ভিক্টর নভোরস্কি, চাক নোল্যান্ড, ফরেস্ট গাম্প বা ফ্রেড রজারস...তাদেরকে জীবন থেকে আলাদা করা যায় না। তারা মিশে থাকে রুটি-ভাত-জলের সাথে। তারা মিশে থাকা হাহাকার-বিষাদ-ভালোবাসার সাথে। তারা ফুরোয় না, ফুরিয়েও যেতে দেয় না...

মানবজীবন বিষন্নতা-আশাবাদের অদ্ভুত এক নাগরদোলা। জীবনের নানা বাঁকে 'বিষন্নতা' নামক লতাগুল্মের মুখোমুখি যতবারই হয়েছি, হাত বাড়িয়েছি খুব প্রিয় এক সিনেমার দিকে। সে সিনেমার নাম- দ্য টার্মিনাল। যে সিনেমায় ভিক্টর নভোরস্কি নামক এক মানুষ আটকে পড়েন 'জন এফ কেনেডি' নামে পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত এক এয়ারপোর্টে। যিনি খুব বিরল রাজনৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হয়ে আমেরিকার নুড়িমাখা সড়কে হাঁটার অনুমতি পান না। অথচ তিনি সে সড়কে নামতে চান, কৌটোভর্তি বাবার স্বপ্ন সত্যি করতে চান। কিন্তু নাচার প্রশাসনের মন গলেনা। মুক্ত হবার সকল দ্বার ক্রমশই যখন রুদ্ধ হতে থাকে, তখন এই মানুষটি এয়ারপোর্টকেই বানান ঘরবাড়ি। সেখানেই অদৃশ্য কালিতে লিখতে থাকেন দিনযাপনের কড়চা। 

এ সিনেমা খুব প্রিয়। স্পিলবার্গের দুর্দান্ত পরিচালনা তো রইলোই। 'ভিক্টর নভোরস্কি' চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করা টম হ্যাংকস একাই টেনে নিয়ে গেলেন যেন গল্পের পুরোটা। নিষ্পাপ চাহনি, অবাক সারল্য আর গভীর জীবন-দর্শনে পুরো সিনেমাই যেন হয়ে গেলো 'একক ক্ষমতাপ্রদর্শনী'র দারুণ মহামঞ্চ। এ সিনেমা তাই বরাবরই বিষন্নতার দাওয়াই। মন খারাপের ওষুধ। 

'দ্য টার্মিনাল' এ ভিক্টর নভোরস্কির উদ্বেগ আঁচ করতে পারি আমরাও! 

এমন তো হয়ই, জনতার মাঝে নির্জন লাগে। দলের মধ্যে দলছুট। পংক্তির মধ্যে অপাংক্তেয়। এইসব ক্লান্তিকর মুহুর্তে মানব-সংস্পর্শ হয়ে দাঁড়ায় বিস্তর পীড়াদায়ক। ভ্রম হয়, বিশ্বসংসার উপেক্ষা করে গুহাবাসী বা নির্জন দ্বীপবাসী হলে হয়তো স্বস্তি মিলতো। ঠিক এরকম সময়গুলোর পথ্য 'কাস্ট অ্যাওয়ে' সিনেমা। যে সিনেমার আদ্যোপান্ত "চাক নোল্যান্ড' নামের এক ভীষণ ব্যস্ত মানুষের গল্প। যে মানুষটি দূর্ঘটনায় পড়ে আটকে যান পাণ্ডববর্জিত এক দ্বীপে। দৃষ্টিজুড়ে অকূলপাথার আর বালুর গালিচা৷ আঁধার ঘনালেই ভেসে আসে ঝিঁঝিঁপোকা, তক্ষক আর বুনো পাখির ঐকতান। চাক নোল্যান্ডের এই ভীষণ বিচ্ছিন্ন গল্পে জড়ায় অনেক অনুষঙ্গ, জড়াই আমরাও। চাক নোল্যান্ড একসময়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নামেন। এই লড়াইয়ে, এই একাকীত্বের জীবনে তাঁর সঙ্গী হয় 'মিঃ উইলসন' নামের এক ভলিবল। মিঃ উইলসন আর চাক নোল্যান্ড এর অদ্ভুত কথোপকথন, সে সাথে সাগর থেকে ভেসে আসা বাতাসের নোনা গন্ধ ক্রমশই উপলব্ধি করায়, মানুষ যতই বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রলাপ বকুক, মানুষ আসলে মানুষের স্পর্শেই সুখী, আশ্বস্ত, নিরাপদ। 

'কাস্ট অ্যাওয়ে' সিনেমার মূল প্রেক্ষাপট মুগ্ধ করেছিলো বিস্তর। কিন্তু সবচেয়ে বড় মুগ্ধতা ছিলেন 'চাক নোল্যান্ড' চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটি। গল্পের মানুষ যখন জ্যান্ত হয়ে মিশে যায় জীবিত মানুষের অস্তিত্বের সাথে...সে বড় অপার্থিব মুহুর্ত। এই মুহুর্তই তৈরী হয় টম হ্যাংকসের সেই দুরন্ত অভিনয়ে! 

'কাস্ট অ্যাওয়ে'র চাক নোল্যান্ড যোগায় সংগ্রামের মানসিকতা! 

চলার পথে আশাহীনতার আখ্যান কারোরই নেহায়েত কম না। কিন্তু সে আশাহীনতা কোনোভাবেই 'ফরেস্ট গাম্প' এর মতন নিদারুণ না। ফরেস্ট গাম্প তার জীবনের পুরোটা জুড়ে যত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন, তা ভাবনারও অতীত৷ আশাহীনতার বিপন্ন সময়গুলোতে তাই 'ফরেস্ট গাম্প' নামের আশ্রয়েই ঠাঁই নেওয়া বরাবর। একজন মানুষ, নির্ঝঞ্ঝাট এক মানুষ, সে মানুষের জীবনভর সংগ্রামের গল্প ক্রমশই দর্শককে বলে আশায় বুক বাঁধতে। নিজের ভালোবাসা, ভালোলাগা, স্বপ্নের জন্যে আপ্রাণ লড়াই করারও রসদ জোগায় এ নির্মান। ফরেস্ট গাম্প, জেনি, ড্যান, বুব্বা, যুদ্ধ, ব্যবসা, পরোপকার...সবমিলিয়ে  পুরো গল্প রূপান্তরিত হয় এক চকোলেটের বক্সে। যে চকোলেটের বক্স জীবনেরই সমান্তরাল। যে চকোলেটের বক্স থেকে কী উঠবে, তা জানে না কেউই। আবার এ সিনেমা মোটাদাগে ক্রমশই হয়ে যায় কবীর সুমনের গানের সেই লাইনও- 

অমরত্বের প্রত্যাশা নেই নেই কোন দাবী দাওয়া
এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকে চাওয়া

'ফরেস্ট গাম্প' নামক মানুষটির ছুটে চলা এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই। জীবনে হাতেগোনা প্রিয় সিনেমাগুলোর মধ্যে 'ফরেস্ট গাম্প' তাই থেকে যায় আঙুলের আশেপাশে। গল্পের অভিনবত্ব তো বটেই, টম হ্যাঙ্কস নামক মানুষটি 'ফরেস্ট গাম্প' চরিত্রটিকে বানিয়ে দেন যাপিত জীবনেরই এক অংশ। এ সিনেমার মুগ্ধতার রেশ তাই কাটেনা, এ জীবনে হয়তো কাটবেও না।

ফরেস্ট গাম্প উপলব্ধি করায় ভালোবাসার গভীরতা! 

টম হ্যাঙ্কস'কে নিয়ে মুগ্ধতা যাবজ্জীবন। লেখাও তাই পক্ষপাতদোষে আপাদমস্তক দোষী। কিন্তু এ বেলা ইতি টানা প্রাসঙ্গিক৷ 'নটে গাছটি মুরোলো' বলা যাক সে সিনেমা দিয়ে, যে সিনেমা ক্রোধের এই উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে বলে স্নেহ, সহমর্মিতা, ভালোবাসা'র গল্প। 'এ বিউটিফুল ডে ইন দ্য নেইবারহুড' সিনেমায় ক্রমশই দেখি একজন মানুষের লড়াই। যে মানুষ ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ এই কমলালেবু গোলকে লড়াইয়ের জন্যে বেছে নিয়েছেন 'সহমর্মিতা' নামের হাতিয়ারকে। তিনি ক্রমশই নানা আঘাতের সম্মুখীন হন। সেসব আঘাতে আহতও হন। কিন্তু পরাজয় মানেন না। স্নেহ, সহমর্মিতা, ভালোবাসা দিয়ে পরাস্থ করেন যাবতীয় সব বিরুদ্ধাচারণ কে। বিদ্বেষ, উষ্মা, ক্ষোভে বিদীর্ণ পৃথিবীতে তিনি উদার হতে বলেন, বলেন খানিকটা মানবিক হতে। অবশ্য এসব করতে গিয়ে নিজেকে তিনি মহাপুরুষ ভাবেন না। তিনি রক্তমাংসেরই মানুষ। কিন্তু তাকে ঠিক সাধারণ মানুষের কাতারেও ফেলা যায় না। তিনি সাধারণের মধ্যে ক্রমশই পরিণত হন অসাধারণ এক প্রাণে। 

এই মানবিক মানুষটি ফ্রেড রজারস। সত্যিকারের 'ফ্রেড রজারস'কে পর্দায় ঐন্দ্রজালিক সক্ষমতায় জীবন্ত করার কৃতিত্ব টম হ্যাঙ্কসের। তাঁর অভিনয়ের তুখোড় ব্যাপ্তিতে এ সিনেমা তাই কোথায় গিয়ে যেন আর সিনেমা হয়ে থাকে না। এই নির্মানের গণ্ডি হয়ে যায় অনেক বড়। এ আখ্যান জীবনবোধের অতলস্পর্শী সব পাঠ দিয়ে যায়৷ এ সিনেমা উপলব্ধি করায়, চাইলে শুধুমাত্র একজন মানুষও গড়ে দিতে পারে তুমুল ব্যবধান।

'এ বিউটিফুল ডে ইন দ্য নেইবারহুড' এর 'মিঃ রজারস' দেন সহমর্মী হওয়ার শিক্ষা! 

শৈশব, কৈশোর এবং যাবজ্জীবনের প্রিয় টম হ্যাঙ্কস'কে তাই কখনোই শুধু 'প্রিয় অভিনেতা' খেতাব দিয়ে স্বস্তি পাওয়া যায় না। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য করলে উপলব্ধি হয়, এই চরিত্রেরা কোথাও গিয়ে যেন মিশে যায় জীবনের সাথে, জীবনবোধের সাথে। ভিক্টর নভোরস্কি, চাক নোল্যান্ড, ফরেস্ট গাম্প বা ফ্রেড রজারস...তাদেরকে জীবন থেকে আলাদা করা যায় না। তারা মিশে থাকে রুটি-ভাত-জলের সাথে। তারা মিশে থাকা হাহাকার-বিষাদ-ভালোবাসার সাথে। তারা ফুরোয় না, ফুরিয়েও যেতে দেয় না। এই চারটি চরিত্র তাই হয়ে থাকে খুব প্রিয়। যারা আস্তানা গেঁড়ে বসে হৃদয়ের খুব শুদ্ধতম প্রকোষ্ঠে। যে প্রকোষ্ঠ থেকে তাদের বিচ্যুত করা যায় না। উপেক্ষা করা যায় না। 

এই চরিত্রগুলোতে 'প্রাণ' দিলেন যে মানুষটি, সে মানুষটির আজ জন্মদিন। জন্মদিনে বিনম্র নৈবেদ্য এটুকুই। শতায়ু হোন, এটাই প্রার্থনা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা