তৎক্ষনাৎ নিজের প্রমোদতরীর নাবিককে তিনি সেই অগ্নিদগ্ধ নৌকার কাছে যেতে বলেন। এরপর বিপদের ঝুঁকি নিয়ে টম ক্রুজ নিজেই সেই নৌকায় নেমে আগুনের মাঝে আটকে পড়া এক পরিবারকে উদ্ধার করেন... 

চতুর্থ থমাস ক্রুজ ম্যাপোথার বা 'টম ক্রুজ' নাম যে মানুষটির, তাকে নিয়ে নিয়মিত বিচিত্র সব চর্চা হয়। বহুল-চর্চিত এই মানুষ নিয়ে আলাদা করে নতুন করে কিছু বলা খুবই কঠিন তাই। পরিবারের ঝঞ্জাটে কাটানো জীবনের প্রাথমিক অধ্যায়, অভিনয়ে আসার আগে 'ধর্মযাজক' হওয়ার স্বপ্ন, স্টান্টম্যান ছাড়াই বিপজ্জনক সব শট, একাধিকবার গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড জেতা, অস্কারের মঞ্চে নিজের নাম বারবার নিয়ে যাওয়া, ধর্মবিশ্বাস আর ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক...

এগুলো নিয়ে চাইলে কথা বলা যায়। আবার কলমের গন্ডি সীমাবদ্ধ রাখা যায় তাঁর ধুন্ধুমার জাঁকালো অভিনয় ক্যারিয়ারের উপরেও। মিশন ইমপসিবল থেকে শুরু করে রেইন ম্যান, আ ফিউ গুড মেন, কোলাটেরাল, দ্য লাস্ট সামুরাই, অবলিভিয়ন... এসব সিনেমায় তাঁর যে অভিনয়, তা নিয়েও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে খরচ করা যেতে পারে দিস্তাখানেক কাগজ। কিন্তু এসব বাদ দিলেও 'টম ক্রুজ' নামের মানুষটির আছে অন্যরকম এক পরিচয়, যে পরিচয় তিনি সযত্নে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন বরাবর। আবার পর্দার বাইরের তাঁর সে পরিচয়ের সুলুকসন্ধান যাদের কাছে সময়ে-অসময়ে উন্মোচিত হয়েছে, তাদের কাছে টম ক্রুজ ভিন্ন দ্যোতনার, ভিন্ন অবয়বের এক মানুষ হয়েই ধরা দিয়েছেন ক্রমশ। 

জাপানে 'টম ক্রুজ ডে' পালন করা হয় প্রতিবছর! 

সাতানব্বই সালের ঘটনা। নিজের প্রথম স্ত্রী নিকোলে কিডম্যান এবং সন্তানদের সাথে প্রমোদতরীতে অবসর সময় কাটাচ্ছিলেন টম ক্রুজ। এমন সময় খেয়াল করলেন, কাছের একটা নৌকায় আগুন লেগেছে। তৎক্ষনাৎ নিজের প্রমোদতরীর নাবিককে তিনি সেই অগ্নিদগ্ধ নৌকার কাছে যেতে বলেন। এরপর বিপদের ঝুঁকি নিয়ে তিনি নিজেই সেই নৌকায় নেমে আগুনের মাঝে আটকে পড়া এক পরিবারকে উদ্ধার করেন। 

এই ঘটনারই এক বছর আগের ঘটনা। ঝড়-জলের এক রাতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, রাস্তার এক পথচারীকে আচমকা এক গাড়ি এসে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মুমূর্ষু মানুষটিকে নিয়ে নিকটবর্তী হাসপাতালে যান। শুধু হাসপাতালে ভর্তি করিয়েই দায়িত্ব শেষ হয় না তাঁর, হাসপাতালের যাবতীয় খরচও তিনি বহন করেন, যখন তিনি জানতে পারেন, আহত এই মানুষটি হলিউডেরই এক নবাগত অভিনেত্রী। পরবর্তীতে এই অভিনেত্রী টম ক্রুজের প্রশংসা করে বলেছিলেন-

তিনি যদি সুপারম্যান নাও হন, তিনি ব্যাটম্যান। ব্যাটম্যানের সুপার-পাওয়ার নেই। কিন্তু তাও তিনি মানুষকে আগলে রাখেন৷ 

'অবলিভিওন' সিনেমার শুটিং শুরু হবে কয়দিন পর। টম ক্রুজের বিপরীতে অভিনেত্রী হিসেবে আছেন জেসিকা চাস্টাইন। শুটিং শুরুর আগে আগে জেসিকা আরেকটি সিনেমার অফার পান। 'জিরো ডার্ক থিওরি' সিনেমার স্ক্রিপ্ট শুনে জেসিকা সেই সিনেমায় কাজ করার জন্যে বেশি আগ্রহী হয়ে যান। কিন্তু 'অবলিভিওন' আর ক'দিন পরেই শুরু হচ্ছে। পরিচালককে কিভাবে না করবেন জেসিকা? সাতপাঁচ ভেবে তিনি শরণাপন্ন হলেন টম ক্রুজের৷ ক্রুজের মধ্যস্ততায় শেষপর্যন্ত তিনি কাজ করতে পারেন 'জিরো ডার্ক থিওরি' সিনেমায়। 

'আ ফিউ গুড মেন' সিনেমার শুটিং এ বিশাল আকৃতির এক কলম দিয়ে লিখতেন টম ক্রুজ। কো-আর্টিস্ট কেভিন পোলক, ডেমি মুরের তীব্র আগ্রহ কলমটি নিয়ে। এরকম ঢাউস এক কলম দিয়ে কিভাবে লেখা যায়, তা নিয়েই তাদের তীব্র কৌতূহল। টম ক্রুজ বুঝলেন বিষয়টি। তিনি কেভিন পোলককে ডেকে বললেন, কলমটি দিয়ে খাতায় কিছু একটা লিখতে। লিখতে গিয়ে পোলক খেয়াল করলেন, আশ্চর্যভাবে হালকা কলমটি। এবং দারুণ ঝরঝরে লেখা হচ্ছে। তিনি মুগ্ধ হলেন। টম ক্রুজ এই ঘটনায় মুচকি হাসলেন। শুটিং শেষে একই মডেল ও ব্রান্ডের আরেকটি কলম তিনি উপহার দিলেন পোলক কে।

এই বিশেষ কলমগুলোর দামও কম না; ৫০০ ডলার! পোলক বললেন, এই কলম দিয়ে তিনি লিখবেন না। তুলে রাখবেন আলমারিতে। ক্রুজ এই বিষয় জানতে পেরে হুবহু আরেকটি কলম কিনে দিলেন পোলককে। যাতে করে এক কলম দিয়ে লিখতে পারেন তিনি এবং আরেকটি তুলে রাখতে পারেন আলমারিতে। উপহার দিয়ে সহকর্মীদের চমকে দেয়ার কাজ তিনি মাঝেমধ্যেই করেন। শুধু সহকর্মীই না, নিজের পার্সোনাল সেক্রেটারি, পাবলিশার, ল'ইয়ার, ম্যানেজার ও তাদের পরিবারের দিকেও টম ক্রুজের নিবিড় খেয়াল থাকে বরাবর। 

'আ ফিউ গুড মেন' সিনেমায় ক্রুজ, মুর, পোলক! 

খেয়াল থাকে অপরিচিত মানুষের দিকেও। মিশন ইম্পসিবল এর প্রিমিয়ার শো শেষে টম ক্রুজ বের হচ্ছিলেন। যথারীতি তীব্র ভীড় সেখানে। হঠাৎ করে তিনি খেয়াল করলেন, তীব্র জনস্রোতের মাঝখানে পড়ে দুটি শিশু পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রায়। সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা দুটির কাছে ছুটে গেলেন ক্রুজ এবং পুলিশের সহায়তায় তাদেরকে বাঁচালেন৷ পুরো বিষয়টি যারা চাক্ষুষ দেখেছেন, তারা এখনো এই মানবিক ঘটনায়  মুগ্ধতা প্রকাশ করেন নিয়মিত। 

এরকম ঘটনা আছে অজস্র। প্রবল স্টারডমকে পেছনে ফেলে তিনি বরাবরই মানুষের জন্যে ছুটে গিয়েছেন, যখন, যেখানে, যেভাবে পেরেছেন৷ প্রবল ব্যস্ত ক্যারিয়ার,  সাথে এরকম মানবিক কাজকর্ম, এসব করতে গিয়ে আবার নিজের পরিবারকে বঞ্চিত করেন নি তিনি কখনোই। টম ক্রুজের শুটিং এর অলিখিত নিয়ম ছিলো, যত গুরুত্বপূর্ণ শটই হোক এবং সে শটের যে পর্যায়েই তিনি থাকুন না কেন, সন্তানেরা ফোন করলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজ থামিয়ে দেবেন। দিতেনও। তুচ্ছ কারণেও সন্তানেরা তাকে ফোন করতো, তিনি ঠাণ্ডা মাথায় তাদের সাথে কথা বলে, তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে, এরপর আবার শুটিং এ মনোযোগ দিতেন। পরিচালকেরাও এ বিড়ম্বনা মেনে নিতেন। স্টিভেন স্পিলবার্গ যেমন বলতেন- 

সন্তানের প্রতি টম ক্রুজের এ ভালোবাসায় বিরক্ত তো হই-ই না। বরং বাবা-সন্তানের এ ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছি নিয়মিত।

দৃষ্টিসীমার সমুখ পানের 'টম ক্রুজ' এর গল্প আমাদের নখদর্পনে। অথচ, গল্পের আড়ালে থাকা সংবেদনশীল টম ক্রুজ অনেকটাই অজ্ঞাতকুলশীল এক মানুষ। তবে যদি এই দুই সত্ত্বার তুলনা করা হয়, তাহলে অন্তরালে থাকা টম ক্রুজ যেন ক্রমশই ছাপিয়ে যান প্রবল পরাক্রমশালী তাঁরকা 'টম ক্রুজ'কে। অবশ্য ব্যক্তি টম ক্রুজ তাঁর তথাকথিত 'সুপারস্টার' তকমা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন। তিনি চিন্তিত তাঁর কাজ নিয়ে, তাঁর পরিবার নিয়ে, তাঁর আশেপাশের মানুষদের নিয়ে। এখানেই তাঁর তৃপ্তি, স্বকীয়তা, চমৎকারিত্ব। 

সিনেমার বিপজ্জনক স্টান্টগুলো তিনি নিজেই করেন বরাবর! 

গুণী এ মানুষটির জন্মদিন আজ। জন্মদিনে পর্দার 'টম ক্রুজ' এর জন্যে শুভেচ্ছা রইলো, আর, নেপথ্যের 'টম ক্রুজ' এর জন্যে রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা