'টিভিএফ' হতে চেয়েছিলো ভারতের 'এইচবিও' অথবা 'ডিজনি।' কিন্তু সময়ের ফেরে তাদের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে, হালের মহীরুহ নেটফ্লিক্সও মাঝেমধ্যে হেরে যায় তাদের প্রবল খ্যাতির সামনে...

ভারতের ওয়েব কন্টেন্ট খ্যাতির তুঙ্গস্পর্শী যে অবস্থানে এখন আছে, তা প্রচণ্ড ঈর্ষনীয়। সম্প্রতি আইএমডিবি কাঁপিয়েছে হানসাল মেহতা'র স্ক্যাম ১৯৯২। ক'দিন আগে, দ্য ফ্যামিলি ম্যান এর সিজন টু নিয়েও প্রবল মাতামাতি হয়ে গেলো। স্যাক্রেড গেমস, মির্জাপুর, পাতাল লোক, দিল্লী ক্রাইম নিয়েও বিগত দিনগুলোতে বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে, প্রশংসা হয়েছে। এখনও হয়। গত বছরে করোনার প্রকোপের পর থেকে ভারতীয় ওয়েব কন্টেন্টের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার পরেও আশার বিষয়, নির্মানগুলোর মান কখনোই কমেনি। বরঞ্চ বলা যায়, পাল্লা দিয়ে দুর্দান্ত কাজ এসেছে নিয়মিত। আইএমডিবির টপ চার্টেও ক্রমশ জায়গা দখল করে নিচ্ছে তারা। 

আইএমডিবির 'টপ টেন' এ থাকা ইন্ডিয়ান ওয়েব কন্টেন্টের লিস্ট খেয়াল করে আবিষ্কার করলাম, এই দশটি কন্টেন্টের মধ্যে ছয়টিই এসেছে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে;  যার নাম টিভিএফ! অবশ্য টিভিএফ এর পুরো জার্নির সাথে যারা পরিচিত, তাদের কাছে এটি বিস্ময়কর তো লাগবেই না, বরং স্বাভাবিকই মনে হবে। কারণ, ভারতে ওয়েব কন্টেন্টের এই জোয়ারের শুরুটা করেছিলো তারাই। ২০১৪ সালে তারা ইউটিউবে রিলিজ করে 'পার্মানেন্ট রুমমেটস।' ধারাবাহিকভাবে অনলাইনে গল্প বলার কনসেপ্ট তখন থেকেই শুরু। এরপর কালের ব্যবধানে টিভিএফ এর নির্মানগুলোর মান ক্রমশ বেড়েছে। সাম্প্রতিক দুর্ধর্ষ 'অ্যাসপিরেন্টস' থেকে যদি পিছিয়ে যাই ক্রমশ দুর্দান্ত সব কন্টেন্টের লাইনআপই পাওয়া যাবে সেখানে। পিচার্স, কোটা ফ্যাক্টরি, গুলাক, ইয়েহ মেরি ফ্যামিলি, পঞ্চায়েত... এতগুলো বছর ধরে মানের ক্ষেত্রে আপোষ না করে কোয়ালিটি কন্টেন্ট এর জন্যে যে চেষ্টা তাদের, সেখানে কোনো খামতিই নজরে আসে না। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাদের কন্টেন্ট সিলেকশন এবং ন্যারেশন স্টাইল। হালের 'অ্যাসপিরেন্টস' এর কথাই যদি বলি, ভারতের ইউপিএসসি এক্সামকে মেইন ফোকাসে রেখে যেভাবে সারকাস্টিক ওয়েতে অনেকগুলো সোশ্যাল ইস্যুকে সাটল ওয়েতে ব্লেন্ড করা হয়েছে এখানে, পুরোপুরি ব্রিলিয়ান্ট। শুধু 'অ্যাসপিরেন্টস'ই বা কেন, কোটা ফ্যাক্টরি, হোস্টেল ডেজ, পঞ্চায়েত, পিচার্স...সবখানেই হিউমার, সোশ্যাল প্যারাডক্স, মানুষের মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন... একসাথে মিলেমিশে অদ্ভুত সব মিশেলের নির্মান হয়েছে।

এত বছরের ফেরে দুর্দান্ত সব কন্টেন্টের জন্মই দিয়েছে টিভিএফ! 

টিভিএফ এর প্রতিষ্ঠাতা অরুনাভ কুমারের গল্পটাও অন্যরকম। আইআইটি খড়গপুর থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়ার পরেই চাকরি পেয়ে যান ইউএস এয়ার ফোর্স এ। যথারীতি এয়ারপোর্টে এসেছেন। একটু পরেই ছাড়বে বিমান। কিন্তু হুট করে কী হলো, এয়ারপোর্ট থেকে পালিয়ে গেলেন। পরিবারের সবাই যখন পরে জানতে পারে এই ঘটনা, তারা শঙ্কিত হন। হওয়াটাই স্বাভাবিক। অরুনাভ'র বাবা সারাজীবনে সিনেমা দেখেছেনই মাত্র একটা। তার কাছে সিনেমা, গল্প, উপন্যাস...এগুলো সময় নষ্ট ছাড়া কিছুই না। ছেলেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু অরণ্যেই রোদন হলো। আর কোনো লাভ হলো না।

অরুনাভ চলে গেলেন বলিউডে, পায়ের নীচে একটুখানি শক্ত মাটি পাওয়ার আশায়। 'ওম শান্তি ওম' সিনেমায় ফারাহ খানকে অ্যাসিস্টও করলেন বছরখানেক। এরপর টুকরোটাকরা কিছু কাজ করলেন আরো। কিছু শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পেলেন। কিন্তু ততদিনে পকেট গড়ের মাঠ! কাজ করছেন, পুরস্কার পাচ্ছেন, টাকা পাচ্ছেন না। বেশ বিপাকেই পড়লেন এ পর্যায়ে এসে। 

পাগলের মত স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করলেন অরুনাভ, বিভিন্ন প্রোডাকশন হাউজের জন্যে। সেই স্ক্রিপ্টগুলো সিলেক্টের চেয়ে রিজেক্ট হতো বেশি। কিন্তু লেখা থামলো না। লেখালেখি আর রিজেকশনের পাল্টাপাল্টি দ্বৈরথ সমানতালে চালানোর পরে একদিন অরুনাভ আবিষ্কার করলেন, মানুষ তার দুয়েকটা কাজের বেশ প্রশংসাও করছে। অনুপ্রেরণা পেলেন তিনি। আস্তে আস্তে আরো কোয়ালিটি কন্টেন্ট আসতে লাগলো অরুনাভের কলম থেকে। 

অরুনাভ কুমারের গল্পটাও অন্যরকম! 

সাথে আরো দুই বন্ধুকে জুটিয়ে এরপর অরুনাভ খুলে ফেললেন এক প্রোডাকশন হাউজ। টিভিএফ। দ্য ভাইরাল ফিভার। ইন্ডিয়ার প্রথম অনলাইন টেলিভিশন চ্যানেল। সাথে ইউটিউব চ্যানেলও খোলা হলো। উদ্দেশ্য একটাই, ইয়াং জেনারেশনকে আবার কানেক্ট করতে হবে টিভি সিরিয়ালের সাথে, যদিও খানিকটা অন্য ফরম্যাটে। শুরু হলো অসাধ্যসাধনের গল্প। চেষ্টা চালানো হলো,  জনপ্রিয় 'ফ্রেন্ডস' এবং 'বিগ ব্যাং থিওরি'র ইন্ডিয়ান ভার্সন আনা যায় কী না, তা নিয়ে। টিভি-বিমুখ তরুণ প্রজন্মকে আবার টিভির দিকে ফেরানো যায় কী না, তা নিয়েও বিস্তর স্ট্রাটেজি আর গবেষণা শুরু করলো অরুনাভ ও টীম। বাকিটা চর্বিতচর্বণ। আমরা সবাই জানি। 

টিভিএফ সময়ের নানা প্রকোষ্ঠে সমাজসংস্কারমূলক নানা কন্টেন্ট নিয়েই যে এসেছে শুধু, তা না। দুর্দান্ত কিছু অভিনেতাকেও তারা এনেছে লাইমলাইটে। জিতেন্দ্র কুমার, নাভিন কাস্তুরিয়ার মতন কিছু অভিনেতাকে মিডিয়া ভালো করে চিনেছে টিভিএফ এর শোগুলোর পরেই৷ জিতু ভাইয়া, সন্দীপ ভাইয়া, অভিষেক ত্রিপাঠী, গুরি, এসকে, অভিলাশ এর মতন কালজয়ী কিছু চরিত্রের জন্মও দিয়েছে টিভিএফ। যে চরিত্রগুলোর পোর্ট্রেয়াল নিয়ে এখনও নিয়মিত কথা হয় মিডিয়ায়। 

'জিতু ভাইয়া'র মতন চরিত্রের জন্ম দিয়েছে টিভিএফ! 

'টিভিএফ' হতে চেয়েছিলো ভারতের 'এইচবিও' অথবা 'ডিজনি।' কিন্তু সময়ের ফেরে তাদের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে, হালের মহীরুহ নেটফ্লিক্সও মাঝেমধ্যে হেরে যায় তাদের শো এর সামনে। একজন মানুষ থেকে শুরু হয়ে আজ টিভিএফ শতাধিক মানুষের প্রতিষ্ঠান। প্রথম যখন তারা যাত্রা শুরু করে, তাদের অফিসে লেডিস টয়লেটও ছিলো না। সেখান থেকে আজ তারা এমন এক ব্রান্ডে পরিণত হয়েছে, যেখানে নারীরা আছে গুরুত্বপূর্ণ সব পদে। আইএমডিবির টপ টেন ইন্ডিয়ান ওয়েব সিরিজের ছয়টিই দখলে রেখেছে তারা। অথচ, শুরুটা সেই সেদিন, যেদিন নিশ্চিত চাকরীর হাতছানি থেকে পালিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে এসেছিলো এক মানুষ। 

বুকপকেটের স্বপ্নকে আগলে রাখলে সে যে বিশ্বাসঘাতকতা করে না, তার খুব সুন্দর এক উদাহরণ অরুনাভ কুমার ও টিভিএফ। যারা সময়ের ফেরে পরিণত হয়েছে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন টিভি চ্যানেলে। যারা কন্টেন্ট বানায় সমাজ পাল্টানোর জন্যে। যারা গল্প বলে সময় পরিবর্তনের জন্যে।

টিভিএফ ঠিক এভাবেই সমসাময়িক অন্যান্য মাধ্যমের থেকে হয়েছে ভিন্ন, যাদের দেখানো পথেই হাঁটছে আজকের ভারতীয় ওয়েব কন্টেন্ট। প্রথা ভাঙ্গার সাহস প্রথমবারের মতন দেখিয়েছেলো যারা, কৃতজ্ঞতা রইলো তাদের প্রতি। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা