'বাধাই হো' সিনেমার স্ক্রিনিং শেষে সহশিল্পী আয়ুষ্মান খুরানার সাথে যখন বাড়ি ফিরছিলেন, বাহাত্তর বছর বয়সী এই গুণী শিল্পী তখন হঠাৎ করেই বলে উঠেছিলেন, "আমি যেন আরো কাজ পাই, আমি যেন আরো অভিনয় করতে পারি।" আমৃত্যু অভিনয়ের এরকম ক্ষুধাই ছিলো তাঁর...

সত্যজিৎ রায় এর 'পথের পাঁচালী' সিনেমায় নাম না জানা অনেক নতুন মুখের সমাবেশ ঘটেছিলো। এই আনকোরা মুখগুলোর ভেতরেও আবার আলাদা করে নজর কেড়েছিলেন পর্দার 'ইন্দির ঠাকুরণ' বা বাস্তবের চুনিবালা দেবী৷ এই অভিনেত্রীর সন্ধানে তার পাইকপাড়ার বাড়িতে যখন সত্যজিৎ রায় যান, তখন চুনিবালা দেবীর বয়স পঁচাত্তর। শরীর ভেঙ্গে পড়েছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। পরিচালক সন্দিহান হয়ে পড়লেন, এই অশীতিপর বৃদ্ধাকে কিভাবে সিনেমার জন্যে প্রস্তাব দেবেন? কিন্তু চমকে দিলেন চুনিবালা দেবী নিজেই। সানন্দে রাজি হলেন অভিনয়ে। এবং পর্দার সামনে যে অভিনয় তিনি করলেন, তা হয়ে রইলো অদ্ভুত সুন্দর এক আলেখ্য। পর্দার পেছনেও তার ভূমিকা কম রইলো না৷ নিজের সব ডায়লগ টনটনে মূখস্ত থাকতো। শটের পূঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী মনে রাখতেন। ফোকলা দাঁতে হেসে বরাবরই বলতেন- আমি আরো অভিনয় করতে চাই। পাঠক, এই লাইনটি মনে রাখবেন। এই বিশেষ লাইনটিতে ফিরে আসবো আবার। একটু পরেই। 

'বাধাই হো' নামের দুর্দান্ত কনসেপ্টের সিনেমা বলিউডে মুক্তি পাওয়ার পরে বিস্তর তর্কবিতর্ক হলো। তবে তর্কবিতর্ক ছাপিয়ে মুগ্ধতা ছড়ালো এই নির্মাণের কুশীলবদের দুর্দান্ত শৈলী। অনসম্বল কাস্টের এ সিনেমায় সবার অভিনয়ও ছিলো দুর্দান্ত। কিন্তু হৃদয়গ্রাহী অভিনয় করলেন একজন। সবাইকে ছাপিয়ে পর্দায় দুর্দান্ত উপস্থিতি দিয়ে 'দূর্গা দেবী কৌশিক' নামের একজন বৃদ্ধা হয়ে গেলেন আমাদের খুব কাছের। এই বিশেষ চরিত্রে যিনি দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন, তিনি পেলেন জাতীয় পুরস্কারও। তিনি সুরেখা সিক্রি।

এই সিনেমার স্ক্রিনিং শেষে সহশিল্পী আয়ুষ্মান খুরানার সাথে যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তিনি হঠাৎ করেই বলে উঠেছিলেন, আমি যেন আরো কাজ পাই। সেই একই কথা, যে কথা আমরা শুনেছিলাম ইন্দির ঠাকুরণ এর মুখে। এই বিশেষ বাক্যে সত্যজিৎ এর 'ইন্দির ঠাকুরণ' মিলে মিশে একীভূত হয়ে যান অমিত রবীন্দরনাথ শর্মার 'দূর্গা দেবী'র সাথে। হয়তো জাতশিল্পীদের অভিনয়-ক্ষুধা এরকমই হয়। নাহয়, বেলাশেষের অস্তরাগে এসেও কেন তাঁরা আঁকড়ে ধরতে চাইবেন কাজ, অভিনয় ? 

'বাধাই হো' সিনেমার সেই দাদীমা! 

দেশভাগের ডামাডোলে সাতচল্লিশে জন্ম। বিমানবাহিনীর পাইলট বাবা এবং শিক্ষিকা মা'র মেয়ে সুরেখার হওয়ার কথা ছিলো অনেককিছু। মূলস্রোতে পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন, কিন্তু হঠাৎ বাকবদল। পাকেচক্রে ভর্তি হলেন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা'তে। অভিনয়ের সাথে জড়িয়ে গেলেন পুরোপুরি। 'কিসসা কুরসি কা' সিনেমা দিয়ে রূপোলী পর্দায় এলেন। অন্তিম প্রয়াণের আগ পর্যন্ত লেগে রইলেন পর্দার সাথেই। সিনেমা দিয়ে যে যাত্রার শুরু, সেই সিনেমাতেই শুধু আটকে রইলেন না, টিভি সিরিয়ালে অভিনয় করলেন, নাম কুড়োলেন। এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও ওটিটি কন্টেন্টে যুক্ত হলেন। প্রশংসিত হলেন সেখানেও। ক্যারিয়ারের সর্বশেষ জাতীয় পুরস্কার যখন পেলেন, তখন তিনি হুইল চেয়ারে। বয়স, ক্লান্তি, অবসর...এই শব্দগুলো কে 'ব্রাত্য' ঘোষণা করার এমন দৃষ্টান্ত দেখিনি খুব আর! 

সুরেখা সিক্রি অল্পবয়সেই শুরু করেছিলেন অভিনয়!

'দ্য ওয়ার্ল্ড'স ফাস্টেস্ট ইন্ডিয়ান' সিনেমাতে অ্যান্থনি হপকিনস বৃদ্ধ বয়সে যাচ্ছিলেন এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সবাই যখন তাকে নানা রকম বিপদের ভয় দেখাচ্ছে, তখন তিনি বলেছিলেন, এই বয়সে যে বেঁচে আছি, সেটাই তো অনেক। এখন আর বিপদের ভয় দেখাচ্ছো কেন বাপু? কথাগুলো যেন সুরেখা সিক্রিরই! যিনি বাহাত্তর বয়সে এসেও আরো অভিনয়ের সুযোগের জন্যে হাপিত্যেশ করেন। যিনি চুয়াত্তর বছর বয়সে এসে যুক্ত হন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নির্মাণের সাথে! যিনি বলেন, আরো ভালো ভালো কাজ করা বাকি! 

আবার লক্ষ্য করি, বিস্তর সব অর্জন আর গৌরবের পাশে হেঁটে চলা এক অনমনীয় দৃঢ়তার মানুষকেও। অর্থকষ্টও কম ছিলো না তাঁর। তবুও হাত পাতেন নি কারো কাছে। কেউ টাকা দিতে চাইলেও শক্তভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিজে মরিয়া হয়ে অভিনয় করতেন, সুনাম-যশ-খ্যাতি'র পাশাপাশি হয়তো একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকবার আশায়। হয়তো। হয়তো না। জানা যায়নি। যাবেও না।

তিনবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও! 

সংস্কৃতিজগতের গুণী এই মানুষটি যাবজ্জীবন বহু-বিচিত্র চরিত্রের মারফতে হাসিয়েছেন। কখনো কাঁদিয়েছেন। খলচরিত্রে অভিনয় করে মানুষকে বিক্ষুব্ধও করেছেন। তবে এসব সাময়িক। স্থায়ী যদি কিছু থাকে, তবে তা পর্দার পেছনে এই মানুষটির জীবনযাপনের অসাধারণত্ব। তার জীবন থেকে দেওয়া শিক্ষায় তিনি হার না মানার, হাল না ছাড়ার কথাই বলেছেন বারবার। শিরদাঁড়া শক্ত রাখতে বলেছেন। শক্ত রাখতে বলেছেন মানসিকতাকেও। জীবনের এই তো মানদণ্ড। বেঁচে থাকার এই তো প্রকৃষ্ট পদ্ধতি! 

এই অসাধারণ গুণী অভিনেত্রী, জীবন-যোদ্ধা'র প্রয়াণে রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা। ওপারে শান্তিতে থাকবেন, এটাই প্রার্থণা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা