শাহরুখ, সালমান, আমিরের সিনেমা যখন ফ্লপ হচ্ছে, সেই একই সময়ে থালাপতি বিজয়ের সিনেমার গল্প দূর্বল হওয়া সত্বেও সিনেমা কেন হচ্ছে হিট? মোহনলালের পরবর্তী জেনারশনের কারো কেন কোনো স্টারডম নেই? বলিউড-মলিউডে যখন 'স্টার কালচার' পড়তির দিকে, তখনও 'স্টারডম' কিভাবে টিকে আছে তামিলে?

অনুরাগ কাশ্যপের একটা ইন্টারভিউ'তে বেশ অকপটভাবেই তিনি বলছিলেন-

বলিউডের 'স্টার কালচার' এখন নেই বললেই চলে। 'স্টারডম' হয়তো খানিকটা টিকে আছে। কিন্তু সে 'স্টারডম' দিয়ে কোনো একটা দূর্বল সিনেমাকে বক্স অফিসে হিট করাবে, এমন ক্ষমতা এখন কোনো হিরোরই নেই। 

কথাটা ভুলও না। মহামারীর পরে বলিউডের ফিল্মোগ্রাফি'টা যদি কেউ দেখেন, তাহলেই এ সত্যের সত্যতা পাবেন ভালোভাবে। মহীরুহ তিন খান- শাহরুখ, সালমান, আমির... তিনজনই বক্স অফিসে হতাশা কুড়িয়েছেন। অক্ষয় কুমার তো রীতিমতো ফ্লপের মহাসমুদ্রেই অবগাহন করছেন। এমন কোনো তারকা নেই বলিউডে, যিনি খুব ভরসা করে বলতে পারছেন- তার সিনেমা হিট হবে! বা, যিনি একাই 'ওয়ান ম্যান আর্মি' হয়ে ব্যবসাসফল করবেন সিনেমাকে! হিন্দিভাষী মানুষজন এখন যে শুধুমাত্র বিশেষ কোনো তারকাকে দেখতে সিনেমাহলে যাবে না, গল্প ভালো না হলে সে সিনেমাকে ডিফেন্ড করবে না, সেটাও প্রায় বুঝে গেছে সকলেই। 

বলিউডের মত একই কথা প্রযোজ্য মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রেও। মোহনলাল ও মামুত্তির মত লিজেন্ডদের ভরসায় যদিও এখনো সিনেমাহলে দর্শক আসে, কিন্তু এই দুই হিরোর পরবর্তী জেনারেশন সেরকম ফ্যানবেজ তৈরী করতে পারেনি এখনও। দুলকার সালমান, নিভিন পৌলি, ফাহাদ ফাসিল কিংবা টভিনো থমাস এর সিনেমার গল্প যদি খারাপ হয়, তাহলে স্টারডম দিয়ে সে সিনেমার ভরাডুবি তারা ঠেকাবে... এমনটা ভাবাটা এখনও 'আষাঢ়ে গপ্পো' হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। এমনকি, যে মোহনলাল ও মামুত্তির স্টারডমের কথা শুরুতেই বলেছিলাম, গল্প ভালো না হবার কারণে তাদের সিনেমাও সাম্প্রতিক সময়ে ফ্লপের মুখ দেখেছে। যদিও, এও ঠিক, মলিউড আগে থেকেই কন্টেন্ট নির্ভর সিনেমায় বিশ্বাসী। তবুও যতটুকু 'স্টার কালচার' ছিলো তাদের, সেটুকুও ক্রমশ যেভাবে উবে যাচ্ছে, তা বলিউডের বর্তমান স্থানাঙ্কেই যেন ঘোর মদত দিচ্ছে। 

বিস্ময় এখানেই। কারণ, ঠিক এই প্রসঙ্গেই সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টান্তের মুখোমুখি করছে তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। আশেপাশের সব ইন্ডাস্ট্রিতে অজ্ঞাত রাহুর গ্রাসে তারকাদের দ্যুতি যখন ক্রমশই কমছে, ঠিক তখনও সে রাহুর আঁচ মোটেও লাগেনা তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে। কিভাবে? একটা উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। দক্ষিণের অন্যতম সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের সিনেমা 'বিস্ট' মুক্তি পেলো এ বছরে। অধিকাংশ মুভি ক্রিটিক'ই 'নেগেটিভ রিভিউ' দিলেন। ওয়ার্ড অফ মাউথও ছিলো মিশ্র। কিন্তু তা সত্বেও দুর্দান্ত ওপেনিং হলো সিনেমার। সিনেমা মুক্তির আগে মাঝরাত্তিরে সিনেমাহলের সামনে ভক্তদের ভীড়, হিরোর জায়ান্ট কাটআউটে ফুলের মালা, আতশবাজি আর সবাই মিলে সেলিব্রেট করা...প্রিয় নায়কের সিনেমাকে কেন্দ্র করে যে উৎসব, তা বজায় রইলো পুরোপুরিই। ফলাফল- গল্প দূর্বল হওয়া সত্বেও 'বিস্ট' উতরে গেলো ভালোভাবে। বোঝা গেলো স্টারডমের ক্ষমতাও৷ একই কথা প্রযোজ্য, দক্ষিণের আরেক সুপারস্টার অজিতের ক্ষেত্রেও। তার সিনেমা 'ভালিমাই' ফিল্ম ক্রিটিকদের কাছ থেকে তির্যক বাক্য শুনেও মুখ থুবড়ে পড়েনি। ভক্তরা ঠিকই মহাপতনের হাত থেকে বাঁচিয়েছে সিনেমাকে। 'স্টারডম' এর প্রভাবে 'ভালিমাই' করেছে ভালো ব্যবসাও। 

তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে 'থালাপতি বিজয়' এর স্টারডম বরাবরই ঈর্ষণীয় 

তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে এই যে 'স্টারডম' এর বাড়বাড়ন্ত,  এর পেছনে তারকাদের নিজস্ব কিছু গুণাবলী তো রয়েছেই, তবে তার চেয়েও বড় একটা কারণ হচ্ছে- সিঙ্গেল স্ক্রিনের উপস্থিতি৷ ভারতের সবগুলো প্রদেশের মধ্যে তামিল নাড়ুই মূলত সে স্থান, যেখানে সংখ্যার হিসেবে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমাহল আছে, মোটমাট মিলিয়ে যা ১৫৪৬টি। আর 'সিঙ্গেল স্ক্রিন' এর এই দর্শকেরাই যে বাঁচিয়ে রাখে 'স্টারডম' এর আগুনকে, সেটাও জানা সবার৷ বড় বড় শহরগুলোতে যেখানে মাল্টিপ্লেক্স বাড়ছে ক্রমশ আর কমছে 'সিঙ্গেল স্ক্রিন, সেখানে এই বৈপরীত্যই মূলত তামিল ফিল্ড ইন্ডাস্ট্রির 'স্টার কালচার'কে এখনও রেখেছে প্রাসঙ্গিক। রেখেছে আলোচনায়। 

সিনেমাকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ

যদিও, 'স্টারডম' রক্ষার এ মিশনে তামিল ইন্ডাস্ট্রি একা না,  পাশাপাশি আছে তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও। এখানেও বজায় আছে 'স্টারডম' এর প্রভাব। সাম্প্রতিক সময়ে এই ইন্ডাস্ট্রি হিট সিনেমা বানিয়েছেও প্রচুর। যদিও এখানে গলার কাঁটার মত একটু খচখচানিও আছে। সেটি হচ্ছে- রিসেন্ট কিছু সিনেমার পারফরম্যান্স। সাম্প্রতিক সময়ে তেলেগু'র বড় বড় কিছু স্টারের সিনেমা পরপর ফ্লপও করেছে। চিরঞ্জীবী- রাম চরণের 'আচারিয়া', রানা দাজ্ঞুবতীর 'ভিরাটা পারভাম', নানির 'আন্তে সুন্দারানিকি'র মত সিনেমা খুব ভালো ব্যবসা করেনি। সারপ্রাইজ হিসেবে আবার দুলকার সালমানের দ্বিতীয় তেলেগু সিনেমা 'সীতা রামাম' মাঝখান দিয়ে করেছে ভালো ব্যবসা। 'কার্তিকেয়া টু' নামের আরেক সিনেমাও হয়েছে জনপ্রিয়, যে সিনেমার অভিনেতাদের মধ্যে 'এ গ্রেড' তারকা নেই একজনও। তেলেগু'র অডিয়েন্স খানিকটা যে 'স্টারডম' এর প্রভাব থেকে বেরোতে চাইছে, সেটারই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে এ সিনেমাগুলোর ফলাফল। যদিও, এই প্রভাব থেকে আদৌ তারা বেরোতে পারবে কি না, প্রশ্ন থাকে সেখানেও।

তামিল, তেলেগু'র এই 'স্টার কালচার' এর মাঝখানে প্রসঙ্গত উঠে আসে আরেকটি বিষয়ও। দূর্বল গল্পের সিনেমাকে 'স্টারডম' দিয়ে বাঁচানো যেতে পারে, সেটা মোটামুটি উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট। কিন্তু, গল্প যদি ভালো হয় আর 'স্টারডম'ও যদি থাকে ঠিকঠাক, তাহলে কি হতে পারে, তার খুব ভালো এক উদাহরণ- লোকেশ কানাগরাজের 'বিক্রম।' কমল হাসান, বিজয় সেথুপতি, ফাহাদ ফাসিল আর ক্যামিও দৃশ্যে সুরিয়া, সে সাথে ক্রিস্পি কমপ্যাক্ট একটা গল্প... 'বিক্রম' খুব ভালোভাবেই বুঝিয়েছে- গল্প জম্পেশ হলে আর সে গল্পের সিনেমা তারকা-ঠাসা থাকলে... সে সিনেমাকে থামানো যায় না। যার ফলাফল হিসেবেই 'বিক্রম' এখন পর্যন্ত ঘরে তুলেছে চারশো কোটি রূপি! কোথায় গিয়ে থামবে এ সিনেমা, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত নন কেউ। ধানুশের 'থিরুচিত্রামবালাম'ও এমনই আরেকটা উদাহরণ। মিষ্টি রোম-কম এ সিনেমা ধানুশের হাইয়েস্ট আর্নিং সিনেমাগুলোর মধ্যেই অন্যতম। অথচ আহামরি কারিকুরি কিছুই নেই এখানে৷ আছে এক মিষ্টি গল্প আর ধানুশের স্টারডম।

যদিও তামিল-তেলেগু'র 'স্টারডম কালচার' সহজেই ফুরোচ্ছে না, তবে এও ঠিক, ভালো গল্প না হলে শুধুমাত্র স্টারডম দিয়ে আগের মত তুমুল ব্যবসাও করা যাবেনা। বিজয়ের 'বিস্ট' কিংবা অজিতের 'ভালিমাই' হয়তো দূর্বল গল্প সত্বেও ফ্লপ হয়নি, কিন্তু, রিয়েল সিনারিও এটাই, সাধারণ দর্শক খানিকটা হলেও কম গিয়েছে সিনেমাহলে। তারা পজেটিভ ওয়ার্ফ অফ মাউথের জন্যে অপেক্ষা করেছে। যখনই দেখেছে 'ওয়ার্ড অফ মাউথ' পজেটিভ না, তারা থিয়েটারে না গিয়ে সিনেমার 'ওটিটি রিলিজ' এর জন্যে অপেক্ষা করেছে। অর্থাৎ, 'ওটিটি' আলাদা একটা কার্যকর অপশন হিসেবেই এখন চলে এসেছে তাদের সামনে। এখন এই অপশন সুদূর ভবিষ্যতে কলিউডের 'স্টার কালচার'কে নিকেষ করতে পারবে কি না, দর্শকের রুচিতে বড়সড় রূপান্তর আনবে কি না,  তা হয়তো সময়ই বলবে। তবে, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে সে সম্ভাবনা যে বহু দূরের কোনো ভবিষ্যৎ, সেটাও আপাতত বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলা যায়। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা