"আমি অবসরে যাইনি। হ্যাঁ, হয়তো এখন সেরকম কোনো স্ক্রিপ্ট পাচ্ছি না কাজ করার। মেরুদণ্ডেও খানিকটা ব্যথা পাচ্ছি ইদানীং। কিন্তু তাই বলে অবসর কেন নেব? আমি যদি ৬৫ বছর বয়সে অবসর নিতাম, আমি কখনোই অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড পেতাম না। আমি জ্যাক নিকলসনের সাথে কোনো সিনেমা করতে পারতাম না। এবং ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান সিরিজের সিনেমাগুলোতেও আসতে পারতাম না..."

ক্রিস্টোফার নোলানের অধিকাংশ সিনেমায় এই অভিনেতার সরব উপস্থিতি অবধারিতভাবেই প্রায় সব দর্শকের চোখে পড়েছে। 'দ্য ডার্ক নাইট' এর 'আলফ্রেড' কিংবা 'দ্য প্রেস্টিজ' এর 'কাটার' অথবা সাম্প্রতিক 'টেনেট' এর 'ক্রসবি' হিসেবে এই সৌম্যদর্শন মানুষটি যখনই পর্দায় এসেছেন, সে যত ছোট চরিত্রই হোক না কেন, সব উজ্জ্বল আলো নিজের দিকে রাতারাতি কেড়ে নিয়েছেন। সাবলীল অভিনয় আর বিশেষ সাউথ লন্ডন অ্যাক্সেন্ট দিয়ে আলাদাভাবে পরিচিত এই অভিনেতার বিশ্বজুড়ে অজস্র গুণগ্রাহী। অভিনেতার নাম- মরিস জোসেফ মিকলহোয়াইট জুনিয়র। পাঠক, খানিকটা ধন্দে পড়ে গেলেন নিশ্চয়ই? অবশ্য ঘাবড়ানোর কথাও। অধিকাংশ মানুষই তাকে এই নামে চেনে না। তিনি সবার কাছে পরিচিত 'মাইকেল কেইন' নামে৷ প্রশ্ন উঠতে পারে, পিতৃপ্রদত্ত নাম পরিবর্তন করে কেন এ নামে এলেন তিনি? এও প্রশ্ন হতে পারে, কায়ক্লেশের সংসারে বড় হওয়া এ মানুষটির মাথায় হঠাৎ করে অভিনয়ের ভূতই বা কেন এলো? আসুন, সেসব প্রশ্নের উত্তরই খোঁজা যাক এবার। 

আটাশি বছর বয়স্ক এই অভিনেতার অভিনয়-ক্যারিয়ার ষাট বছরের। এই দীর্ঘ সময়কালে তিনি ১৩০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। পাশাপাশি থিয়েটার, বিজ্ঞাপন কিংবা টিভি শো তো রইলোই। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার, অভিনয়ে তিনি এসেছেন খানিকটা ঝোঁকের বশেই। মাছ-ব্যবসায়ী বাবা ও  রাঁধুনি মায়ের সন্তান হিসেবে 'অভিনয়' নামক বিষয়টা তার পছন্দের তালিকার শীর্ষে আসার কোনো কারণও ছিলো না সেভাবে। কিন্তু সে বাক্য তো আছেই- ললাটের লিখন না যায় খন্ডন। সেটিই যেন প্রকট হয় মাইকেল কেইনের ক্ষেত্রে। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি 'সিনড্রেলা' নাটকে অংশগ্রহণ করার জন্যে জীবনে প্রথমবার স্কুলের মঞ্চে ওঠেন। কিন্তু খুবই খাপছাড়া অভিনয় করে তিনি সেখানে মানুষজনের ঠাট্টার পাত্র হন। মানুষজনের বিদ্রুপের মুখোমুখি হয়ে ছোট্ট কেইন সেদিন প্রতিজ্ঞা করে-

অভিনয় আমি করবোই। দেখে নিও সবাই। 

এরপর পড়াশোনা শেষ করেন। মাথায় অভিনয়ের সিন্দাবাদের ভূত ততদিনে আরো আঁটোসাটো হয়ে গেড়েছে। পড়াশোনার মাঝামাঝি এসে মাত্র ষোল বছর বয়সেই তিনি একটি ফিল্ম কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। তবে খুব বেশিদিন সে চাকরি করা সম্ভব হয় না। ন্যাশনাল সার্ভিসের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দিতে হয় তাকে৷ ব্রিটিশ আর্মির সদস্য হিসেবে প্রথমে তিনি যান পশ্চিম জার্মানিতে। এরপর কোরিয়ায়। কোরিয়ান যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন তিনি। 

কোরিয়ান যুদ্ধের হিংস্রতা, ভয়াবহতা, নৃশংসতা ভেতরে ভেতরে তাকে অনেকটাই পরিপক্ক করে তোলে। তিনি বুঝতে পারেন, জীবন আসলে যতটা দেখায়, তার থেকেও বেশি হিংস্র হয়ে উঠতে পারে সময়ে-সময়ে। এই যুদ্ধ চলাকালে একাধিকবার মৃত্যুমুখে পড়েন তিনি। এবং আশ্চর্যভাবে বেঁচেও যান প্রতিবার। মৃত্যুর ভয়াল চেহারা সরাসরি হাতছোঁয়া দূরত্ব থেকে দেখেছেন বলেই কী না জানা নেই, তিনি জীবন-মৃত্যুর মধ্যবর্তী পাতলা আবরণ টের পান খুব ভালোভাবে৷ যুদ্ধের সে দুঃসহ অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেন না তিনি। সে বীভৎস অভিজ্ঞতা ক্রমশই  তাড়া করে ফেরে তাকে। মাইকেল কেইনের আত্মজীবনী 'দ্য এলিফ্যান্ট টু হলিউড' বইয়ে তিনি এ সম্পর্কে লেখেন- 

প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেক মুহুর্তে আমি যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দৃশ্যগুলো দেখতে পাই। হয়তো সারাজীবনই দেখবো। 

যুদ্ধ থেকে ফিরে দুঃসহ সব যুদ্ধ-স্মৃতি ভোলার জন্যে তিনি আবার অভিনয়ের মঞ্চে আশ্রয় নেন। 'মাইকেল হোয়াইট' নামে থিয়েটার-নাটকে অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পাশাপাশ টিভি বিজ্ঞাপনেও কাজ করতে থাকেন। বিশ বছরের তরুণ মাইকেল কেইন তখন কাজের কোনো সুযোগই ছাড়ছেন না। হাতের সামনে যা কাজ পাচ্ছেন, সেটিই লুফে নিচ্ছেন তৎক্ষনাৎ। সব চলছিলোও ঠিকঠাক। কিন্তু এরইমাঝে হয় এক বিপত্তি। জানা যায়, মাইকেল হোয়াইট নামে আরেকজন অভিনেতা আগে থেকেই থিয়েটারে অভিনয় করছেন। এদিকে তিনিও তো 'মাইকেল হোয়াইট' নামে অভিনয় করছেন। এখন কী করা যাবে? নাম তো পাল্টাতে হবে। কিন্তু কী নাম দেয়া যায়? ভাবতে ভাবতে মাইকেল কেইন রাস্তায় নেমে পড়লেন। এদিক-সেদিক তাকাচ্ছেন। হঠাৎ দেখলেন এক সিনেমার পোস্টার। সিনেমার নাম- দ্য কেইন মিউটিনি। এখান থেকেই নিজের নামের 'মাইকেল' অংশের সাথে 'কেইন' যুক্ত করলেন তিনি। এরপর এই নামেই অভিনয় শুরু করলেন টিভি নাটকে, বিজ্ঞাপনে, থিয়েটারে। 

টুকরোটাকরা, ছোটোখাটো কাজ করছিলেন নিরন্তর। কিন্থ কারো নজরে আসছিলেন না সেভাবে। আক্ষেপে পুড়ছিলেন খানিকটা। তবে সে আক্ষেপ স্থায়ী হয় না বেশিদিন। মুক্তি পায় 'জুলু।' 'জুলু' সিনেমায় অভিনয় করে প্রথমবারের মতন আন্তর্জাতিক মাধ্যমের নজরে আসেন কেইন। উনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক যুদ্ধ যেখানে ব্রিটিশ সৈন্য এবং জুলু যোদ্ধারা সম্মুখসমরে নেমেছে দক্ষিন আফ্রিকায়...সে ঘটনাকে উপজীব্য করে নির্মিত এ সিনেমায় মাইকেল কেইন দুর্দান্ত অভিনয় করেন। খুঁতখুঁতে জাদরেল এক অফিসার হিসেবে পর্দায় এসে বুভুক্ষের মতন সব আলো নিজের দিকেই কেড়ে নেন তিনি। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যান। জনপ্রিয়তার রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি আরো কিছু দুর্দান্ত সিনেমায় অভিনয় করেন। দ্য ইপক্রেস ফাইল, আলফি সিনেমায় অভিনয় করে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে বিশেষ এক উচ্চতাতেই নিয়ে যান মাইকেল কেইন। 

যদিও এই মান পরবর্তীতে বজায় রাখতে পারেননি কেইন। টাকার তাগিদে কিছু মানহীন সিনেমাতেও তিনি অভিনয় করেন এরপর। তবে সেসব সিনেমার সংখ্যা খুব বেশি না মোটেও। মানহীন সিনেমায় অভিনয়ের বরাতে তাকে নিয়ে কথাবার্তা যখন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই 'দ্য ম্যান হু উড বি কিং' সিনেমায় দারুণ অভিনয় করে আবারও আলোচনা নিজের দিকে ফিরিয়ে আনেন তিনি। 'দ্য ঈগল হ্যাজ ল্যান্ডেড'এও দারুণ অভিনয় করেন৷ 'হানা অ্যান্ড হার সিস্টার' এ অভিনয়ের জন্য অস্কার পান তিনি। এডুকেটিং রিটা,  লিটল ভয়েজ, দ্য সিডার হাউজ রুলস.. অনবদ্য অভিনয় বজায় থাকে এ সিনেমাগুলোতেও। 'দ্য সিডার হাউজ রুলস' এ অভিনয়ের জন্যে তিনি আবারও অস্কারও পান। 

এরপর নানারকম সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। ক্রমশ যুক্ত হন ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমাতেও। সিনেমাপ্রেমী অথচ 'দ্য ডার্ক নাইট ট্রিলোজি'র 'আলফ্রেড' চরিত্রটিকে পছন্দ করেন না, এমন মানুষ হয়তো একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। 'আলফ্রেড' চরিত্রে মাইকেল কেইন যোগ্য সঙ্গতই দিয়ে যান ব্যাটম্যানকে। এছাড়াও নোলানের 'দ্য প্রেস্টিজ' 'ইনসেপশন' 'ইন্টারস্টেলার' এবং 'টেনেট'এও উজ্জ্বল উপস্থিতি পাওয়া যায় বর্ষীয়ান এ অভিনেতার৷ 

ব্যাটম্যানের আলফ্রেড! 

অসাধারণ সব চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ভীড়ে পুরস্কারপ্রাপ্তিও কম নেই তার। দুটি অস্কার পেয়েছেন। তার অভিনীত সিনেমাগুলো সবমিলিয়ে বক্স-অফিসে ৭.৪ বিলিয়ন ডলার অর্থোপার্জন করেছেন। তার জন্মদিনে তাকে 'কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার' খেতাব দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। সিনেমা-মাধ্যমে তার অবদানের জন্যে দ্বিতীয় কুইন এলিজাবেথ তাকে 'নাইটহুড' উপাধি প্রদান করেছেন। মাইকেল কেইনকে 'ব্রিটিশ কালচারাল আইকন' হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছে বহু মানু্ষ। 

দুটি অস্কার আছে তাঁর ঝুলিতে! 

মাইকেল কেইন অবসর সময়ে লেখালেখি করেন। এখন পর্যন্ত তার আত্মজীবনীর তিনটি খণ্ড বের হয়েছে। সবমিলিয়ে লিখেছেন ছয়টি বই। লেখালেখির কাজটি খুব আনন্দ নিয়েই করেন তিনি। মাঝেমধ্যে অভিনয়ের চেয়েও এগিয়ে রাখেন লেখালেখিকে। ক্রিকেট পছন্দ করেন। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়েও খুব একটা লুকোছাপা করেন না তিনি। যা সত্যি বলে মনে করেন, অকপটে সেটিই বলে দেন। এসবের পাশাপাশি প্রচন্ড রসবোধসম্পন্ন মানুষও তিনি। একবার এক সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক জিজ্ঞেস করেছিলেন তাকে- 

বয়স্ক হয়ে কেমন লাগছে আপনার? 

মাইকেল কেইন হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলেন-

যদি অন্য অপশন (মৃত্যু) বিবেচনা করি, তাহলে ভালোই লাগছে৷ 

এই সুক্ষ্ম রসবোধের পরিচয় তিনি সম্প্রতি আবার দিয়েছেন। গুজব চাউর হচ্ছিলো, অভিনয় থেকে অবসর নিচ্ছেন মাইকেল কেইন। বিশ্বব্যাপী তার ভক্তরা এ খবরে খানিকটা মুষড়েও পড়েছিলো যেন। এরকম সময়েই তিনি টুইট করেন- 

আমি অবসর নেইনি এবং খুব বেশি মানুষ তা জানে না। 

এই সংবাদ যেন স্বস্তির বাতাস হয়েই আমাদের কাছে আবর্তিত হয়। পর্দার এই আশ্চর্য সাবলীল জাদুকর আরো বহু বছর দাপিয়ে বেড়াক বিচিত্র নানা সিনেমায়, এটুকুই তো আমাদের চাওয়া। হোক না তা স্বল্পদৈর্ঘ্যের চরিত্র, কিংবা ক্যামিও কোনো পারফরম্যান্স... স্ব-মহিমায় আবির্ভূত হয়ে দর্শককে বুঁদ করে রাখার যে বিস্ময়কর ক্ষমতা তাঁর, সেটি বজায় থাকুক আমৃত্যু...প্রার্থনা এটাই৷ 

বয়সকে তোয়াক্কা না করা সুপারস্টার!  

শেষ করি নিজের অবসর প্রসঙ্গে মাইকেল কেইনের বলা কথা ক'টি দিয়ে- 

আমি অবসরে যাইনি। হ্যাঁ, হয়তো এখন সেরকম কোনো স্ক্রিপ্ট পাচ্ছি না কাজ করার। মেরুদণ্ডেও খানিকটা ব্যথা পাচ্ছি ইদানীং। কিন্তু তাই বলে অবসর কেন নেব? আমি যদি ৬৫ বছর বয়সে অবসর নিতাম, আমি কখনোই অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড পেতাম না। আমি জ্যাক নিকলসনের সাথে কোনো সিনেমা করতে পারতাম না। এবং ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান সিরিজের সিনেমাগুলোতেও আসতে পারতাম না। 

বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো, স্যার মাইকেল কেইন অথবা স্যার মরিস জোসেফ মিকলহোয়াইট জুনিয়র। ভালোবাসা জানবেন। বয়সকে তোয়াক্কা না করে আপনার এই আশ্চর্য যাত্রা চলতে থাকুক সামনেও... কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা রইলো। 

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা