'থিরুচিত্রামবালাম' এ গল্পের জটিলতা নেই, বহু অর্থব্যয়ে বিশাল সেট বানানো নেই, নেই প্রযুক্তির দখলদারিত্বও। এ সিনেমায় আছে সহজ, স্বাভাবিক এক গল্প আর সে গল্পে দ্রবীভূত হওয়ার রসদ৷ এবং ঠিক এখানে এসেই সিনেমাটির দিগ্বিজয়...

চারপাশে আজকাল এত সব জটিল গল্পের নাভিশ্বাস, দর্শককে বোকা বানানোর এত আয়োজন চারপাশে, এই আয়োজনে যেভাবে উপেক্ষিত সাদামাটা গল্পেরা, সেসব দেখে মাঝেমধ্যে ভাবতে বসি- সোজাসাপটা গল্পগুলোর কি এরকম পরিণতিই লিখে রেখেছিলো মহাকাল? থ্রিলার, সাসপেন্স, খুন, ড্রামা, মেলোড্রামার এই যে ঘন উপস্থিতি, এসবের মাঝখানে চেনাপরিচিত গল্পগুলো ঠিক কোথায়? 'গুল্লাক' কিংবা 'পঞ্চায়েত' এর মতন কোনো নির্মাণ যখন আলগোছে পৌঁছোয় দোরগোড়ায়, অজানা অনির্বচনীয় আনন্দে যেভাবে ভরে মন, সেরকম আনন্দে কেন বুঁদ করেনা বাকিরা? সহজ কথার মিঠেকড়া গল্প কি 'বোতলের ভূত' হয়েই হয়েছে আটক? প্রশ্ন খুঁজি। উত্তর মেলে না। তবে উত্তর না মিললেও মিলে যায় অদ্ভুত মিষ্টি এক সিনেমার খোঁজ। যে সিনেমার নাম- 'থিরুচিত্রামবালাম।' 

সিনেমার নামটা খটোমটো, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই খটোমটো নামের সিনেমাই যেন ছানার সন্দেশ। কিংবা হাওয়াইমিঠাই। সহজপাচ্য। মন ভাল করে দেবার। সিনেমার চরিত্রও বেশি না। অল্প কিছু চরিত্র, টুকরো গল্প, শেষে স্নিগ্ধ সমাপ্তি... 'থিরুচিত্রামবালাম' ভালো লাগার কারণও বহুবিধ৷ খুলে বলি। 

এ সিনেমার গল্প মোটাদাগে এক পরিবারের গল্প। যে পরিবারে তিনজন সদস্য। ছেলে, ছেলের বাবা, ছেলের দাদা। ছেলেটি ফুড শেয়ারিং অ্যাপের ডেলিভারি বয়। তার বাবা পুলিশ অফিসার। এই পুলিশ অফিসার বাবার সাথে ছেলেটি কথা বলে না  গত দশ বছর ধরে। কারণ একটাই, বাবার একটা ভুলে কার অ্যাক্সডেন্টে ছেলেটি হারিয়েছে তার মা ও বোনকে। সেই সময় থেকেই বাবার সাথে তার দূরত্ব। এই যে সংযোগহীন বাবা আর ছেলে, তাদের মধ্যে সংযোগসেতু হিসেবে কাজ করে পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, অর্থাৎ প্রোটাগনিস্ট ছেলের দাদা। ছেলে ও নাতির জন্যে তিনি খাবার রান্না করেন, নাতির সাথে মাঝেমধ্যে জীবনঘনিষ্ঠ আলাপ করেন, করেন খুনসুটিও। বাবা-ছেলের খিটিমিটি লাগলে আবার তিনিই সেখানে হন মধ্যস্থতাকারী।

গল্পের এই প্রোটাগনিস্ট ছেলেটির বন্ধুবান্ধব খুব একটা কেউ না থাকলেও, আছে কাছের এক বান্ধবী। শোভনা। জীবনের যাপিত সংকটে এই ছেলেটি শোভনার কাছে হাজির হয়। শোভনাও নানা পরিস্থিতিতে বাতলে দেয় পরামর্শ। দুজনের বোঝাপড়া আর টান এতটাই অমোঘ... হরিহর আত্মা কিংবা ছায়ার মতই তারা মিশে থাকে একে অপরের স্পর্শে। নিবিড় সান্নিধ্যে। 

এভাবে মিষ্টি কিছু গল্পে এগোনো নির্মাণে আচমকা আসে কিছু সংকট। মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন অথবা বিষাদের মেঘও পসার জমায় সময়ে সময়ে। কিন্তু নির্মাতা সেসব সংকট, টানাপোড়েন অথবা বিষাদকে দেখান খানিকটা হালকা বয়ানে। সম্মানজনক দূরত্বে থেকে। এ সিনেমার মূল উদ্দেশ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের সহজ-সরল গল্প বলা, সেটাই থাকে গুরুত্বে। খুব বেশি জটিলতায় এ সিনেমা যায় না, যাবার চেষ্টাও করে না। এখানে উল্লেখ্য এটাও, এই যে সারল্যমাখা গল্প, এ গল্পের গূঢ় তাৎপর্য বেশ অন্তর্ভেদী আবহও দেয়। অর্থাৎ, বলার ভঙ্গীটা হয়তো হালকা, কিন্তু যা বলা হচ্ছে- বোধের দেয়ালে টনক নড়ার উপাদান থাকে সেখানেও।  

এখানে সব ছাপিয়ে উঠে আসে এক মিষ্টি প্রেমের গল্পও

বাবার সাথে এক দশকের কপট দূরত্ব, সে দূরত্বের নাটকীয় অবসান, অভিমানের বরফ গলে জল, প্রিয় বন্ধুর উষ্ণ উপস্থিতি, ভালোবাসার প্রকৃতি অনুসন্ধান, পরিবারের ডানার নীচে গুটিসুটি মেরে আশ্রয়... 'থিরুচিত্রামবালাম' যেন চরা পড়ে যাওয়া পেলব অনুভূতিকেই খানিকটা স্পষ্ট করে। তাছাড়া, গল্পটাও এমনভাবে লেখা, কোথাও গিয়ে নিজেদের প্রিয়জনদের সাথেও নিবিড় সংযোগ হয়ে যায় গল্পের। এবং সিনেমাও ঠিক তখন পৌঁছে যায় অন্য কোনো প্রকোষ্ঠে৷

'থিরুচিত্রামবালাম'কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় সিনেমার কুশীলবরাও। মধ্যবিত্ত যুবকের চরিত্রে ধানুশের যে বিকল্প খুব কম, সেটা প্রমাণিত হয় আরেকবার। প্রকাশ রাজের পারফরম্যান্সেও চমকাতে হয়। নিথিয়া মেনন, শোভনা চরিত্রে এমনই অভিনয় করেন, ভ্রম হয়, এ চরিত্র বুঝি তাকে ভেবেই লেখা। সবচেয়ে চমকাই ভারতীরাজার অভিনয়ে। তার মুখ থেকেই আসে সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডায়লগগুলো। কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইসিসে তার উপস্থিতিও মনকে আর্দ্র করে।

সবার অভিনয়ই আলাদা দ্যোতনায় দাগ কাটে ভেতরে 

'থিরুচিত্রামবালাম' এ গল্পের জটিলতা নেই, বহু অর্থব্যয়ে বিশাল সেট বানানো নেই, নেই প্রযুক্তির দখলদারিত্বও। এ সিনেমায় আছে সহজ, স্বাভাবিক এক গল্প আর সে গল্পে দ্রবীভূত হওয়ার রসদ৷ এবং ঠিক এখানে এসেই সিনেমাটির দিগ্বিজয়।  সাদামাটা গল্পের মিশেলে দর্শককে বিলকুল ডুবিয়ে চোখে জল এনে দেয়ার ক্ষমতাতেই এ সিনেমার শ্রেষ্ঠত্ব। এই সিনেমা সে সাথে এটারও দৃষ্টান্ত, একটা সিনেমায় আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, গল্পের চেয়ে বড় কিছু নেই, হয় না কিছু মহীয়ান।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা