তাহসান, মিথিলা, সামান্য কয়টা টাকার কাছে আপনারা সম্পর্ককে বিক্রি করতে পারলেন? আপনারা আমাদের আইডল ছিলেন, অথচ আমাদের আবেগ নিয়ে আপনারা এভাবে 'ছিনিমিনি' খেলতে পারলেন?

বাংলাদেশের মানুষ যদি কোন বিষয়ে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ এবং পারদর্শী হয়ে থাকেন, সেটা অবশ্যই অন্যের জীবন নিয়ে ছিদ্রান্বেষণে। কার জীবনে কি ঘটছে, কে কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে, কিসে ধাক্কা খাচ্ছে, কার কি খুঁত, কার কোন দোষ- সেসব নিয়ে মুখরোচক আলোচনায় আমাদের জুড়ি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হাতের নাগালে থাকায় এসবের নমুনা আরও বেশি নজরে পড়ে। সেলিব্রেটিদের প্রফেশনাল লাইফের চেয়ে তাদের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেই আমাদের বেশি ভালো লাগে। কে কত ভালো কাজ করছে, নিজেকে ছাপিয়ে যাচ্ছে- সেসব না দেখে তার কয়টা বিয়ে হলো, কার সঙ্গে ডিভোর্স হচ্ছে, এসবেই আমাদের আগ্রহ বেশি। 

ইকমার্স সাইট ইভ্যালির ফেসবুক লাইভে তাহসান-মিথিলা একত্রে হাজির হয়েছেন গতকাল, তারপর থেকে ফেসবুকের নিউজফিডে ঢোকা যাচ্ছে না এই দুজনকে নিয়ে দেয়া পোস্টের ভিড়ে। একপক্ষ নিন্দায় মুখর, কেউ প্রশংসা করছেন, কেউ আবেগে ভাসছেন। প্রায় পাঁচ বছর পর একসময়ের জনপ্রিয় এই জুটি স্ক্রিন শেয়ার করলেন, হোক না সেটা ফেসবুক লাইভ। কিন্তু দর্শকদের বড় একটা অংশ এজন্য সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন তাহসান এবং মিথিলাকে। প্রায় শ'খানেক কমেন্ট এবং বেশ কিছু ফেসবুক পোস্ট পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম সমালোচনার যৌক্তিকতা, এবং সেগুলোর মধ্যে অসাড়ত্বের বাড়বাড়ন্ত ছাড়া তেমন কিছুই খুঁজে পেলাম না। 

গোটা ব্যাপারটা যাতে পণ্ডশ্রম মনে না হয়, সেজন্যেই এই লেখার অবতারণা। আমার সময়ের শ্রাদ্ধ তো হয়েছেই, আপনাদের জীবন থেকেও পাঁচটা মিনিট নাহয় কেড়ে নিই। নিজের লেজ কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার একটা উদাহরণ তৈরী হোক তবে! 

তাহসান-মিথিলা, আপনারা এটা করতে পারেন না! 

'এটা' মানে বিচ্ছেদের পর আবার একসঙ্গে কাজ করা, হোক সেটা কোন ব্র‍্যান্ডের জন্য প্রমোশনের কাজ করা। সুবে বাংলার ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এমনটা দেখার জন্য প্রস্তুত নয়। বিচ্ছেদ হয়েছে মানে আপনারা একে অন্যের সমালোচনা করবেন, অপরজন কিভাবে আপনাদের জীবনকে নরক বানিয়ে দিয়েছিল, ইনিয়ে বিনিয়ে সেসব বলবেন, আমাদের সিম্প্যাথি আদায়ের চেষ্টা করবেন। তা না করে আপনারা কিনা 'বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক' বজায় রেখেছেন! একসঙ্গে কাজও করছেন! ফেসবুক লাইভে এসে নির্লজ্জের মতো আড্ডা দিচ্ছেন! এটা কীভাবে সম্ভব? 

বিচ্ছেদ মানেই যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি নয়, গালমন্দ করা নয়, এটা আমরা বুঝতে চাই না। দুটো ভালো মানুষকেও সময় এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রয়োজনে আলাদা থাকতে হতে পারে। দুজন পারফেক্ট মানুষ একে অন্যের জন্যে 'পারফেক্ট' না হতেই পারেন। আলাদা হবার পরে তারা পরস্পরকে সম্মান দেখিয়েছেন, কুৎসা রটাননি, এখন তো একসঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানের দূত হিসেবেও কাজ করছেন। হলিউড-বলিউডে এমন অনেক নজির আছে, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরেও অনেকে একত্রে কাজ করেছেন, স্ক্রিন শেয়ার করেছেন। একত্রে কাজ করতে তাহসান-মিথিলার যদি আপত্তি না থাকে, আমাদের কেন এত আপত্তি? 

টাকার কাছে আপনারা সম্পর্ককে বিক্রি করতে পারলেন? 

'ইভ্যালি যদি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা না ঢালতো, এই ফেসবুক লাইভে আপনারা আসতেন? নিজের সম্পর্ক, নিজেদের বিচ্ছেদ নিয়ে আপনারা ব্যবসা করছেন! ছিঃ তাহসান! আর মিথিলা, আপনি আগে থেকেই ছিঃ!' - এরকম অভিযোগ অজস্র। দর্শকদের বড় একটা অংশের ধারণা, শুধুমাত্র টাকার জন্যেই তাহসান মিথিলার এই রি-ইউনিয়নটা হয়েছে। 

কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়, আবার পুরোপুরি সত্যিও নয়। অবশ্যই এই ফেসবুক লাইভে আসার জন্য দুজনই টাকা নিয়েছেন। তারা একটা ব্র‍্যান্ডের প্রচারণার জন্য কাজ করছেন, ফ্রি ফ্রি তো করবেন না সেটা। কিন্তু টাকার কাছে নিজেদের সম্পর্ককে 'বিক্রি' করেছেন টাইপের অভিযোগ তোলাটা কারো মানসিক অসুস্থতার ইঙ্গিতই স্পষ্ট করে। 

তাহসান-মিথিলা, যখন দুজনে দুজনার ছিলেন

তাহসান প্রায় দু'মাস আগে ইভ্যালির দূত হয়েছেন, মিথিলার সঙ্গে ফেসবুক লাইভ আড্ডায় আসার পরিকল্পনাও তখন কেউ করেনি হয়তো। তাহসান-মিথিলা যে তাদের 'সম্পর্ক'কে বিক্রি করছেন ব্র‍্যান্ডের কাছে, সেটার কোন প্রমাণ আপনাদের কাছে আছে? কোন লিখিত দলিল, কোন অডিও বা ভিডিও ক্লিপ? তাহলে কিসের ভিত্তিতে এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ? 

তাহসান-মিথিলা, আমাদের আবেগ নিয়ে আপনারা এভাবে 'ছিনিমিনি' খেলতে পারেন না! 

সম্পর্ক ওদের দুজনের, বিচ্ছেদ হয়েছে দুজনের, কষ্ট পেলেও তাহসান আর মিথিলাই পেয়েছেন, সময়ের সাথে সেই কষ্ট তারা ভুলেছেনও। কিন্তু ব্যথাটা যেন ফেসবুকে যারা আজেবাজে মন্তব্য করে বেড়ান, তারা পেয়েছেন। তাহসান মিথিলা একসঙ্গে ফেসবুক লাইভে এসে যেন বাংলাদেশী ফেসবুক ব্যবহারকারীদের পুরনো ক্ষতে খোঁচা দিয়েছেন। বাস্তবতা এরকম না হলেও, কমেন্ট এবং পোস্টের বহর দেখে এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক না। 

তবুও আপনাদের যদি মনে হয়, তাহসান এবং মিথিলা আপনাদের 'আবেগ' নিয়ে ছেলেখেলা করছেন, ব্যবসা করছেন, তাদেরকে সেই ব্যবসাটা করতে না দিলেই তো হয়। দুজনকেই আনফলো করুন, তাদের ফেসবুক লাইভ বয়কট করুন, তারা যে পণ্যের প্রচারণা করছেন, সেই পন্য কেনা থেকে বিরত থাকুন। সেটা না করে লাইভ দেখার জন্য হুমড়ি খেয়েও পড়বেন, আবার অকারণ গালাগালিও করবেন- ব্যাপারটা দ্বিমুুুখী আচরণ হয়ে যায় না? 

আপনারা আমাদের আইডল ছিলেন, অথচ... 

তাহসান বা মিথিলা, কেউই কখনও নিজেদের আদর্শ মানব বা মানবী হিসেবে দাবী করেননি। বলেননি আমাদের অনুসরণ করো, অনুকরণ করো। তারা নিজেদের জীবনটা পার করছেন। আপনি অন্ধের মতো তাদের অনুসরণ করেছেন, বিচ্ছেদ হবার পর তারা আপনার চক্ষুশূল হয়ে গেছেন! পছন্দ করলেন আপনি, ঘৃণাও করছেন আপনি- এখানে তাহসান বা মিথিলার রোলটা কোথায়? 

তাহসান-মিথিলার বিচ্ছেদে খারাপ লাগা কাজ করতেই পারে। কিন্তু বিচ্ছেদটাকে তারা যদি স্পোর্টিংলি নিতে পারেন, মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে একে অন্যকে সম্মান জানিয়ে পাশাপাশি দাঁড়াতে পারেন, প্রাক্তনের নতুন সঙ্গীকেও অভিনন্দন জানাতে পারেন, আপনাদের সমস্যাটা কোথায়? ব্যাপারটা মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী'র মতো হয়ে যাচ্ছে না অনেকটা? 

তাহসান, আপনার কষ্টটা আমরা বুঝতে পারছি... 

লাইভের একটা অংশে সঞ্চালক দুজনকেই বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন। মিথিলা যখন কথা বলছেন, তখন তাহসান চোখ নামিয়ে রেখেছিলেন। আবেগে টইটম্বুর কিউট আমরা তাহসানের সেই নিচের দিকে তাকিয়ে থাকাটাকে ভালোবাসা আর ভুলতে না পারার অসাধারণ এক সিম্বল বানিয়ে ফেললাম রাতারাতি। তাহসানের নিচের দিকে তাকিয়ে থাকার একশো একটা কারণ থাকতে পারে। আপনারা কিভাবে শিওর হচ্ছেন যে তিনি মানসিক বেদনায় পুড়ছিলেন বলেই নিচে তাকিয়ে ছিলেন? 

নিজের মতো করে সবকিছুর মানে না খুঁজে বরং তাহসান যে কথাগুলো উচ্চারণ করেছেন, সেগুলো মেনে চলার চেষ্টা করুন না। তাদের সম্পর্ক নিয়ে, বিচ্ছেদ নিয়ে এখনও যে দুজনকে, বিশেষ করে মিথিলাকে নোংরাভাবে আক্রমণ করা হয়, সেটা বন্ধ করার উদ্যোগ নিন। শুধু তাহসান-মিথিলা নয়, যে কোন সেলিব্রেটিকে বুলি করা হলে সেটার প্রতিবাদ করুন। একজন শিল্পীকে তার কাজ দিয়ে বিচার করুন, তার ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে নয়। শিল্পী কয়টা ভালো কাজ করলেন সেটা মনে রাখুন, কয়টা বিয়ে করলেন, সেটা মনে না রাখলেও চলবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই দুজন মানুষকে (তাহসান-মিথিলা) এবারকার মতো মাফ করে দিন না প্লিজ? ওদেরকেও ভালো থাকতে দিন, নিজেরাও ভালো থাকুন। তাতে চারপাশে শান্তিটা বজায় থাকে তো!


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা