এটা ঠিক, দেশের নির্মাণ নিয়ে কথা বলতে গেলে দুয়েকটা ভুল হয়তো লুকিয়ে-চুরিয়ে রাখি আমরা সবাই। কিছু সমালোচনা উপেক্ষা করেই বিস্তর প্রশংসা করি কাজগুলোর। কিন্তু 'টুমরো' সেদিক থেকে পুরোপুরি ভিন্ন; নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দাঁড়িয়েই এক ত্রুটিবিহীন, অনবদ্য কাজ...

করোনাভাইরাস'কে অনেকেই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় 'ত্রাস' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেও, মূলত মানবজাতির সামনে সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর ত্রাসের নাম- ক্লাইমেট চেঞ্জ। বেশ অনেকদিন ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নানারকম উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মানুষকে সচেতন করার জন্যে। যদিও খুব একটা লাভ যে হচ্ছে, তা বলা যাচ্ছে না। তবে উৎসাহী মানুষেরা চেষ্টায় কোনো কমতি রাখছেন না। সেই চেষ্টারই ফলশ্রুতিতে সাম্প্রতিক সময়ে দেখলাম এক অ্যানিমেটেড শর্টফিল্ম, নাম- টুমরো। অবাক হলাম, এই অ্যানিমেশন ফিল্মটি আমাদের দেশের বানানো। গল্পের চরিত্রেরা সবাই কথা বলছে বাংলায়। দেখে ভেতরে ভেতরে একটু গর্ববোধই করলাম। 

রাতুল নামের ছোট্ট এক শিশু থাকে তার প্রকৃতিপ্রেমী বাবার সাথে; সেন্ট মার্টিনে। বাবা প্রকৃতিপ্রেমী হলে কি হবে, রাতুলের এসব ফুল-পাখি-ঘাস-লতাপাতা ভালো লাগে না। সে গেমস খেলতে পছন্দ করে৷ এই রাতুলই একদিন ঘুমোতে ঘুমোতে স্বপ্ন দেখে সে বাতাসের বুড়োর সাথে দেখা করেছে। সেই বুড়ো তাকে বলছে, পরিবেশের যত্ন নিতে। সে সাথে দেখিয়েছে, প্রকৃতির ভালোভাবে যত্ন নিলে বাংলাদেশ সহ বিশ্ব কত সুন্দর হয়ে উঠবে, তাও। স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার পরে রাতুল হয়ে যায় ভিন্ন এক মানুষ। প্রকৃতি নিয়ে সচেতন এক নাগরিক হয়ে ওঠে সে। বিশ্বকে পালটে দেয়ার মিশনে নামে অল্পবয়সী এই বালক।

রাতুল এবং বাতাসের বুড়ো

গল্পটা খুবই প্রেডিক্টিবল। গল্পের মূলচরিত্র 'রাতুল' অনেকটা পরিবেশ আন্দোলনকারী কিশোরী 'গ্রেটা থুনবার্গ' এর মতনই। যদিও স্ক্রিপ্ট লেখকদের দাবি, স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে তিন বছর আগে। তখনও গ্রেটাকে কেউ অতটা চেনেনা। এ মিল কাকতালীয় বলেই জানাচ্ছেন তারা৷ তবে যাই হোক, শর্টফিল্মের  চরিত্রগুলোর বিন্যাস হয়েছে দারুণ। দেখতে দেখতে মনেই হয়নি, এই নির্মানটি এদেশের। মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিনের পরিচালনায় 'টুমরো' দেখে মুগ্ধ হয়েছি পঁচিশ মিনিট রানটাইমের বিভিন্ন অংশে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে  বেসরকারি টিভি চ্যানেল 'দীপ্ত টিভি'তে সম্প্রচারিত হওয়ার পরে এরকম মুগ্ধ হয়েছেন আরো অনেকেই। এমনিতেই থ্রিডি অ্যানিমেটেড ফিল্ম বানানো খুব সময়সাপেক্ষ এবং বাজেট কনজিউমিং এক মিশন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা এভাবে এক্সিকিউট হতে দেখবো, আসলেই ভাবিনি। আমরা আমাদের দেশের নির্মাণ নিয়ে হয়তো বেশি আশাবাদী হই, দুয়েকটা ভুলও হয়তো লুকিয়ে-চুরিয়ে রাখি, কিছু ত্রুটি রাখঢাক করে হয়তো উচ্ছ্বসিত হই। কিন্তু 'টুমরো' নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বললেও এক অনবদ্য কাজ। বড়সড় কোনো ভুল ধরার সুযোগই পাইনি। 

চরিত্রগুলোর বিন্যাসও ছিলো ছিমছাম! 

পরিচালক মোহাম্মদ শিহাব দুই বছর সময় নিয়ে পনেরো জনের এক টিম নিয়ে বানান এই অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম। মজার বিষয় হলো, টিমের অনেকেরই টেকনিক্যাল নানা বিষয়ে জ্ঞান ছিলো শূন্যের ঘরে। তাও তারা একবিন্দু ছাড় না দিয়েই শেষপর্যন্ত কাজটি দারুণভাবে শেষ করে দেখিয়েছে। তাছাড়া যে জন্যে এ শর্টফিল্ম বানানো, জলবায়ুর পরিবর্তনের ভয়াবহতা মানুষকে বোঝানো, সেটিতেও সফল এই শর্টফিল্ম। ব্যক্তিগত মতামত, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সরকারের উচিত এই শর্টফিল্মকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া। তাতে মানুষের টনক নড়বে। তারা উপলব্ধি করবে তাদের ভুল। সে সাথে আরেকটি জিনিসও উপলব্ধি করবে- বাংলাদেশেও বিশ্বমানের কাজ হয়! 

'টুমরো'ই উপলব্ধি করাবে তা। এই দুর্দান্ত কাজের জন্যে পুরো টিমের প্রতি রইলো শ্রদ্ধা। দারুণ কাজ৷ এরকম নির্মাণে সয়লাব হোক গোটা বাংলাদেশ। আরো অজস্রবার। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা