বক্স অফিসে ফ্লপ, অস্কারে সাতটি ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পেয়েও একটিতেও বিজয়ী না হওয়া... এ সিনেমার সাথে ঘটেছে বহুকিছুই। তবুও, এতকিছুর পরেও কিভাবে 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' হলো আইএমডিবির এক নম্বর সিনেমা? এবং কিভাবেই বা যুগের পর যুগ ধরে বজায় রাখলো এ শীর্ষস্থান?

একুশ বছরের এক যুবক, যে যুবক স্টিফেন কিং এর খুব বড়সড় এক ভক্ত, তার একবার ইচ্ছে হলো- স্টিফেন কিং এর কোনো গল্প অবলম্বনে সে শর্টফিল্ম বানাবে। যদিও এরকম হাই-প্রোফাইল লেখক এরকম অজ্ঞাতকুলশীল কাউকে নিজের গল্প দেবে কি না, তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ থাকলেও, সাহস করে যুবকটি প্রিয় লেখক স্টিফেন কিং'কে মেইল করে বসে একদিন। এবং, শুরু করে, দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা। এদিকে, স্টিফেন কিং এর ছিলো অদ্ভুত এক পলিসি। তিনি প্রতিবছরই নির্দিষ্ট সংখ্যক অ্যামেচার নির্মাতাদের মাত্র এক ডলার ফি'র এর বিনিময়ে নিজের গল্প দিতেন৷ ভাগ্যক্রমে, গল্পের প্রোটাগনিস্ট এই যুবকও সেই পলিসির বদান্যতায় একটি গল্পের অনুমতি পেয়ে যান। স্টিফেন কিং এর গল্প 'দ্য ওম্যান ইন দ্য রুম' অবলম্বনে পরবর্তীতে যুবকটি একটা শর্টফিল্ম বানানও। জনপ্রিয়ও হয় সেটি। শর্টফিল্মটি স্টিফেন কিং পছন্দও করেন।

এই ঘটনার ঠিক সাত বছর পরে স্টিফেন কিং, সেই তরুণ নির্মাতাকে আরেকটি গল্প দেন। এ গল্পটি বেশ স্পেশাল। কারণ, এ গল্প অবলম্বনে পরবর্তীতে এই নবীন নির্মাতা এমন এক সিনেমা বানান, যে সিনেমা অনেকের কাছে- বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমা। কারো কারো বিশ্বাস- এ সিনেমার চেয়ে ভালো কোনো সিনেমা হওয়া সম্ভব না আর।  আইএমডিবি'র চার্টেও যুগের পর যুগ ধরে যে সিনেমা ধরে রেখেছে শীর্ষস্থান। সিনেমার নাম- দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন৷ তরুণ সে নির্মাতার নাম- ফ্রাঙ্ক ডারাবন্ট।

মজার বিষয় হলো, স্টিফেন কিং এর 'রিটা হেওয়ার্থ অ্যান্ড শশাঙ্ক রিডেম্পশন' গল্প অবলম্বনে 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' এর যে স্ক্রিপ্ট ফ্রাঙ্ক ডারাবন্ট বানালেন, তা হলিউডের প্রায় সব প্রোডিউসাররাই পছন্দ করেছিলেন। এমনকি, লিজ গ্লোটজার, যিনি তখনকার সময়ের বিখ্যাত নির্মাতা, তিনি স্ক্রিপ্ট দেখে সঙ্গে সঙ্গেই ডারাবন্টকে অফার করেছিলেন তিন মিলিয়ন ডলার। জানিয়েছিলেন- এ সিনেমা তিনিই পরিচালনা করতে চান। ফ্রাঙ্ক ডারাবন্টের তখন সংকটকাল। নির্মাতা হিসেবেও খুব যে নাম করেছেন, এমন না। কায়ক্লেশেই যাচ্ছে সময়। তার কাছে তখন তিন মিলিয়ন ডলার বহুকিছু। তবু অদ্ভুতভাবেই তিনি সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন। জানালেন- এ সিনেমা আর কেউ না, তিনিই পরিচালনা করবেন! 

কিংকর্তব্যবিমুঢ় ওয়ার্ডেন! 

ক্রমশ কাজ শুরু হলো। প্রোডিউসার পাওয়া গেলো। টিম রবিনস ও মরগান ফ্রিম্যান যুক্ত হলেন। সে সময়ের তাবড়-তাবড় কলাকুশলীদেরও নির্মাণের সাথে যুক্ত করলেন ডারাবন্ট। শুরু হলো দক্ষযজ্ঞ।  দেখতে দেখতে একসময়ে শেষও হলো সব। সিনেমা মুক্তি পেলো প্রেক্ষাগৃহে। এরপর? কী হলো এরপর? সিনেমা জনপ্রিয় হলো? ব্লকবাস্টার হিট হলো? যদি এসব ভেবে থাকেন, তাহলে ভুল ভাবছেন। চমকের বিষয় এটাই, সিনেমাহলে খুব বাজেভাবে মুখ থুবড়ে পড়লো 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন!' 

যদিও বক্স-অফিসে ব্যর্থতার পেছনে সম্যক কারণও আছে। সেটাই বলছি এবার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারান্তিনোর 'পাল্প ফিকশন' এবং 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন' মুক্তি পেয়েছিলো একইদিনে। তারান্তিনোর 'পাল্প ফিকশন'কে এমনিতেই ধরা হয় পপ কালচার ফেনোমেননের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্মাণ হিসেবে, তার উপরে দ্য গ্রেট 'তারান্তিনো'র ফিল্ম, এরও উপরে ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যাটফর্মে একগাদা প্রাইজ পেয়ে এসেছে সিনেমাটি... এসব কারণের মিলিত যোগফলেই 'পাল্প ফিকশন' এর ধারেকাছে দাঁড়াতেই পারে না নবীন এ নির্মাতার অভিষেক সিনেমা। শুধু 'পাল্প ফিকশন'ই না, বেশ কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া 'ফরেস্ট গাম্প' এর জনপ্রিয়তাও তখন তুঙ্গে। এই দুই সিনেমার মাঝখানে পড়ে একরকম হারিয়েই যায় 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন।

দুর্ভাগ্য এখানেই শেষ না। অস্কারে সাতটি ক্যাটাগরিতে নমিনেশন পেয়েও প্রতিটিতে ব্যর্থ হয় 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন।' সিনেমাটি নিয়ে কোনোদিকেই যেন কোনো খুশির উপলক্ষ্য নেই। তবে, এতসবকিছুর পরেও ফ্রাঙ্ক ডারাবন্ট হাল ছাড়েন না। সিনেমাটির রি-রিলিজ হয় থিয়েটারে। এরপর টিভিতেও সম্প্রচার হওয়া শুরু হয়। এবং টিভিতে সিনেমাটি আসার পরেই ক্রমশ বিশেষ এক পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষজন কেন যেন এই সিনেমাটিকেই বাকিসব সিনেমার চেয়ে বেশি পছন্দ করা শুরু করে। আসে ইন্টারনেটের যুগ। সেসময়েও লক্ষ্য করা যায়- অন্যসব সিনেমা সাপেক্ষে 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন' এর অডিয়েন্স বিচিত্র, বিস্তীর্ণ। এভাবেই এগোতে এগোতে একসময়ে এসে আইএমডিবি'র শীর্ষস্থান দখল করে বিশেষ এ সিনেমা। এবং সময়ের নানা ফেরেও সে অবস্থান-চ্যুতি হয়না মোটেও। এবং ধারণা করা যায়- হয়তো সামনের দিকেও বজায় থাকবে এ অবস্থান! 

কেন 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' এত জনপ্রিয়? এ প্রশ্ন যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কেন এই সিনেমা এতদিন ধরে জনপ্রিয়? ১৯৯৪ সালে এ নির্মাণ মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তো পাল্টেছে বহুকিছু। সময় পাল্টেছে, জীবনমান পাল্টেছে, প্রযুক্তির কচকচানি পাল্টেছে। আমূল পরিবর্তন এসেছে রুচিতে, মানসিকতায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। এতকিছুর পরেও, এত পালাবদলের পরেও 'অক্ষয়' অবস্থানে কিভাবে আছে এই নির্মাণ? যদিও এ প্রশ্নের সাপেক্ষে অনেক কথাই বলা যায়, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বোধহয় এটাই- গল্পের চমৎকারিত্ব এবং চরিত্রগুলোর অন্যরকম দ্যোতনাই এই নির্মাণের 'অমরত্ব'র প্রধানতম কারণ। কিভাবে? সেটাই বলি এবার।

প্রথমত, আসি, গল্প-প্রসঙ্গে। যদিও 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' এর গল্প অনেকটাই অ্যান্ডি ডুফ্রেস্নের। এই ব্যাঙ্কার নিজের স্ত্রী ও স্ত্রী'র প্রেমিককে খুন করে আজীবনের জন্যে আসে কারাগারে। এখানে এসে সে ওয়ার্ডেনের রোষানলে পড়ে। আবার এই রোষকষায়িত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণও হয় তার। গল্পের আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র- রেডের সাথে এমন এক সম্পর্ক হয় অ্যান্ডির, যে সম্পর্ক 'একে অন্যের আশ্রয়স্থল' হওয়ার দৃঢ় অথচ অসংজ্ঞায়িত এক অনুভূতি দেয়। এই দুই চরিত্রের রসায়ন নিয়ে ভাবতে বসলে ক্রমশই আশাবাদী হতে হয়। ইতিবাচক হতে হয়। 

অ্যান্ডি-রেড! 

আবার শুধু তো এরাই না, গল্পে ক্রমশই আসে আরো চরিত্র, আরো সংকট। ওয়ার্ডেন নরটনের ক্রুর কর্মকাণ্ড, ব্রুকস এর মানবিক পরিনতি... সবকিছু মিলিয়ে চাইলেও এ গল্পকে নির্দিষ্ট কোনো জঁরায় ফেলা যায় না। কখনো থ্রিলার, কখনো মোটিভেশনাল, কখনো স্ক্যাম ড্রামা কিংবা কখনো সারভাইভাল... গল্পের পরতে পরতে এমনভাবে পালটায় সমীকরণ...  মুগ্ধতা কমে না। ঠিক এ কারণেই, নির্দিষ্ট কোনো অডিয়েন্স না, বরং, সব বয়সের সবাই নিজেদের মত করে ধারণ করে এ সিনেমার মর্মার্থ। মনে আছে, খুব অল্পবয়সে এই সিনেমা যখন দেখি, তখন যেসব বিষয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, বড় বয়সে আবার দেখতে বসে একই বিষয়গুলোতে মুগ্ধ হইনি ঠিক, তবে মুগ্ধতা বেড়েছিলো অন্য ক্ষেত্রে। যেটা বিস্ময়কর। পাল্প ফিকশন, গডফাদার ট্রিলোজি কিংবা টুয়েলভ অ্যাংগ্রি মেন এর কথা যদি বলি... এরা সবাই নির্দিষ্ট কোনো জঁরাকে রিপ্রেজেন্ট করলেও 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' এর ক্ষেত্রে আলাদা করে কোনো ট্যাগ না দিতে পারাটাই এ নির্মাণকে করে বিশেষভাবে স্বকীয় কিংবা অসাধারণ। 

আসি চরিত্র বর্ণণে। অ্যান্ডির বলা এই সিনেমার খুব বিখ্যাত এক উক্তি দিয়েই যদি শুরু করি-

Remember, Red: Hope is a good thing. Maybe the best of things. And no good thing ever dies

এই বাক্যের সাথে যেন পুরোপুরি মিলে যায় অ্যান্ডির জীবন-আখ্যান। ব্যভিচারী স্ত্রী'কে খুন করে জেলে আসা, আমৃত্যু জেলে থাকার আদেশ শিরোধার্য করে কারাগারের অভ্যন্তরে এসে তড়পানো, সেলমেটদের তীব্র আক্রমণ, ওয়ার্ডেনের অযাচিত অন্যায়... নারকীয় সব অভিজ্ঞতার পরেও 'অ্যান্ডি' যে জিনিসটিকে ভুলতে পারে না, সে জিনিসটি 'প্যান্ডোরার বাক্স' থেকে বেরোনো সর্বশেষ বস্তু- Hope. এই 'হোপ' কিংবা আশাতেই সওয়ার হয়ে চলে সবকিছু। 'অ্যান্ডি' চরিত্রে 'টিম রবিনস' দিয়ে যান অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সও।

তবে, এ গল্প কখনোই শুধু অ্যান্ডি-নির্ভর না। এখানে 'অ্যান্ডি'কে ছাপিয়ে ক্ষণে ক্ষণে মূর্ত হয়ে ওঠেন আরেক চরিত্র- রেড। এলিস বয়ড রেড। এ চরিত্রে মরগ্যান ফ্রিম্যান এতটাই অনবদ্য, তার অজস্র সিনেমা দেখা সত্বেও 'রেড' চরিত্রটি জগদ্দল পাথরের মতই বুকে চেপে বসে থাকে। জলদগম্ভীর কন্ঠে তার বলা-

Everyone has a Breaking Point

কিংবা

Believe what you want. These walls are funny. First, you hate ‘em, then you get used to ‘em. After long enough, you get so you depend on ‘em. That’s ‘institutionalized.

এই বাক্যগুলোর পর তাকে আর স্বাভাবিক কোনো কয়েদী বলে ভাবতে ইচ্ছে হয় না মোটেও, পোড় খাওয়া এক দার্শনিক হিসেবেই যেন 'রেড' চরিত্রটি আবির্ভূত হয়, যাবজ্জীবন থেকে যায় অভ্যন্তরে।

রেড! 

অথবা, যদি বলি, সেই বৃদ্ধ ব্রুকস এর কথা, জীবনের বহু বসন্ত জেলে কাটিয়ে সে যখন একদিন মুক্তি পায়, সে বুঝে উঠতে পারেনা কী করবে! দিশেহারা হয়ে পড়ে! যে জেলে আটকে রাখা হয়েছিলো তাকে, সে জেলই যেভাবে সময়ের ফেরে রূপান্তরিত হয় তার ভরসার আবাসস্থলে, আবার সেখান থেকেই যখন তাকে বাস্তব পৃথিবীতে ছুঁড়ে ফেলা হয়... অসহায় হয়ে পড়ে মানুষটি।আলাদা কিছু দ্যোতনায়, এই চরিত্রও স্থায়ীভাবে থেকে যায় হৃদয়ে। 

এভাবেই, এ সিনেমা, নানা চরিত্রের বয়ানে যাপিত সব প্রসঙ্গে দর্শকের ধ্যানধারণা পাল্টে দেয়। স্বাধীনতা, আশা, বিশ্বাস, মুক্তি... খুব গভীর কিছু প্রসঙ্গে ক্রমাগত পালটায় দৃষ্টিভঙ্গি। এবং যখন এ সিনেমা শেষ হয়, তখন সবার অলক্ষ্যেই কিছু একটা পালটে যায় ভেতরে ভেতরে। কিছু একটা পরিবর্তন হয়। সূক্ষ্ম। বিমূর্ত। 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' খুব আলগোছেই এ কাজটি করে। বা, বলা ভালো, এ নির্মাণের চরিত্রেরা যেন আলাদা আলাদা গল্পের বরাতে জীবন নিয়ে এমন সব বার্তা দিয়ে যায়, অজস্র বইপুস্তকও হয়তো দিতে পারত না যা! 

সেই আইকনিক দৃশ্য! 

এবং এই গল্প, এবং বিশেষ কিছু চরিত্রের এরকম অপার্থিব বিবর্তনেই 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' হয়ে পড়ে প্রাসঙ্গিক। এবং ঠিক এ কারণেই, সময় পাল্টালেও, মানুষের বেঁচে থাকার সংজ্ঞা, উপকরণ কিংবা আয়োজন পাল্টালেও পাল্টায়না এই সিনেমার গুরুত্ব। কারণ, এই সিনেমা যেসব বিষয় নিয়ে কথা বলে, সেসব বিষয় বরাবরই ধ্রুবক, স্থায়ী। হয়তো মানুষের খোলস পাল্টেছে, কিন্তু খুব গভীরে তারা সে অনুভূতিতেই বেঁচে আছে, যে অনুভূতি সৃষ্টির একেবারে শুরুতেও ছিলো। 'দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন' অতলের সে অনুভূতিকেই নিয়ে আসে সমুখে। এবং এটাই এ সিনেমার শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় কারণ!৷ 

 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা