্রদ্ধা, সম্মান ও ঈর্ষাও! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা