বিটিভির 'নতুন কুঁড়ি'র 'নজরুল সঙ্গীত' বিভাগে যেবার প্রথম পুরস্কার পেলেন সুস্মিতা, তার এ সাফল্যে তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিলেন ফুপু ফিরোজা বেগম। শিক্ষার্থীর সাফল্যে শিক্ষক যেমন অধিক সন্তুষ্ট হন, বিষয়টি পুরোপুরি সেরকমই ছিলো। এই ঘটনার পরে সুস্মিতা আধুনিক সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীতের উপর অ্যালবাম বের করেছেন। দেশ-বিদেশের রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেলে গান গেয়েছেন নিয়মিত...

বেশ কিছুদিন আগে ইউটিউবে 'জাগো নারী' শিরোনামের এক গান দেখে খানিকটা চমকে গিয়েছিলাম। কাজী নজরুল ইসলামের জাগরণী সঙ্গীত 'জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা'কে যেভাবে থিমেটিক্যালি ট্রিবিউট দেয়া হয়েছে সেখানে, তা দেখে বিস্মিত হওয়াটা ছিলো স্বাভাবিকও। মেটাফোরিক্যাল কনসেপ্ট, অর্ণবের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং শিল্পী সুস্মিতা আনিসের গায়কী যেভাবে দুখু মিয়ার বিশেষ এই গানটিকে রিক্রিয়েট করলো, তা খানিকটা নতুনত্বেরও আভাস দিলো। পাশের দেশ ভারতে এ ধরণের থিমেটিক কাজ নিয়মিত হলেও আমাদের দেশে এরকম কাজের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। সেজন্যেই হয়তো প্রতিকূল স্রোতে দাঁড়িয়ে এরকম কাজ হতে দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়েছিলাম তখন।

'জাগো নারী' মুগ্ধ করেছিলো প্রচণ্ড! 

তবে সে মুগ্ধতার মাত্রাও ছাড়িয়ে গিয়েছিলো 'জয় হোক' নামের আরেক মিউজিক ভিডিও দেখে। কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান 'জয় হোক'কে যেভাবে প্রাসঙ্গিকতার মোড়কে নিয়ে আসা হয়েছে বিশেষ এ মিউজিক ভিডিওতে, বিস্ময়বোধে আক্রান্ত হয়েছি! স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে মেটাফোরিক্যালি  'বাংলাদেশ' এর যাপিত নানা বিষয়কে ক্রমশ পর্দায় নিয়ে আসার যে চমৎকারিত্ব, তা নিয়ে যত প্রশংসা করা হয় না কেন, কম হবে। কী ক্যামেরার কাজ, কী গূঢ় চিন্তা, কী বাঁধনের দুর্দান্ত স্ক্রিন প্রজেন্স...চাইলে আলাদাভাবে এই বিশেষ মিউজিক ভিডিও নিয়ে অনর্গল কথা বলা যায়;  এতটাই দারুণ ছিলো নির্মাণ। এ গানের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টেও ছিলেন অর্ণব। এবং আবারও নজরুল সঙ্গীত গেয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সুস্মিতা আনিস।

মেটাফোরিক্যালি এমন কাজ বাংলাদেশে হয়েছে খুব কম! 

অর্ণবকে আমরা সবাই চিনি। তার প্রতিভা নিয়েও আমরা ওয়াকিবহাল। কিন্তু এই দুই বিশেষ মিউজিক ভিডিও দেখে চোখ আটকালো 'সুস্মিতা আনিস' নামটির প্রতি। নজরুল সঙ্গীত এমনিতেই গাওয়া কঠিন। অথচ তিনি যেভাবে দুই মিউজিক ভিডিওতে গান দুটি গাইলেন, মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিলো না৷ নজরুল সঙ্গীত খুব যে বুঝি, এমনটাও না৷ কিন্তু গানের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম চড়াই-উতরাই গুলো বুঝতে পারছিলাম। নিয়মিত রেওয়াজ করা ছাড়া এরকম গলা হওয়ার যে প্রশ্নও আসে না, সেটাও একরকম নিশ্চিত ছিলাম। পাশাপাশি প্রশ্নও এসেছে মনে, এত দারুণ নজরুল সংগীত গাইলেন যিনি, তাকে নিয়ে মূলধারায় সেরকম আলোচনা নেই কেন?

সুস্মিতা আনিস সম্পর্কে জানতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে পাওয়ার দশাই হলো। জানলাম- নজরুল সঙ্গীতের বিখ্যাত নমস্য শিল্পী ফিরোজা বেগম তার ফুপু। ফুপুর কাছেই তার গানের হাতেখড়ি। হাতেখড়ির সে গল্পটাও মজার। সুস্মিতা আনিসের বয়স তখন তিন অথবা চার। ফিরোজা বেগম কলকাতা থেকে এসে তাদের বাসায় থিতু হয়েছেন। যখনই ফিরোজা বেগম হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে বসতেন, ছোট্ট সুস্মিতা সবকিছু ফেলে এসে দাঁড়িয়ে থাকতো ফুপুর সামনে। অবাক বিস্ময়ে গান গাওয়া দেখতো। ফুপুর ঠোঁটের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে গান গাওয়ার চেষ্টাও করতো। এভাবেই তার গানে হাতেখড়ি। 

তাছাড়া নজরুলের গান তো শুধু গান না, সেসব গানের পেছনে আধ্যাত্মিকতা আছে, দর্শন আছে, অজস্র সব গল্প আছে। গানের আড়ালের সেসব গভীর বিষয়, গল্প, দর্শন নিয়ে সুস্মিতার সাথে কথা বলতেন ফুপু ফিরোজা বেগম। সুস্মিতা এতসব ভারী বিষয়ের সবটা না বুঝলেও একটা জিনিস বুঝতো, গানগুলো নেহায়েত গান না। বরং গোটাটাই এক অমোঘ জীবনদর্শন। এভাবেই ধীরে ধীরে নজরুল সঙ্গীত নিয়ে আলাদা টান তৈরী হলো তার। ক্রমশ সুস্মিতার জীবনে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়ালো নজরুল সংগীত। 

নজরুল সঙ্গীতের প্রকৃত সুর কোনটি, তা নিয়ে বরাবরই বিতর্ক হয়। রবীন্দ্রসংগীত যেমন এক বাঁধাধরা নিয়ম মেনে চলে, নজরুলসংগীতে সেসব নেই। অনেকেই তাই এই জনরার গান করতে ইতস্ততবোধ করেন। কারণটাও সরল। ভুল সুর, শুদ্ধ সুর...এসব নিয়ে নজরুল সঙ্গীতে বচসা অফুরন্ত। অনেকেই তাই যেচে পড়ে বিতর্ক যেতে চান না। সজ্ঞানে এড়িয়ে চলেন নজরুল সঙ্গীতকে। কিন্তু তবুও সুস্মিতা আনিস পিছপা হন নি কখনও। ফুপুর দেখানো পথ ধরেই প্রচণ্ড সাহসী গানের জগতে যুক্ত হয়েছেন পাকাপোক্তভাবে। নিয়েছেন একের পর এক চ্যালেঞ্জ। হয়েছেন জয়ী। 

বিটিভির 'নতুন কুঁড়ি'র 'নজরুল সঙ্গীত' বিভাগে যেবার প্রথম পুরস্কার পেলেন সুস্মিতা, তার এ সাফল্যে তার চেয়েও বেশি খুশি হয়েছিলেন ফুপু ফিরোজা বেগম। শিক্ষার্থীর সাফল্যে শিক্ষক যেমন অধিক সন্তুষ্ট হন, বিষয়টি পুরোপুরি সেরকমই ছিলো। এই ঘটনার পরে সুস্মিতা আধুনিক সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীতের উপর অ্যালবাম বের করেছেন। দেশ-বিদেশের রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেলে গান গেয়েছেন নিয়মিত।

তবে অজস্র সাফল্য ও সম্ভাবনা থাকা সত্বেও কখনোই তিনি সঙ্গীতকে মূল পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন নি। আমেরিকায় গিয়ে গ্রাফিক ডিজাইনে পড়াশোনা করেছেন। এরপর দেশে ফিরে ব্যবসাকেই নিজের প্রধান পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তবে ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বরাবরই গানের চর্চা করেছেন। এখনও করছেন। ফিরোজা বেগম যতদিন বেঁচে ছিলেন, তার কাছে নিয়মিত তালিম নিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে ফিরোজা বেগমের ছোট ভাই এবং সুস্মিতা আনিসের চাচা আসাফুদ্দৌলার কাছ থেকে গানের শিক্ষা নিয়েছেন তিনি।

নজরুল সঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক সঙ্গীতেও মাঝেসাঝে পাওয়া যায় তাকে। তাহসান, মিনারের সাথে কোলাবোরেশানে গান গেয়েছেন। বেশ কিছু টেলিফিল্মের গানে কন্ঠ দিয়েছেন। সেসব গান জনপ্রিয়ও হয়েছে। তবে জনপ্রিয়তায় হয়তো সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে সম্প্রতি আসা 'বেলা বয়ে যায়' টেলিফিল্মের 'বেলা বয়ে যায়' গানটা। লুপে রেখে বারবার শোনার মতই এক গান। এবং গানের কথাগুলোও অর্থহীন প্রলাপের ফুলঝুরি না। টেলিফিল্মের মূলভাবের সাথে খুব দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক গানের কথা ও সুর।

সুস্মিতা আনিস মুগ্ধ করেছেন সঙ্গীতের বৈচিত্র‍্যে! 

কী নজরুল সঙ্গীত, কী আধুনিক সঙ্গীত... দুইক্ষেত্রে অসাধারণ গায়কীর পরিচয় দেয়া এ গুণী শিল্পী নিজের পেশার পাশাপাশি গানকেও নিয়মিত সময় দেবেন, এটাই আমাদের আশা। শিল্পী নিজেও বলেন- 

গান আমার কাছে এক সাধনার মতন। সারাদিনের সব কাজের পর একটু গানের রেওয়াজ না করলে মানসিক তৃপ্তি আসে না। 

আশা করবো, নজরুল সঙ্গীতের পাশাপাশি সমসাময়িক সঙ্গীতেও নিয়মিত যুক্ত থাকবেন তিনি। 'জাগো নারী' কিংবা 'জয় হোক' এর মতন যে সাহসী ও তুখোড় নির্মাণ, সেগুলোতেও তাকে নিয়মিত পাওয়ার প্রত্যাশা থাকবে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতে এরকম গুণী মানুষের নিয়মিত অংশগ্রহণ থাকলে, তা আমাদের জন্যেই মঙ্গল। সংস্কৃতি ক্ষেত্রের জন্যে মঙ্গল। আশা করি, নিয়মিত হবেন তিনি। আমাদের জন্যে। সংস্কৃতির জন্যে। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা