অসাধারণ অভিনয় করেন তিনি, দেশের মানুষ অভিনেত্রী হিসেবেই চেনেন তাকে। পাশাপাশি তিনি দারুণ নাচেন, গাইতে পারেন, মডেলিংয়েও স্বতঃস্ফূর্ত। শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে চড়েছেন সাফল্যের চূড়ায়, তিনি তারিন জাহান...

১৯৮৪ সালে প্রথমবারের মতো কুমিল্লায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একটি নৃত্য পরিবেশন করেছিলো একটি ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে। তার পরিবেশন করা নৃত্য এতোটাই আলোড়ন তুলেছিলো যে সেই সময় নামকরা কয়েকটি পত্রিকায় সে অনুষ্ঠানের নানা রকম ছবির মাঝে সেই ছোট্ট মেয়েটির ছবিও প্রকাশিত হয়। 

সেই ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে কুমিল্লার পরিচিতি পায় সেই মেয়েটি। সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান হলেই ডাক পরতাে শিশু শিল্পী হিসেবে। ছােটবেলা থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। মা তাহমিনা বেগম বকুল ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ। তবে সংস্কৃতি মাধ্যমের প্রায় প্রতিটা শাখায় সেই মিষ্টি মেয়েটি যে, এতো জনপ্রিয়তা এবং প্রশংসা কুড়িয়ে জায়গা করে নেবেন মানুষের মনের গভীরে, তা হয়তো সেই সময় তার কাছের মানুষেরাও বুঝেননি। বলা হচ্ছে বাংলাদেশের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম গুনী এবং দক্ষ অভিনেত্রী তারিনের কথা। ১৯৭৬ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করা এই গুনি অভিনেত্রীর জন্মদিন আজ। 

এক হিসেবে বলা যায় ১৯৮৫ সালে জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিভা অন্বেষণ ‘নতুন কুঁড়ি’ দিয়েই সংস্কৃতি মাধ্যমে তারিনের যাত্রা শুরু হয়। 'নতুন কুড়ি'র সেইবারের আয়োজনে অভিনয়, নাচ এবং গল্প বলাতে প্রথম হন তারিন। দেশের একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল বিটিতে প্রচারিত হবার দরুন সেইসময় থেকেই সাধারন দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন তিনি। তিনি ওস্তাদ হাসান ইকরাম উল্লাহ’র কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিয়েছিলেন। তখন থেকেই শিশু শিল্পী হিসাবে জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবেই ছোট পর্দায় পথ চলা শুরু। সেই পথচলা আজো সাফল্যের সাথেই চলছে অবিরামভাবে। 

পারিবারিক জীবনে পাঁচ বােনের মধ্যেই তিনি ছিলেন সবার ছােট। যেহেতু বাসার ছোট মেয়ে, তাই বাবা-মায়ের সাথে সাথে অন্যসব বােনদের কাছ থেকেই পেয়েছেন অফুরন্ত আদর এবং ভালবাসা। বিভিন্ন সময়ে তারিন নিজেই বলেছেন যে, সংস্কৃতি মাধ্যমে পথচলায় পরিবারের সেই সাপোর্ট তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেকটা পথ। 

অভিনয়ের পাশাপাশি মডেলিং, নাচ আর গানেও রয়েছে তার পারদর্শিতা। ছোটবেলা থেকেই কাজ করার কারনে সহজেই পরিচিত মুখ হিসেবে স্বীকৃতি পান তারিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটা মাধ্যমেই তারিন হয়ে উঠেন আরও পরিপক্ব। তবে অভিনেত্রী হিসেবে তিনি ছাড়িয়ে যান বাকি সব সত্ত্বাকে। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় ‘এইসব দিন রাত্রি’ ধারাবাহিক নাটকে প্রথম শিশু চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথমবার শিশুশিল্পী হিসেবে টেলিভিশনে আত্মপ্রকাশ করেন তারিন জাহান। 

এরপর ১৯৮৮ সালে আরেক প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারের  উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ধারাবাহিক নাটক ‘সংসপ্তকে’ একটি শিশু চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তবে প্রথমবারের মতো প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন সেই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা তৌকির আহমেদের সাথে ‘কাঁঠাল বুড়ি’ নাটকে। এই নাটকের মধ্যদিয়ে শিশুশিল্পী তকমা সরিয়ে অভিনেত্রী হিসেবে নতুন করে যাত্রা শুরু হয় তারিনের। 

অরুন চৌধুরী পরিচালিত ‘কাগজের ফুল’ ধারাবাহিক নাটকে তারিনের অভিনয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে রাতারাতি তারকা খ্যাতিও পান তিনি। চয়নিকা চৌধুরীর 'মায়া',  মোহন খানের 'বেলাভূমি' পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় 'জোনাকি' তাকে ইন্ডাস্ট্রিতে পায়ের নীচে শক্ত মাটি এনে দেয়। 'জোনাকি' নাটকে শাহজাহানের সাজানো বাগান হুগাইয়া গেছে- সংলাপ এখনো ব্যাপক জনপ্রিয়। এছাড়া ইউটার্ন, ফুলের বাগানে সাপ, বছর কুড়ি পরে, হারানো আকাশ তাকে অভিনেত্রী হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। 

তারিন জাহান

তবে আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত 'গাঁও গেরামের কিসসা' তাকে অসম্ভব জনপ্রিয়তা এনে দেয় সারাদেশেই। ইলেকশন, নাকফুল, একদিন ছুটির নিমন্ত্রনে, আমার বউ দারোগা, প্যাকেজ সংবাদ, কাগজের ভুল, প্রিয় বান্ধবী, সাংরিলা, ননাই, শেষ কথাটি, চোখের বালি, সবুজ ভেলভেট, দেবদাস, মধ্যাহ্ন ভোজ হবে কি, জলকনা, রাত্রির ফুল, মঙ্গলী, বউ চোর, জামাই পাগল, আলতা রাঙা মন, হঠাৎ বসন্ত, ভূত অদ্ভুত, বিকেল বেলার গল্প, রুপা ভাবি সহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেন তিনি। দুইবার দর্শক জরিপ এবং একবার সমালোচক ক্যাটাগরিতে মোট তিনবার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করেছেন তারিন। গত বছর 'রুপা ভাবী' নাটকের জন্য আরটিভি স্টার পুরস্কারেও মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। 

আসাদুজ্জামান নূর, আফজাল হোসেন, জাহিদ হাসান, আজিজুল হাকিম, শহীদুজ্জামান সেলিম, তৌকির আহমেদ, টনি ডায়েস, পার্থ বড়ুয়া, মীর সাব্বির, অপূর্ব, মোশাররফ করিম, রিয়াজ থেকে শুরু করে এই ঈদে সালমান মুক্তাদিরের মতো জুনিয়র অভিনেতার সাথে কাজ করেছেন তিনি। তবে মাহফুজ-তারিন জুটি দর্শকদের কাছে আলাদা একটি জায়গা করে নিয়েছিলো। 

পরবর্তীতে এই সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা অপূর্বর সাথেও জুটি বেধে বেশকিছু জনপ্রিয় নাটক উপহার দেন তিনি। তাদের জুটি এখনো একটি আবেদন ধরে রেখেছে। শমী কায়সার, বিপাশা হায়াত, আফসানা মিমি, বিজরী বরকতউল্লাহ, পরবর্তীতে তানিয়া, সুইটি, ঈশিতা, অপি করিম, শ্রাবন্তী, রিচি সোলায়মান, তিশা, জয়া আহসান থেকে এই সময়ে মেহজাবীন, তানজিন তিশা প্রায় তিন প্রজন্মের সকল দক্ষ এবং শক্তিশালী অভিনেত্রীদের সাথেই পাল্লা দিয়ে এখনো অভিনয় করে যাচ্ছেন তারিন। 

নাচ, মডেলিং আর অভিনয়ে জনপ্রিয় হলেও সংগীত নিয়ে তেমন নিয়মিত ছিলেন না তারিন। তবে ২০১১ সালের ঈদ উল আযহায় ‘আকাশ দেব কাকে’ শিরোনামে প্রথম একক অ্যালবাম বের করেন। সেখানে ১০টি গান ছিল যার মধ্যে ৪ টি দ্বৈত। এই দ্বৈতগানগুলো তিনি কলকাতার রাঘব চ্যাটার্জী ও রূপঙ্কর বাগচী এবং বাংলাদেশের ইবরার টিপু ও তপন চৌধুরীর সঙ্গে গেয়েছিলেন। এছাড়া ‘স্বপ্নগুলো জোনাক পোকার মতো’ নাটকের শিরোনাম গানেও কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি।

ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে এসে তারিন তার দুই বোন শামিমা নাহরিন জাহান তুহিন এবং নাহিন কাজী ‘তানা’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘এ নিউ ট্রি এন্টারটেইনমেন্ট’ এর যাত্রা শুরু করেন। ইতিমধ্যে বেশকিছু দর্শক-নন্দিত নাটক প্রযোজনা করেছেন তারিন।

দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে তারিনের। সজল খালেদ পরিচালিত সিনেমা ‘কাজলের দিনরাত্রি’তে তার অভিনয় প্রশংসা পায়। এখন দ্বিতীয় সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় এই গুণী তারকা। লকডাউন শুরুর আগেই কলকাতায় তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সিনেমা ‘এটা আমাদের গল্প’-এর কাজ শেষ করে এসেছেন। মানসী সিনহা পরিচালিত এই সিনেমাতে প্রায় দেড় সপ্তাহ টানা কাজ করেছেন তারিন। তার অংশের দৃশ্য ধারণের কাজ শেষ। গত মার্চেই ডাবিং করার কথা ছিল। 

কিন্তু তার আগেই করোনার কারণে সব ওলট-পালট হয়ে গেল। দেশে ফিরেই লকডাউনের কারণে আর কোনো কাজ করতে পারেননি। তারিন একটি দৈনিকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে জানান, ‘এটি আমার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সিনেমা। আমার চরিত্রটি এত সুন্দর যে আমি নিজেই অভিভূত। সিনেমার জন্য এক ধরনের অপেক্ষায় আছি বলতে পারেন। গল্পে আমি বাংলাদেশের একটি মেয়ে হিসেবেই অভিনয় করেছি। 

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে একটু একটু করে নিজেকে বদলেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী তারিন। নাচ, গান, অভিনয় বা মডেলিং সব মাধ্যমেই তার দক্ষতা প্রমাণ করেছেন তিনি। মাঝে কিছুদিন মিডিয়াতে কম দেখা গেলেও বর্তমানে সবখানেই সরব উপস্থিততি তার। একটি সাক্ষাৎকারে তারিন বলেছিলেন- 

‘একজন অভিনয়শিল্পীকে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে যতটা কষ্ট করতে হয়, তারচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয় সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে। জনপ্রিয় একজন শিল্পীর কাছে দর্শকদের প্রত্যাশার মাত্রা দিনকে দিন বাড়তে থাকে। আমার জন্যও বিষয়টি একই রকম। আমরা তো শিখে শিখে কাজ করে আসছি। আজ আমি যে অবস্থানে আছি তা কিন্তু অনেক সাধনা করে আসতে হয়েছে। আমরা সব সময় ভালোটা দেখানোর চেষ্টা করেছি। বর্তমানে যারা কাজ করছেন তারাও ভালো করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে তারকা হওয়ার প্রবণতা বেশি। ফেসবুকে ফলোয়ার বেশি হলেই কিন্তু তারকা হওয়া যায় না। মানুষ চিনতে হবে। মনে রাখার মতো চরিত্র তৈরি করতে হবে'। 

কিছুটা বিরতি দিয়ে গত ঈদে বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছেন তারিন। ফারিয়া হোসেনের রচনায় ও ইমদাদুল হক মিলনের পরিচালনায় ‘সেদিন বৃষ্টি এসেছিলো’, ফারিয়া হোসেনের রচনায় ও চয়নিকা চৌধুরী পরিচালনায় ‘মেঘলা মনের মেয়ে’, সাজ্জাদ হোসেন খাদেমের গল্পে গোলাম সোহরাব দোদুলের পরিচালনায় ‘বনভোজন’, এস এ হক অলিকের পরিচালনায় ‘কথা শুনতে হবে’, অনুরূপ আইচের রচনা ও ওয়াহিদ পলাশের পরিচালনায় ‘একটি রাত’ নাটকেও দেখা গেছে তাকে। 

গতবারের মতো এবারো বেশকিছু কাজে দেখা মিলেছে তারিনের। চয়নিকা চৌধুরীর ‘গৃহমায়া’, তানিম রহমান অংশুর ‘সাহসীকা’ এবং মোশাররফ করিমের সাথে ‘অনাত্নীয় দম্পতি’ নাটকে অভিনেত্রী তারিন তার দক্ষতার দ্যুতি ছড়িয়েছেন। তবে হাসিব আহমেদের ‘মধুচক্র’ নাটকে তার উপস্থিতি প্রশংসা কুড়িয়েছে সকলের। তারিন আগেই জানিয়েছিলেন, 

‘এবারের ঈদে প্রত্যেকটি নাটকেই আমাকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে দেখা যাবে। একটি নাটকের চরিত্রের সঙ্গে আরেকটি নাটকের চরিত্রে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেকোন ধরনের চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় করতে আমি ভালোবআসি, কারণ অভিনয় আমার পেশা। আশাকরি দর্শকেরা হতাশ হবেন না। 

অভিনয়ের পাশাপাশি এখন রাজনীতির মাঠেও দেখা মেলে অভিনেত্রী তারিনের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাথে নিয়ে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামিলীগের নির্বাচনী প্রচারনায় তাকে দেখা গেছে সাবলীলভাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বিদেশ সফর করেও এসেছেন তারিন। সামনে হয়তো দায়িত্বশীল কোনো পদেও তাকে দেখা যেতে পারে। 

একনিষ্ঠতা, পরিশ্রম এবং ভালোলাগা দিয়ে নিজের অর্জিত অবস্থানকে ধরে রাখার পাশাপাশি তা আরও সমৃদ্ধ করতে তিনি কাজ করছেন বেছে বেছে। যেকোন ভিন্নধর্মী চরিত্রে তার উপর নির্মাতারা ভরসা করেন চোখ বুজে। সামনের দিনগুলিতে আরো অনেক সুন্দর এবং ভিন্নধর্মী কাজ নিয়ে তিনি আমাদের অন্তরে বিচরন করবেন আরো অনেকগুলো দিন এটাই কামনা।


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা