'আধুনিক' তালেবানদের এই হালহকিকতের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়, তাদের নেতৃত্বে শিল্পসংস্কৃতির চর্চা কতটুকু হবে? এ প্রশ্ন কপালের ভাঁজ ক্রমশই গভীর করে। তিলে তিলে যে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়েছিলো মাথা উঁচু করে, সেখানে যে কালিগোলা আঁধার ছিটিয়ে দিয়েছে তালেবানরা, তা কাটিয়ে আবার কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কী না এখানের স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষেরা, সেও এক বড়সড় উদ্বেগের বিষয়..

বোধ করি, গত কিছুদিন ধরেই গোটা বিশ্বের নজর আফগানিস্তান এবং সেখানের ক্ষমতার মসনদে জুড়ে বসা তালেবানদের উপর। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি পালিয়েছেন। সেখানে এখন তালেবানদের একচ্ছত্র আধিপত্য। তারা জানাচ্ছে, আপাতত ইস্তফা দিচ্ছে তারা যুদ্ধে। এবার পুরোদমে নতুন ইসলামিক আফগানিস্তান গঠনের কাজ শুরু করবে তারা। তারা এও জানাচ্ছে, এবারের সরকার হবে অনেকটাই আধুনিক। কিন্তু গত কয়েকদিনের তাদের কার্যবিধি বিশ্লেষণ করলে তারা ভবিষ্যতে কতটুকু 'আধুনিক' হবেন, তার খানিকটা বাস্তব অবয়ব পাওয়া যায়। তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে ক্রমশই ফিরে আসে কুড়ি বছর আগের তাদের শাসনামলের দমবন্ধ সময়ের স্মৃতি। তারা কতটা আধুনিক হবেন এবার? নারীশিক্ষা কি মেনে নেবেন তারা? মানবাধিকার? শিল্পসংস্কৃতিরও বা কি দশা হবে? প্রশ্ন অনেক। 

সিনেমাহলগুলো বন্ধ! 

বিশ বছর আগে যখন তালেবানরা দখল করে আফগানিস্তান, নিমেষেই পুরো দেশ চলে যায় অন্ধকার এক সময়ে। কঠোর শরিয়া আইন চালু করায় বন্ধ হয় শিল্পসংস্কৃতির সমস্ত শাখাপ্রশাখা। সিনেমা, গান, অভিনয় পুরোপুরি হয় নিষিদ্ধ। পরবর্তীতে তালেবানরা যখন বিস্মৃত হয় মূলমঞ্চ থেকে, সৃজনশীল মানুষেরা আবার গড়ে তোলেন আফগানিস্তানের সংস্কৃতি অঙ্গনকে। ২০০১ থেকে শুরু করে ২০২১... এই টাইমফ্রেমে মনে রাখার মতন বেশকিছু কাজ হয় এই ইন্ডাস্ট্রিতে। সাহরা করিমির মতন চলচ্চিত্র নির্মাতারা ফ্রন্টলাইনে আসেন। চলচ্চিত্রে পিএইচডি করা প্রথম এবং একমাত্র আফগান নারী তিনি। তাঁর সিনেমা 'হাওয়া' 'মরিয়ম' 'আয়েশা' সমাদৃত হয় আন্তর্জাতিক বহু উৎসবে।

সাহরা করিমির মতন নির্মাতারা আছেন এই ইন্ডাস্ট্রির ফ্রন্টলাইনে! 

তিনি ছাড়াও সুনাম অর্জন করে আরো বেশকিছু নির্মাতা। সাবা সাহারের সিনেমার চমৎকারিত্ব নিয়ে বিস্তর কথা হয়। আরেক নির্মাতা শাহরবানু সাদাতের সিনেমা 'উলফ অ্যান্ড শিপ' এবং 'দ্য অরফানেজ' কান চলচ্চিত্র উৎসবে যায়। পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়াও আফগানিস্তানের সিনেমা 'বুজকাশি বয়েজ' মনোনয়ন পায় অস্কারে। 'ওসামা' গোল্ডেন গ্লোব জেতে। 'অ্যা লেটার টু দ্য প্রেসিডেন্ট' এর নির্মানের সৌকর্য সবাইকে চমকে দেয়। তালেবানরা অপসৃত হবার পরে এ দেশের নির্মাতা, কুশীলব থেকে শুরু করে শিল্পসংস্কৃতির সাথে যুক্ত মানুষজন যেভাবে বিপুল উৎসাহে নেমে পড়ে ক্ষত মেরামতে, এবং যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়ায়, তা নিয়ে বিস্তর প্রশংসা করেন বহু সংবেদনশীল মহল। 

শাহরবানু সাদাতের সিনেমা বিস্তর প্রশংসিত হয়েছে! 

কিন্তু শনির দশা যে কাটেনি মোটেও, তা প্রমাণিত সত্য। তালেবানরা আবার প্রেক্ষাপটে। চারদিকে ফের ঘোর অমানিষা। নির্মাতা সাহরা করিমি আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি একটি চিঠি লিখেছেন, যে চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা পৃথিবীতে। সে চিঠি থেকে একটি বিষয় বিলক্ষণ স্পষ্ট, তালেবানদের এবারকার আক্রমণের লক্ষ্যের প্রধানতম অবস্থানে আছেন সৃজনশীল মানুষেরা। বিশ বছর আগে যখন তারা ক্ষমতার চকচকে চৌকিতে বসেছিলো, সেবারেও তারা রেয়াত করেনি এই শিল্পস্রষ্টাদের। এবারই বা কেন করবেন? ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের এক জনপ্রিয় কৌতুকাভিনেতা কে তারা হত্যা করেছে। বর্ষীয়ান এক কবিকেও তারা খুন করেছে৷ রেহাই পাননি সরকারের সংস্কৃতি ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধানও। নারীশিক্ষা ইতোমধ্যেই বন্ধ হওয়ার পথে। মেয়েদের ধরে ধরে 'শিশুবধূ' হিসেবে বিয়ে দেয়া হচ্ছে তালেবানদের সাথে। খোলামকুচির মতন মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে৷ ছাড় পাচ্ছে না শিশুরাও।

তালেবানরা কতটুকু 'আধুনিক' হতে পারবে! 

'আধুনিক' তালেবানদের এই হালহকিকতের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়, তাদের নেতৃত্বে শিল্পসংস্কৃতির চর্চা কতটুকু হবে? এ প্রশ্ন কপালের ভাঁজ ক্রমশই গভীর করে। তিলে তিলে যে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়িয়েছিলো মাথা উঁচু করে, সেখানে যে কালিগোলা আঁধার ছিটিয়ে দিয়েছে তালেবানরা, সে নিঃসীম অন্ধকার কাটিয়ে আবার কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কী না এখানের স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষেরা, সে এক বড়সড় প্রশ্ন। আফগানিস্তানের ক্যামেরা-সেলুলয়েড-কলমের পরিণতি কি হবে, অমিত সম্ভাবনাময় এই ইন্ডাস্ট্রি আবার কবে মাথা তুলে দাঁড়াবে, আদৌ দাঁড়াতে পারবে কি না, যে থমথমে সময় শুরু হয়েছে, সে সময়ের দ্রুত যবনিকাপাত হবে কি না...সবখানেই অনিশ্চয়তা, কুয়াশা।

তবে আশা করি, খুব দ্রুতই এসব প্রশ্নের সমাধান মিলবে। অশান্ত সময় আবার স্থির হবে। এই গুমোট সময়ে দাঁড়িয়ে সেদিনের অপেক্ষা করা ছাড়া করার কিছু নেইও। তাই, আপাতত উজ্বল সেই দিনের অপেক্ষাতেই আমরা সবাই...


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা